Tuesday, March 4, 2025

বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের পেছনে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাইনি – তিন

 

কোটা সংস্কারের আন্দোলনের প্রথম পর্বে যা দেখেছি ও বুঝেছি

শিক্ষার্থীদের কোটা আন্দোলন ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান হয়ে ওঠার পর্যায়ের কিছু কথা  

 Student protests in Bangladesh pose serious challenge for ...

রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস যত বেড়েছে ছাত্রদের আন্দোলন তত উত্তাল হয়েছে। তবে ১৬ই জুলাই পুলিশের গুলিতে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদের মৃত্যু যেন আগুনে ঘি ঢালে। ফলে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনও সেই পর্যায়ে সহিংস হয়ে ওঠে। পুলিশের উপর পালটা আক্রমণ, মেট্র রেল, বাংলাদেশ টিভি স্টেশন, প্রভৃতি বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠানে আগ্নি সংযোগের ঘটনাসহ লুটপাটের ঘটনা ঘটে। আন্দোলন যেমন যেমন তীব্র হয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের সাথে যোগ দিয়েছে ডান বাম নির্বিশেষে সমস্ত ছাত্র সংগঠনের কর্মী এবং  রাজনৈতিক দলের কর্মীরা। যোগ দেয় গর্ত থেকে বেরিয়ে আসা মুসলিম মৌলবাদী ও জঙ্গী সংগঠনের কর্মীরা। সাধারণত তারাই পুলিশকে হত্যাসহ ধ্বংসাত্মক ও হিংসাত্মক কাজে লিপ্ত হয়। সেই পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা কিছুটা কৌশল পরিবর্তন করে শিক্ষার্থীদের কোটা আন্দোলনকে বাগে আনার চেষ্টা করে। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী কার্যক্রম জারি রেখেও আন্দোলনের নেতৃত্বকে তাঁর সরকারী বাসভবনে (গণভবনে) ডেকে আলোচনার প্রস্তাব পাঠান। কোটা পুনঃপ্রবর্তনের আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করবে বলে জানান। আন্দোলনের নেতৃত্বের আস্থা অর্জনের জন্যে সরকারের পক্ষ থেকে আপীলও করেন। আবার তারই পাশাপাশি মুখ্য সংগঠকদের আটক করে, আয়না ঘরে গুম করে রেখে, তাদের উপর নির্মমভাবে মানসিক ও শারিরীক নির্যাতন চালান। সে অবস্থায় তাদের অর্থ ও ক্ষমতার প্রলোভনও দেখানো হয়। তবে একটা পর্যায়ে ব্যাপক গণবিক্ষোভের ফলে তাদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।

গণবিক্ষোভের সেই উত্তাল পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ আদালত হাই কোর্টের কোটা পুনর্বহালের রায় খারিজ করে দেয়। শেখ হাসিনা তখন সর্বোচ্চ আদালতের রায় মেনে নেওয়ার ঘোষণা দেন এবং  ছাত্র আন্দোলন সমাপ্ত করার আহ্বান জানান। শিক্ষার্থীরা সেই আহ্বানকে ফিরিয়ে দিয়ে সরকারের কাছে ন’দফা দাবী পেশ করে এবং সেগুলো সরকার যতক্ষণ না মানছে ততক্ষণ তারা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সঙ্কল্প ঘোষণা করে। সেই দাবিগুলোর মধ্যে প্রধান কয়টি দাবি ছিল এ রকমঃ ছাত্র-নাগরিকদের হত্যার দায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে, ছাত্র ও জনতা হত্যার দায় নিয়ে পদত্যাগ করতে হবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সড়ক পরিবহন মন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, তথ্য প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ ও এ আরাফাতকে পদত্যাগ করতে হবে, যেখানে যেখানে ছাত্র ও নাগরকদের হত্যা করা হয়েছে সেখানকার ডিআইজি, পুলিশ কমিশনার ও পুলিশ সুপারদের বরখাস্ত করতে হবে, বাংলাদেশের যে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনী সশস্ত্র হামলা করেছে সেই সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও প্রক্টরদের পদত্যাগ করতে হবে, যে সব পুলিশ, র‍্যাব ও সেনা সদস্যরা শিক্ষার্থীদের উপর গুলি করেছে, যে সকল নির্বাহী মেজিস্ট্রেট গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে হবে এবং দ্রুততম সময়ে গ্রেপ্তার করতে হবে,  দেশব্যাপী যে সকল ছাত্র ও নাগরিক নিহত ও আহত হয়েছে তাদের পরিবারকে অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

