Wednesday, January 16, 2019

বিজেপি সরকারের তিন তালাক বিরোধী বিল মুসলিম স্বার্থ বিরোধী যারা বলছে তারা মিথ্যাচার করছে

সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদেশ সহ অর্ধেক মুসলিম বিশ্ব তিন তালাক আইনটি কবেই তালাক দিয়ে বসে আছে। ‌তারা তার পরিবর্তে প্রণয়ন করেছে ভিন্ন তালাক আইন। তাদের প্রণীত তালাক আইনগুলি আলাদা হলেও তাতে দুটি বিষয়ে অভিন্নতা রয়েছে। তা হলো এ রকম, স্বামী ও স্ত্রী উভয়কেই তালাক দেবার অধিকার দেওয়া হয়েছে এবং আদালতের বাইরে সবরকমের তালাককে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সৌদি আরব তো খুব সম্প্রতি তালাক আইনে নারীর অনুকূলে আর একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী অনুমোদন করেছে। এর ফলে স্ত্রীকে তালাক দেবার পূর্বে তাকে সে কথা মেসেজ করে জানাতে হবে। এটা এ জন্য করা হয়েছে যাতে স্ত্রী আদালতে তালাক প‍রবর্তী সুযোগ-সুবিধার দাবি জানাতে পারে। প্রধান প্রধান মুসলিম দেশগুলো সহ অর্ধেক মুসলিম বিশ্বই এটা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে যে নারীর প্রতি অন্যায়, অবিচার ও বঞ্চনার অবসান এবং নারীর ক্ষমতায়নকে বাস্তবায়িত করতে হলে তিন তালাক আইনটি আমূল পাল্টানো কিংবা সম্পূর্ণ বর্জন করা আবশ্যক। তাদের এই উপলব্ধি ও তদনুযায়ী পদক্ষেপ করা কুর্ণিশ করার মতো কাজ।
মুসলিম দেশগুলো তাদের ধর্মীয় আবেগের উপর নারী ও দেশের স্বার্থকে স্থাপন করে শরিয়া তালাক অইনকে তালাক দিতে পেরেছে। এটা মোটেও সহজ কাজ ছিল না। কিন্তু আমাদের পক্ষে কাজটা ক‍রা অনেক সহজ ছিল। তবু স্বাধীনতার সাত দশক পার হওয়ার পরেও আমরা এ কাজটি আজও করতে পারলাম না। কংগ্রেস দল দাবি করে যে তারা ধর্মনিরপেক্ষ দল এবং ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। এরাই দীর্ঘ সময় দেশ শাসন করেছে। তথাপি তারা তিন তালাক আইনটি ব‍র্জন বা সংশোধন করার কোনো উদ‍্যোগই গ্রহণ করেনি। উল্টে বিজেপির মোদি সরকার যখন সেই কাজটি করতে উদ্যোগী হয়েছে ও পদক্ষেপ করছে তখনই তারা সেই পদক্ষেপকে ব্যর্থ করতে মরিয়া ভূমিকা পালন করছে। গত বছর মোদি সরকার সংসদে তিন তালাক বিরোধী বিল সংসদে পাশ করিয়েছে, কিন্তু রাজ্যসভায় সেটি আটকে যায়। কারণ রাজ্যসভায় বিরোধী পক্ষ সংখ্যাগরিষ্ঠ। সেখানে এই বিলটি আটকে দিতে প্রধান ভূমিকা পালন করে কংগ্রেস দল। ফলে ঐতিহাসিক এই বিলটি শেষ পর্যন্ত আইনের স্বীকৃতি পায়নি। মোদি সরকার গত বছরেই একেবারে অন্তিম লগ্নে আরেকবার এই বিলটিই লোকসভায় পাশ করিয়ে রাজ্যসভায় পেশ করতে উদ্যোগী হয়। কিন্তু গোটা বিরোধী পক্ষ পুনরায় চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। এক্ষেত্রেও কংগ্রেস দলই বিলের বিরুদ্ধে গোটা বিরোধী পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ করতে প্রধান ভূমিকা পালন করে। কংগ্রেসের এই ন্যাক্কারজনক ভূমিকায় নগ্নভাবে সঙ্গত দিয়েছে দুই কম্যুনিস্ট পার্টি এবং অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। কী আশ্চর্য! এই দলগুলো নাকি ধর্মনিরপেক্ষ দল! এরা নাকি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ও ধর্মনিরপেক্ষ দেশ গড়তে অঙ্গীকারবদ্ধ! এরা নাকি নারী-পুরুষের সমানাধিকারে বিশ্বাসী!