বলা বাহুল্য যে, শেখ হাসিনা শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো মানতে অস্বীকার করেন যদিও বলেন যে তিনি যে গুলি চালানোর সকল ঘটনার তদন্ত করে যারা দোষী তাদের বিচার করা হবে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা প্রধানমন্ত্রীর সেই আশ্বাসে ভরসা রাখেনি। আমারও মনে হয়নি যে শেখ হাসিনার কথায় বা আশ্বাসে তখন ভরসা রাখার সামান্যতম কোনো অবশিষ্ট ছিল। কারণ, তখনও হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও নাগরিকদের নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনায় তিনি একবার ভুলে করেও দুঃখ প্রকাশ পর্যন্ত করেননি, তাদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া তো দূরের কথা। ঘুরিয়ে যারা পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে ও  গুরুতরভাবে আহত হয়েছে তাদের বিরুদ্ধেই পুলিশ হত্যা ও সরকারী সম্পত্তি ধ্বংসের যথেচ্ছ মামলা দিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। সন্তানসম শিক্ষার্থীরা যারা হাসপাতালের বেডে বা মেঝেয় পড়ে থেকে যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে তাদের কাছে আগে না গিয়ে শেখ হাসিনা ছুটে গিয়েছেন কোথায় কোথায় সরকারী সম্পত্তি নষ্ট বা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে তা দেখতে এবং তা দেখে ক্যামেরার সামনে লোক দেখানো   অশ্রু বিসর্জন করে আহত নিহত শিক্ষার্থীদের জঙ্গী ও সন্ত্রাসী তকমা দিয়ে তাদের কঠোর শাস্তি দিবেন বলে বজ্রকণ্ঠে হুঁঙ্কার ছেড়েছেন। এরূপ পরিস্থিতিতে ছাত্রদের সামনে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া ছাড়া অন্য বিকল্প ছিল ন। ফলত তারা ঘোষণা দেয় যে যতক্ষণ না তাদের সকল দাবী মানা হবে ততক্ষণ তারা রাজপথ ছেড়ে যাবে না।   

শেখ হাসিনার হুঙ্কারকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে তারা আন্দোলনকে আরও তীব্র করেছে। সেই পর্যায়ে তারা নতুন নতুন আগুন ঝরা শ্লোগান এবং কর্মসূচী দিয়েছে যে কথা ইতিমধ্যেই আলোচনা করেছি। সেই সময়ের শ্লোগানগুলো প্রমাণ করে যে হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ ও ক্রোধ কত তীব্র হয়ে আকার ধারণ করেছিলো এবং সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ না করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য যে কোনো মূল্য চুকাতে তারা প্রস্তুত ছিল। 

৩৬ দিনের এই আন্দোলনের শেষ তিন সপ্তাহে তৈরি হয়েছে নতুন নতুন স্লোগান, বদলেছে দাবির ভাষাও। আমি কে তুমি কে, রাজাকার, রাজাকার; কে বলেছে, কে বলেছে, স্বৈরাচার, স্বৈরাচার’—এর মতো শ্লেষের প্রতিবাদ একপর্যায়ে রূপ নেয় সরকার পতনের এক দফা এক দাবিতে। এক দুই তিন চার, শেখ হাসিনা গদি ছাড় - এর মত বজ্রকঠিন কিছু স্লোগান ওঠে। মাঝের তিন সপ্তাহে যে সব স্লোগান শোনা গিয়েছিল - চাইলাম অধিকার হয়ে, হয়ে গেলাম রাজাকার’; ‘আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম, দালালি না রাজপথ, রাজপথ ইত্যাদি। ১৬ই জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নিহত হন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ। এর পর থেকেই স্লোগান শুরু হয়, ‘আমার খায়, আমার পরে, আমার বুকেই গুলি করে’; ‘তোর কোটা তুই নে, আমার ভাই ফিরিয়ে দে’; ‘বন্দুকের নলের সাথে ঝাঁজালো বুকের সংলাপ হয় নাএবং লাশের ভেতর জীবন দে, নইলে গদি ছাইড়া দে’—এসব স্লোগান।  এই শ্লোগানগুলির শব্দ চয়ন বুঝিয়ে দেয় শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল প্রাণ হারানোর কত যন্ত্রণা। সেই সময় পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছিল দ্রুতলয়ে আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন স্লোগান ২রা আগষ্ট রাজধানীর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে শিক্ষার্থীরা স্লোগান দেয় - 'আমার সোনার বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই';একাত্তরের হাতিয়ার গর্জে ওঠো আরেকবার’; ‘যে হাত গুলি করে, সে হাত ভেঙে দাওএবং অ্যাকশন অ্যাকশন ডাইরেক্ট অ্যাকশন ৩রা আগষ্ট ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ থেকে শোনা যায়, ‘আমার ভাই কবরে, খুনিরা কেন বাইরে’; ‘আমার ভাই জেলে কেনএবং গুলি করে আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না। সায়েন্স ল্যাব মোড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিল থেকে শোনা যায়, ‘জাস্টিস জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস’; ‘জ্বালো রে জ্বালো, আগুন জ্বালোএবং ‘দিয়েছি তো রক্ত, আরও দেব রক্ত’;এর মতো স্লোগানগুলো। রিক্সাওয়ালারাও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে একাত্ম হয়ে ৩রা আগষ্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে শ্লোগান দেয়,  গুলি করে আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না’; ‘রক্তের বন্যায়, ভেসে যাবে অন্যায়’; ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার, কে বলেছে কে বলেছে স্বৈরাচার স্বৈরাচারএবংআমার ভাইয়ের রক্ত, বৃথা যেতে দেব নাইত্যাদি তবে সবচেয়ে বেশি সাড়া ফেলেছিল এই শ্লোগানটি – ‘বুকের ভিতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’।   