কংগ্রেস দল ও দুই কম্যুনিস্ট পার্টি সহ বিরোধী দলগুলো তিন তালাক বিরোধী বিল আটকাতে যা যা বলছে সেগুলো সবই হয় অজুহাত, না হয় মিথ্যা। সেই সমস্ত অজুহাত ও মিথ্যাচারগুলো ধরে ধরে আলোচনা করার অবকাশ এখানে নেই। এখানে মাত্র একটি অজুহাত ও একটি মিথ্যাচার নিয়ে আলোচনা করতে চেষ্টা করবো। ওরা যে অজুহাতগুলি খাড়া করার চেষ্টা করছে তার মধ্যে একটি হলো, তিন তালাককে নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ করতে চাওয়ার পেছনে বিজেপি ও নরেন্দ্র মোদীর নিশ্চয় কোনো দূরভিসন্ধি রয়েছে। আর যে মিথ্যাচারগুলি করছে তার মধ্যে একটি হলো এই যে,  তিন তালাক বিরোধী বিলটি আইনে রূপান্তরিত হলে মুসলিম নারীর স্বার্থ বিপন্ন হবে।
প্রথমে আলোচনা করা যাক অজুহাত প্রসঙ্গে। তিন তালাক বেআইনি করার পশ্চাতে বিজেপির কী দূরভিসন্ধি আছে তা তারা কেউই খোলসা করছেন না। অপরদিকে বিজেপি কিন্তু দাবি করছে যে মুসলিম নারীদের ন্যায় বিচার পাইয়ে দিতেই তারা তিন তালাক বাতিল করতে চায়। এটা কারো কাছে অজানা নয় যে বিজেপি একটি হিন্দু সাম্প্রদায়িক দল। সুতরাং এই দলটি নারীদের ন্যায় বিচার দিতে চায় এ দাবি বিশ্বাস করা সত্যিই কঠিন। সেজন্য কংগ্রেস ও বিরোধী পক্ষের দলগুলো যখন বলে যে তিন তালাক নিষিদ্ধ করার পেছনে বিজেপির কোনো দূরভিসন্ধি আছে তখন সে কথাটাই আপাত দৃষ্টিতে সত্যি ও সঠিক বলে মনে হয়। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে যে আপাত দৃষ্টিতে যেটা সত্যি বলে মনে হয় সেটা সব সময় সত্যি হয় না। যেমন আপাত দৃষ্টিতে সূর্য পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে বলে মনে হলেও প্রকৃত সত্যটি ঠিক তার বিপরীত। বিজেপির তিন তালাক আইন নিষিদ্ধ করতে চাওয়া নিয়ে বিরোধী পক্ষের তোলা অভিযোগটি ঠিক সে রকমই। কোনো দূরভিসন্ধির বশবর্তী হয়ে বিজেপি তিন তালাক নিষিদ্ধ করতে চায়ছে এ অভিযোগটা একেবারেই সত্যি নয়। এ অভিযোগটি যে মোটেও সত্যি নয় তার বড় প্রমাণ হলো প্রধান প্রধান মুসলিম দেশগুলো যারা তিন তালাক আইনটি হয় বাতিল করেছে, না হয় আইনটি আমূল সংশোধন করেছে। তিন তালাক আইনটি বাতিল করতে চাওয়ার পেছনে বিজেপির দূরভিসন্ধির অভিযোগ তোলা যে স্রেফ বাহানা তার আর একটি বড়ো প্রমাণ হলো এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের রায়। প্রসঙ্গত: উল্লেখ্য যে, সুপ্রিম কোর্ট তালাকপ্রাপ্ত কয়েকজন মুসলিম নারীর আবেদনের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক তিন তালাককে সম্পূর্ণ অসাংবিধনিক আখ্যা দেয় এবং নিষিদ্ধ করে। সেই রায়েই সুপ্রিম কোর্ট ভারত সরকারকে উক্ত রায়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ একটি আইন প্রণয়ন করারও নির্দেশ প্রদান করে।
এবার আসা যাক উপরে উল্লেখিত বিরোধী পক্ষের মিথ্যাচার প্রসঙ্গে। বিরোধীরা বলছে যে বিজেপি সরকারের আনা তিন তালাক বিরোধী বিলটি আইনে পরিণত হলে মুসলিম নারীর স্বার্থ বিপন্ন হবে। বিরোধীদের এই অভিযোগটি নগ্ন মিথ্যাচার ও প্রতারণার জঘন্য নিদর্শন বৈ নয়। এটি যে একটি মিথ্যাচার ও প্রতারণা ছাড়া কিছু নয় তা শরিয়া তিন তালাক আইনে চোখ রাখলে স্পষ্ট বোঝা যায়। তাই এবার শরিয়া তিন তালাক আইন কী বলছে তার প্রতি একটু কান পাতা যাক। এই আইনের প্রধান প্রধান কথাগুলি হলো, এক). স্পষ্ট বাক্যে অথবা পরোক্ষ বাক্যে অথবা ইশারা - ইঙ্গিতে অথবা লিখিতভাবে তালাক দিলে তা তৎক্ষণাৎ কার্যকর হবে। দুই). মত্ত অবস্থায় তালাক দিলেও তা তৎক্ষণাৎ কার্যকর হবে। তিন). তালাক কার্যকর হবার সঙ্গে সঙ্গে বিবাহ - বন্ধন ছিন্ন হবে এবং স্বামী তাকে ফিরিয়ে নিতে পারবে না। চার). স্ত্রীকে তালাক দিলে খোরপোষ পাবার অধিকার রোহিত হয়ে যাবে। পাঁঁচ). স্ত্রী স্বামীকে তালাক দিতে পারবে না। ছয়). স্ত্রী তালাক শরিয়া আদালতে তালাক চায়তে পারবে যদি ক). স্বামী সহবাসে অক্ষম হয়, অথবা খ). স্বামী উন্মাদ হয়, অথবা গ). চার বছর নিরুদ্দেশ থাকে। এসব ক্ষেত্রে স্ত্রী শরিয়া আদালতে তালাকের আবেদন করতে পারে মাত্র যা আদালতে নামঞ্জুরও (অননুমোদিতও) হতে পারে।
এই হলো অতি সংক্ষেপে শরিয়া তালাক আইন যার মতো ক্ষতিকর নারীবিরোধী আইন খুবই কমই আছে সারা বিশ্বে। এই আইনটিকে একট অসভ্য ও বর্বর কালা আইন বললেও কম বলা হয়। আর এই আইনটিকে রদ করলেই নাকি মুসলিম নারীর অকল্যাণ বৈ কল্যাণ হবে না! এই কথা যারা বলছে বলছে তারা প্রথম শ্রেণির ভণ্ড, প্রতারক ও মিথ্যেবাদী। এই মিথ্যেবাদীর দল প্রশ্ন তুলছে যে, তিন তালাক দেওয়ায় স্বামীর যদি কারাবাস হয় তবে স্ত্রীকে ভরণপোষণ কে দেবে? তাই তারা এই ধূয়া তুলে বলছে যে, মোদি সরকারের তিন তালাকবিরোধী বিলটি আইনে পরিণত হলে মুসলিম নারীদের সর্বনাশ হবে। 
বিরোধী পক্ষের এই কথাটি আপাত দৃষ্টিতে বিশ্বাসযোগ্য ও যুক্তিপূর্ণ মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এটা একটা জঘন্য মিথ্যাচার বৈ নয়। কারণ, শরিয়তি তিন তালাক আইনে তালাকপ্রাপ্ত আইনে স্ত্রীদের ভরণপোষণ পাবার কোনো অধিকারই নেই। এই আইন অনুযায়ী একজন স্বামী যদি তার স্রীকে তালাক প্রদান করে তবে সে স্ত্রীকে খোরপোষ দিতে বাধ্য নয়, এমনকি সে বিত্তবানও হলেও নয়। এজন্যেই মুসলিম সমাজে কেউই তার স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার পর ভরণপোষণ প্রদান করে না। এটাই বিশ্বব্যাপী মুসলিম সমাজের একটি সাধারণ সংস্কৃতি। অথচ বিরোধী পক্ষ বলছে যে, তালাক দেবার পর স্বামীকে জেলে পাঠানো চলবে না যাতে তার কাছ থেকে স্ত্রীর খোরপোষ আদায় করা যায়। এ কথা বলে তারা মুসলিম নারীর সাথে ডাহা প্রতারণা করছেন। নির্লজ্জ প্রতারণা। সুতরাং কোনো সংশয় নেই যে, শরিয়তি তাৎক্ষণিক তিন তালাক আইন শুধু বেআইনী বা নিষিদ্ধ করাই যথেষ্ট নয়, তিন তালাক প্রদানকে নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য করাও সমান জরুরী। আইনে এরূপ সংস্থান থাকলে তবেই পুরুষরা খেয়ালের বশে কিংবা হীন স্বার্থ পূরণ করার জন্যে স্ত্রীকে তালাক দিতে ভয় পাবে।