শ্লোগান লেখা ছিল প্ল্যাকার্ডেওঅনাস্থা অনাস্থা, স্বৈরতন্ত্রে অনাস্থা’; ‘চেয়ে দেখ এই চোখের আগুন, এই ফাগুনেই হবে দ্বিগুণ’; ‘তবে তাই হোক বেশ, জনগণই দেখে নিক এর শেষ’; ‘আমরা আম-জনতা, কম বুঝি ক্ষমতা’; ‘তোমারে বধিবে যে গোকূলে বাড়িছে সে’; ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’; ‘হাল ছেড় না বন্ধু বরং কণ্ঠ ছাড় জোরে’; ‘ফাইট ফর ইওর রাইটস’; ‘নিউটন বোমা বোঝো মানুষ বোঝো নালেখার মতো শ্লেষাত্মক প্ল্যাকার্ডও ছিল হাতে হাতে।

এমন তীব্র গণবিক্ষোভেও শেখ হাসিনার শুভবুদ্ধির উদয় না হলে শিক্ষার্থীরা ৩রা আগষ্ট ৯ দফা দাবি ছেড়ে এক দফা দাবি তথা হাসিনার পদত্যাগের দাবি তোলে এবং দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন ও ঢাকায় লং মার্চের ডাক দেয়। সে সময় তাদের শ্লোগান ছিল – ‘দফা এক দাবি এক, হাসিনার পদত্যাগ’ এবং এক দফা এক দাবি, হাসিনা তুই কবে যাবি’। প্রথমে ৬ই মার্চ ঢাকায় লং মার্চের  ডাক দেয়, পরে একদিন এগিয়ে নিয়ে এসে সেটা ৫ই মার্চ করে। তারপরের যা হয়েছে তাতো ইতিহাস, এক ভয়ংকর স্বৈরাচারী নারী প্রধানমন্ত্রীর পতন হয়েছে, বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে ইতিহাসের এক বিরল অধ্যায়ে প্রবেশ করে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা তাঁর সরকারকে উৎখাত করার জামায়াতি ইসলামী ও মুসলিম জঙ্গি সংগঠনগুলোর একটা গভীর ষড়যন্ত্রের যে অভিযোগ তুলেছিলেন তাকে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয় নি। কারণ, প্রথমত কোটা সংস্কারের দাবি ছিল অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত যে দাবি না মেনে শেখ হাসিনা দমন করার চেষ্টা করেছেন তাঁর দলীয় গুণ্ডাবাহিনী ও রাষ্ট্রশক্তির সাহায্যে নির্মমভাবে। দ্বিতীয়ত ৩৬ দিনের রক্তক্ষয়ী গণবিক্ষোভে লক্ষ লক্ষ ছাত্র ও নাগরিক পথে নেমেছিলো স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে ও মাথায় বেঁধে, মুসলিম জঙ্গিদের কলেমা লেখা কালো পতাকা তেমন চোখে পড়েনি বললেই চলে, ‘আল্লাহো আকবর’, ‘নারায়ে তকবির’, এসব ইসলামী শ্লোগান শোনা যায় নি, শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে ছিল বাংলা ভাষার কবিদের লেখা দেশপ্রেমের গান ও কবিতা,  একাত্তরকে স্মরণ করে শ্লোগান দিয়েছে একাত্তরের হাতিয়ার গর্জে ওঠো আরেকবার’, ধর্মীয় বিভেদসহ সকল বিভেদ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় শ্লোগান ‘আমার সোনার বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই’।  ক্রমশ ...