মুসলিম ধর্মগুরুদের সঙ্গে কন্ঠ মিলিয়ে বিরোধী পক্ষ বলছে যে, তিন তালাক আইন নিষিদ্ধ করা জরুরী নয়। কারণ, মুসলিম সমাজে তাৎক্ষণিক তালাক প্রদানের যে ঘটনাগুলি ঘটে সেগুলোর নব্বই শতাংশ ক্ষেত্রেই আইনের অপব্যবহার ঘটে থাকে। যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেয়া যায় যে, মুসলিম ধর্মগুরুদের বক্তব্য বা দাবি যথার্থ, তাহলে প্রশ্ন, কেনো প্রায় দেড়শ' বছর ধরে এভাবে মুসলিম পুরুষরা আইনের অপব্যবহার করে চলেছে এবং এর প্রতিকারের উপায় কি? না, শরিয়তি আইনে এর প্রতিকার নেই। কারণ, শরিয়ত পুরুষকে তালাক দেওয়ার অবাধ ক্ষমতা প্রদান করেছে। আর ব্যক্তি মানুষ কিংবা সমাজ কিংবা রাষ্ট্র যার হাতেই অবাধ ক্ষমতা থাক না কেনো, সে ক্ষমতার অপব্যবহার হবেই যা রোধ করা কখনোই সম্ভব নয়। বিশ্বের সর্বকালের ইতিহাস এই সাক্ষ্যই দেয়। সুতরাং মুসলিম পুরুষ যাতে শরিয়তি তালাক আইনের অপব্যবহার না করতে পারে তারজন্যেও তাৎক্ষণিক তালাক আইন রদ করা একান্তই জরুরী, এর কোনো বিকল্প নেই।
শরিয়তি তালাক আইন নিষিদ্ধ করা এবং এর বিকল্প একটি আইন প্রণয়ন করা আর একটি কারণে জরুরী। তা হলো এই যে, শরিয়তি আইনে মুসলিম নারীর তালাক দেবার অধিকার নেই। এ কথা মানছেন আলেম সমাজের একাংশও। গোঁড়া মুসলিমরা অবশ্য এ কথা মানতে নারাজ। তাদের বক্তব্য  ইসলামে নারীকে তালাক দেবার অধিকার দিয়েছে, সেটা হলো খুলা তালাক। এই খুলা তালাক প্রদানের অধিকার আসলে নামেই অধিকার, প্রকৃত অধিকার নয়। কারণ, এই আইন অনুসারে স্ত্রী স্বামীর অনুমোদন ব্যতীত খুলা তালাকের অধিকার প্রয়োগ করতে পারে না। সুতরাং আলেম সমাজের একাংশ মানছেন যে, খুলা তালাক নারীর জন্যে যথেষ্ট নয়। খুলা তালাক আসলে তাই নারীর সঙ্গে এক প্রকার তামাশা বৈ নয়। 
শুধু ইসলামই মুসলিম নারীর সঙ্গে তামাশা করে নি, কংগ্রেস ও কম্যুনিস্টরাও মুসিলিম নারীর সঙ্গে সমানে তামাশা করে চলেছে। এ তামাশা তারা যে শুধু মোদি সরকারের আনা তিন তালাক বিরোধী বিলের ক্ষেত্রেই করছে এমনটা নয়, তামাশা করে চলেছে মুসলিম নারীর সঙ্গে তাদের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপেই। ১৯৮৫ সালে সুপ্রীম কোর্ট শাহবানু মামলায় রায় দিয়ে বলেছিলো যে, উপার্জনহীন অসহায় মুসলিম তালাকপ্রাপ্ত নারীর খোরপোষ পাবার অধিকার রয়েছে তার প্রাক্তন স্বামীর নিকট থেকে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সংসদে আইন পাশ করিয়ে সুপ্রীম কোর্টের সেই রায়টি খারিজ করে দেন। সেই আইনটিও প্রণয়ন করা হয় মুসলিম স্বার্থ রক্ষা করার নামে। সেই কুখ্যাত আইনটিকে সমস্ত রাজনৈতিক দলই দু'হাত তুলে সমর্থন জানিয়েছিলো। মুসলিম নারীর সঙ্গে এভাবে বহু তামাশা করেছে কংগ্রেস, কম্যুনিস্ট পার্টি ও অন্যান্য পাতি বুর্জোয়া দলগুলি যারা নিজেদের মুসলিম দরদি ও ধর্মনিরপেক্ষ দল বলে দাবি করে। এ দেশের মুসলিম নারী তাদের প্রতি রাজনৈতিক দলগুলির এরূপ মেকি দরদ ও তামাশা দেখে দেখে প্রচণ্ড ক্লান্ত, বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ। তাই তারা আর 'খুলা তালাক'-এর তামাশা দেখতে চায় না। তারা চাই তালাক দেবার সত্যিকারের অধিকার ও ক্ষমতা, চাই শরিয়তি তালাক আইনের চির অবসান, এবং চায় সম্পূর্ণ একটি নতুন তালাক আইন যেখানে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার থাকবে। চায় এমন একটা তালাক আইন যার ফলে স্বামী অন্যায়ভাবে তালাক দিলে আদালতে তা খারিজ হয়ে যাবে, অন্যায় তালাক দেবার জন্যে তাকে কারাভোগ করতে হবে এবং স্ত্রীর খোরপোষও তাকে বহন করতে হবে। 
পরিশেষে বলতে চাই নির্দ্বিধায় যে, বিজেপি সরকার যে উদ্দেশ্যেই শরিয়তি তিন তালাক আইনটি বাতিল ও বেআইনি করতে বারবার উদ্যোগি হোক না কেনো, উদ্যোগটি কিন্তু নিঃসন্দেহে অতি শুভ ও ভীষণ প্রয়োজনীয়। এই উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে শুধু মুসলিম নারীই উপকৃত ও লাভবান হতো না, লাভবান হতো গোটা মুসলিম সমাজই। এটাও স্পষ্ট যে, এই উদ্যোগটি অসফলই থেকে যাবে, কারণ ভোট-ভিখারি বিরোধী পক্ষ এখনও রাজ্যসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ। এহেন পরিস্থিতিতে মুসলিম সমাজের, বিশেষ করে মুসলিম নারী সমাজের কর্তব্য হচ্ছে, শরিয়তি তালাক আইন বাতিলের দাবিতে যে আওয়াজ উঠেছে দেশজুড়ে তা ভবিষ্যতে যদি কখনোই থেমে না যায় সে বিষয়ে সতর্ক থাকা এবং নারী-পুরুষের সমানাধাইকারের ভিত্তিতে একটি বিকল্প তালাক আইন প্রণয়নের আন্দোলনকে গণয়ান্দোলনে উন্নীত করতে অবিরাম প্রয়াস চালিয়ে যাওয়া।
(এই লেখা হয় ২০১৮ এর শেষের দিকে না হয় ২০১৯ এর একেবারে প্রথম দিকে মদি সরকারের শেষ শীতকালীন অধিবেশন চলাকালীন সময়ে। লেখাটি লিখি বাংলা পোর্টাল 'বিতর্ক' এর জন্যে। বিতর্ক লেখাটি ছাপে যথেষ্ট দেরিতে। আর তারও অনেক পরে এটা আমার ব্লগে আপলোড করি। ১৫/৩/১৯)  

Tuesday, September 25, 2018

তিন তালাকের বিরুদ্ধে অর্ডিন্যান্স একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ


তিন তালাককের বিরুদ্ধে অর্ডিন্যান্স জারি মোদি সরকারের একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ গত ১৯ শে সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে রাষ্ট্রপতি অর্ডিন্যান্সে সই দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শরিয়তি তিন তালাক আইন একটি দণ্ডনীয় ফৌজদারী অপরাধে রূপান্তরিত হয়ে গেলোএর ফলে ভারতের মাটিতে তিন তালাকের বিরুদ্ধে মুসলিম নারীদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের একটি অধ্যায় সমাপ্ত হলো। মোল্লাতন্ত্রের বিরুদ্ধে মুসলিম নারীর মুক্তির সংগ্রামের ইতিহাসে এই অধ্যায়টি ভারতের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এই ইতিহাসটি রচনায় নরেন্দ্র মোদি অপ্রত্যাশিতভাবে যে ভূমিকাটি পালন করলেন তার জন্যে ইতিহাসে তাঁর নামও লেখা থাকবে। কারণ, এটা স্বীকার করতেই হবে যে তিন তালাকের বিরুদ্ধে মুসলিম নারীদের সংগ্রাম সাফল্য পেত না নরেন্দ্র মোদি তাদের সংগ্রামের পাশে অকুতোভয়ে দৃঢ়ভাবে না দাঁড়ালে।