Thursday, February 27, 2025

বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের পেছনে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাইনি - দুই

 

কোটা সংস্কারের আন্দোলনের প্রথম পর্বে যা দেখেছি ও বুঝেছি

6,791 Student Protest In Bangladesh Stock Photos, High-Res ...

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন যেভাবে ছাত্র-জনতার গণআন্দোলন হয়ে ওঠে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে বিভেদ আনতে একদিকে জঙ্গি ও জামায়াতি তকমা লাগিয়ে অপপ্রচারের সুনামি সৃষ্টি করেছিলেন, অন্যদিকে আন্দোলনকে দমন করতে রাষ্ট্রযন্ত্র এবং  যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র কর্মীবাহিনী তথা গুণ্ডাবাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েছিলেন শিক্ষার্থীদের উপর। তাতেও আন্দোলন দমেনি, বরং দমনপীড়ন যত তীব্র হয়েছে, শিক্ষার্থীরা যত রক্তাক্ত ও হতাহত হয়েছে আন্দোলনও তত তীব্র হয়েছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও হাজারে হাজারে আন্দোলনে সামিল হয়েছে, রাজপথে নেমেছে। হাসিনা তাতে আরও ক্ষিপ্ত ও হিংস্র হয়ে ওঠেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়সহ সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা, দফায় দফায় কারফিউ জারি করা, ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখাসহ সমস্ত প্রকার রাষ্ট্রীয় নিপীড়নকারী ব্যবস্থাকে কঠোরভাবে প্রয়োগ করার জন্যে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীকে আদেশ দেন। পুলিশ স্বভাবতই অধিক মাত্রায় ক্ষিপ্ত ও হিংস্র হয়ে ওঠে এবং দমনপীড়নের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।  কাঁদানে গ্যাসের সেল ফাটিয়ে, নির্মমভাবে ব্যাপক লাঠিচার্জ করে শত শত শিক্ষার্থীদের রক্তাক্ত করে, রক্তাক্ত ও আহত শিক্ষার্থীদের  গণহারে আটক ও গ্রেপ্তার করে গারদে পোরে। তাতেও শিক্ষারথীরা ভয়ে পেয়ে পিছু না হটে বুক চিতিয়ে আরও বেশি বেশি করে দাঁড়িয়ে যায় পুলিশের গুলির সামনে। পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনী তখন তাদের উপর মুড়িমুরকির মতন গুলিবর্ষণ করা শুরু করে ছত্রভঙ্গ করতে। ফলে হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে, কয়েক হাজার পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। এর পাশাপাশি পুলিশ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের নেতাদেরও গ্রেপ্তার করে ও গুম করে রাখে, পুলিশ কাস্টডিতে তাদের উপর অকথ্য অত্যাচার নিপীড়ন চালায়। বল্গাহীন এরূপ পৈশাচিক রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নে মধ্যেও  শিক্ষার্থীরা পুলিশকে পিঠ দেখায় নি, রাজপথ ছাড়ে নি।