কী কী আছে অর্ডিন্যান্সে তা এক নজরে দেখা যাক। (এক). সরাসরি মুখে, চিঠিতে, টেলিফোনে, এসএমএসে, হোয়াটসঅ্যাপে, বা অন্যভাবে তিন তালাক প্রদান সম্পূর্ণ বেআইনী। (দুই). তিন তালাক প্রদান শাস্তিযোগ্য ফৌজদারী অপরাধ – তিন বছর জেল ও জরিমানা। (তিন). তিন তালাক প্রদান জামিন আযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। পুলিশ অভিযুক্তকে জামিন দিতে পারবে না। আদালতের হাতে জামিন দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছেতবে বিচারকও স্ত্রীর সঙ্গে কথা না বলে তাঁর সম্মতি ব্যতীত জামিন দিতে পারবেন না। এবং দু’পক্ষের কথা শুনে সন্তুষ্ট হলে বিচারক মামলা তুলে নিতেও পারবেন।  (চার). তিন তালাকের বিরুদ্ধে স্ত্রী কিংবা তাঁর বাবার বাড়ির যে কেউ থানায় গিয়ে অভিযোগ জানাতে পারবে। (পাঁচ). তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী তার নিজের ও সন্তানসন্ততির জন্য খোরপোষ চায়তে পারবেন। (ছয়).  সন্তান মায়ের কাছে থাকবে।          
গত বছর লোকসভায় যে বিলটি পাশ হয় তার উপর কয়েকটি সংশোধনী-সহ এই অর্ডিন্যান্সটি জারি করা হয়সংশোধনী আনা হয়েছে বিরোধিদের দাবির ভিত্তিতে। বিলে ছিল যে কেউ অভিযোগ জানাতে পারবে বিলে বিচারকের জামিন দেওয়ার এবং মামলা তুলে নেওয়ার ক্ষমতা ছিলো না। কেন্দ্রীয় সরকার বিরোধিদের দাবি মেনে সংশোধনী-সহ রাজ্যসভায় বিলটি পেশ করে। কিন্তু তবুও সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তারা বিলটি পাশ হতে দেয় নি। তাই সরকারের কাছে অর্ডিন্যান্স জারী করা ছাড়া অন্য বিকল্প ছিলো না। মুসলিম নারীদের তালাকের খড়্গ থেকে বাঁচাতে এবং তাদের ক্ষমতায়নের প্রশ্নে সরকারের পক্ষে এই অর্ডিন্যান্সটি জারি করা জরুরী হয়ে পড়েছিলো 
অর্ডিন্যান্সের বিরুদ্ধে বিরোধিপক্ষ সমস্বরে হৈ চৈ শুরু করেছে। সংসদের উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষে তাঁরা যেভাবে একই সুরে বিলের বিরোধিতা করেছিল ঠিক সেভাবেই তারস্বরে গলা ফাটাচ্ছে অর্ডিন্যান্সের বিরুদ্ধেও। হাজার চেষ্টা করেও মোদির সরকারকে ভোটে হারাবার ক্ষেত্রে তাঁরা একমত ও জোটবদ্ধ হতে না পারলেও মুসলিম নারীদের বিরুদ্ধে তারা সবাই এককাট্টা সংসদের ভিতরে ও সংসদের বাইরে, সর্বত্রই, বিরোধীদলগুলির মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে কে কত বেশী মুসলিম ধর্মগুরু ও মুসলিম পুরুষদের পদলেহন করতে পারে তারই। এক্ষেত্রে ডান বামে কোনো প্রভেদ নেই। মুসলিম নারীদের অন্যায় তালাকের জুলুম থেকে রক্ষা করা, ওদের একটু নিরাপত্তা দেওয়া এবং ওদের হাতে কিঞ্চিত ক্ষমতা তুলে দেওয়ার যে প্রয়াস করছে বিজেপি সরকার তাকে বাঞ্চাল করতে গোটা বিরোধী পক্ষই ঐক্যবদ্ধভাবে মরিয়া হয়ে উঠেছে। আধুনিক যুগে মানব সভ্যতার ইতিহাসে নিশ্চিতভাবেই এটা একটা জঘন্য দৃষ্টান্ত ও কুৎসিত অধ্যায়।
তিন তালাক আইনটি মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের অংশ। মুসলিম ব্যক্তিগত আইনটি যে সম্পূর্ণ নারীবিরোধী ও পুরুষকেন্দ্রিক তা মুসলিম বিশ্বেও স্বীকৃতি লাভ করেছে আর তাই তো ২২টি মুসলিম দেশ - যার মধ্যে সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, পাকিস্তান, বাংলাদেশ প্রভৃতি দেশগুলি অন্তর্ভুক্ত –  তিন তালাক আইনকে নিষিদ্ধ করেছে ২২টি মুসলিমদেশেই আদালতের মাধ্যমে তালাক প্রদান বাধ্যতামূলক করেছে এবং স্ত্রীকেও তালাক দেওয়ার ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। ঐ দেশগুলি বহুবিবাহকেও নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছে। অথচ ভারতের মত একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশে তিন তালাক আইন-সহ  মুসলিম ব্যক্তিগত আইনটি আজও অপরিবর্তিত ও অক্ষত রয়েছে যা বিশ্বের সামনে আমাদের মাথা হেঁট করেছে।   
কংগ্রেস দল দীর্ঘ সময় ধরে দেশ শাসন করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে তিন তালাককে বেআইনি ও দণ্ডনীয় ফৌজদারী অপরাধে রূপান্তরিত করে আজ যে গৌরবজনক ইতিহাস তৈরী করলেন সে ইতিহাস তৈরী করার সুযোগ ছিলো জহরলাল নেহরু উত্তর যুগের কংগ্রেস দলের প্রধানমন্ত্রীদের সামনে। ভারতের সংবিধান প্রণেতাগণ সে দায়িত্ব তাঁদের কাঁধে অর্পণ করে যান। সংবিধানের নির্দেশনায় স্পষ্ট বলা আছে যে, সংবিধানে মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের অন্তর্ভুক্তি একটা অস্থায়ী ব্যবস্থা মাত্র, যত দ্রুত সম্ভব এটা বাতিল করে সবার জন্যে একই আইন প্রণয়ন করতে হবে। কংগ্রেস দলের কোনো প্রধানমন্ত্রীকেই সংবিধানের সেই নির্দেশনা কার্যকরী করার বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখা যায় নি। বরং তাঁরা সচেতনভাবে তার বিপরীত পথে হেঁটেছেন। পশ্চাদপদ মুসলিম ব্যক্তিগত আইনটি বাতিল করার পরিবর্তে তাকে আরও সুরক্ষিত করার ব্যবস্থা করেছেন। যেমন দৃষ্টান্ত এক - কংগ্রেসের সবচেয় জনপ্রিয় নেত্রী ইন্দিরা গান্ধী সংবিধানের নির্দেশনার বিপরীত পথে হেঁটে ১৯৭২ সালে তৈরী করে দেন নিখিল ভারত মুসলিম ব্যক্তিগত আইন পর্ষদ (All India Muslim  Personal law Board) ইন্দিরা গান্ধীর এই পদক্ষেপটি মুসলিম সমাজের বিরাট সর্বনাশ করেছে। এর পেছনে অতিশয় হীন একটা উদ্দেশ্য ছিলো। তা হলো মুসলিম সমাজকে মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে আরো নিবিড়ভাবে যাতে শৃঙ্খলিত করতে পারে তার জন্যে মুসলিম ধর্মগুরুদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। দৃষ্টান্ত দুই – ইন্দিরা গান্ধীর