নিজের সন্তানদের উপর এরূপ বীভৎস, বর্বর রাষ্ট্রীয় অত্যাচার ও সন্ত্রাসের দৃশ্য দেখে বাবা-মা ও অভিভাবকরাও তখন আর বাড়িতে বসে স্থির থাকতে পারেনি, রাস্তায় নেমে সন্তানদের পাশে দাঁড়িয়েছে, পুলিশের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষার্থীদের বাবা-মা ও অভিভাবক ছাড়াও রাষ্ট্রের দানবীয় বেপরোয়া সন্ত্রাসী অভিযানের বিরুদ্ধে আমজনতাও পথে নেমে ছাত্রদের কোটা আন্দোলনে আন্দোলনে সামিল হয়েছে। কলকারখানার শ্রমিক, গার্মেন্ট শিল্পের নারী শ্রমিক, রিক্সাওয়ালা,  চায়ের দোকানদার, মুদির দোকানদার, দোকানের কর্মচারী, হকারসহ সব পেশার শ্রমজীবী মানুষ নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবাই জীবন বাজী রেখে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে পথে নেমেছে।  ছাত্রদের আন্দোলনে সামিল হওয়া সেই আমজনতার উপরেও হাসিনা সরকারের পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়েছে, তাদের উপর গুলি পর্যন্ত চালিয়েছে। ফলে বহু সংখ্যক অছাত্র মানুষরাও শিশু, নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ, বৃদ্ধা নির্বিশেষে ভয়ংকর রকমের জখম হয়েছে, অনেকেই নিহতও হয়েছে। রাষ্ট্রের পরিকল্পিত বীভৎস এই সন্ত্রাস রাস্তায় টেনে নামায় বুদ্ধিজীবী, বিদ্বজন, শিল্পী, কলাকুশলীসহ সুশীল সমাজের একাংশকেও। তারাও ছাত্রদের আন্দোলনে সামিল হয়, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। এভাবেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সহসা, যেন এ লহমায়, ছাত্র-জনতার গণআন্দোলন হয়ে ওঠে।

যতদূর মনে পড়ে সুশীল সমাজের যারা সে সময় নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছাত্রদের পাশে রাজপথে নেমে এসেছিলো তাদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল (এখন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা), আন্তর্জাতিক বহু পুরষ্কারে ভূষিত জলবায়ু ও পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী আইনজীবি সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান (এখন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা), জনপ্রিয় চলচ্চিত্র শিল্পীদের মধ্যে পথে নেমে রক্তাক্ত, আহত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন শিল্পী বাঁধন ও জাকিয়া বারি মম প্রমুখ। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, সন্তানসম ছাত্রদের উপর পুলিশের গুলি চালনার নিন্দা করেছিলেন জনপ্রিয় চলচ্চিত্র শিল্পী মোশারাফ করিম ও চঞ্চল চৌধুরি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন নারী অধ্যাপককেও রাস্তায় নেমে ছাত্রদের কাতারে দাঁড়িয়ে হসিনা সরকারের রাষ্টড়ীয় দমনপীড়নের তীব্র প্রতিবাদ করতে দেখেছি যার নাম মনে নেই। এই সব বিশিষ্ট গুণীজনরা আধুনিক সভ্য সমাজের এক একজন উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব  ফলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চেহারা শুধু ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনেই থেমে থাকেনি, খুব দ্রুতই তীব্র গণবিক্ষোভের চেহারা নিয়ে নেয়। এসব দেখে শেখ হাসিনা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিরুদ্ধে তার সরকারকে উৎখাত করার মুসলিম মৌলবাদীদের একটা গভীর ষড়যন্ত্র বলে যে অভিযোগ করেছিলেন সেটা আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য ঠেকেনি। 

গণবিক্ষোভও আর শুধু বিক্ষোভের স্তরে থেমে থাকেনি, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস যত  বল্গাহীন হয়েছে, রাজপথে যত রক্ত ঝরেছে, ছাত্র ও জনতার লাশ যত পড়েছে আন্দোলন ততই তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে, এবং একটা পর্যায়ে অভ্যুত্থানের রূপ নিয়ে ফেলেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারাও আন্দোলনকে আরও উদ্দীপ্ত করতে, আন্দোলনের ঝাঁজ বাড়াতে নতুন নতুন শ্লোগান, আন্দোলনের নতুন নতুন কর্মসূচী দিয়েছে। ব্লকেড, কমপ্লিট শাট ডাউন ইত্যাদি কঠিন কঠিন কর্মসূচী দিয়ে অভ্যুত্থানকে তীব্র থেকে তীব্রতর করেছে। সেই পর্যায়ে আন্দোলন একটা স্তরে গিয়ে ছাত্ররা আর চাকরিতে কোটা সংস্কারের এক দফা দাবিতে আটকে থাকে নি। এক দফার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও বহু দাবী যোগ করে ৯ দফা দাবির ঘোষণা দেয়। ন’দফা দাবিতে ঢাকার রাজপথ ও গোটা বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে ওঠে। ক্রমশ ...

বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাইনি – পাঁচ

  দ্বিতীয় অধ্যায় শেখ হাসিনা ও শেখ মুজিবের প্রতি তীব্র গণরোষের নেপথ্যে ২০২৪ এর জুলাই অভ্যুত্থানের সফল পরিসমাপ্তি ঘটে ৩৬ দিন পর (৫ই ...