পুত্র রাজীব গান্ধী যখন প্রধানমন্ত্রী তখন সুপ্রিম কোর্ট শাহবানুর খোরপোষ মামলায় তাঁর পক্ষে রায় দেয়। সে রায়ের মূল কথা ছিল এই যে, তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর যদি তার নিজের ও সন্তানের ভরণপোষনের সামর্থ না থাকে তবে তার স্বামীকে তাদের খোরপোষ দিতে হবে। মানবতা ও মানবাধিকারের দৃষ্টিতে এটা ছিল একটি ঐতিহাসিক রায়। মুসলিম ধর্মগুরুগণ কিন্তু সেই রায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং রায়টি বাতিল করার জন্যে সরকারের কাছে দাবী জানায়।  ইন্দিরা গান্ধী নিখিল ভারত মুসলিম ব্যক্তিগত আইন পর্ষদ তৈরী করে মুসলিম ধর্মগুরু ও গোঁড়া মুসলমানদের মাথায় তুলে দিয়েছিলেন, ফলে তারা সুপ্রীম কোর্টের রায়কে বাতিল করার দাবিতে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করার ঔদ্ধত্য ও দুঃসাহস দেখাতে পেরেছিলো। রাজীব গান্ধী সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ের পক্ষে না দাঁড়িয়ে মোল্লা সমাজের পক্ষে দাঁড়ান। সংসদে বিল এনে সুপ্রিম কোর্টের রায়কে খারিজ করে দেন। রাজীব গান্ধীর এই পদক্ষেপটিও যে মুসলিম সমাজের বিরাট সর্বনাশ করেছে তা বলা বাহুল্য। ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে মুসলিম নারী ও মুসলিম সমাজের এরূপ ভয়ঙ্কর সর্বনাশ করেন একদম বিনা বাধায়। তথাকথিত গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ কোনো বাম বা ডান দলই বিরোধিতা করে নি। কংগ্রেস এ সব হীন করেছে মুসলিম ভোট পাবার স্বার্থে। কারণ মুসলিম সমাজে পুরুষরাই নারীর ভোটও নিয়ন্ত্রন করে। ঐ একই কারণে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও হয় চুপ ছিলো না হয় ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধীকে সমর্থন করেছিলো। বামপন্থীরা খুব আদর্শ ও নীতির বড়াই করে। বলে যে, নীতি ও আদর্শের জন্য সবকিছু ত্যাগ করা যায়, কিন্তু কোনো কিছুর জন্যেই নীতি ও আদর্শ ত্যাগ করা যায় না। কিন্তু মুসলিম ভোট ব্যাঙ্ক ধরে রাখার স্বার্থে নীতি ও আদর্শ ত্যাগ করতে তারা একবারও দ্বিধা করে নি।   
কংগ্রেস, অন্যান্য অধিকাংশ পেটি বুর্জোয়া দল ও তামাম বামপন্থী দলগুলি নির্লজ্জভাবে সেই ঐতিহ্য এখনও বহন করে চলেছে। ফলে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি সরকার যখন মুসলিম নারীর স্বার্থে তিন তালাক আইন নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করছে তখন তারা নানা অজুহাতে তুমুল বিরোধিতা করেছে। লোকসভায়  বিরোধিতা করেছে, রাজ্যসভায় বিরোধিতা প্রবল বিরোধিতা করে বিলটি আটকে দিয়েছে, এখন অনন্যোপায় হয়ে সরকার যখন অর্ডিন্যান্স জারি করেছে তখনও বিরোধিতা চালিয়ে যাচ্ছে। ওঁদের অজুহাতগুলি ছেঁদো বা বিভ্রান্তিমুলক বৈ নয়।  ওঁরা কী কী বলছেনঃ
·         এক). ভোটের স্বার্থে তিন তালাক নিষিদ্ধ করতে চাইছে বিজেপি। তিন তালাক নিষিদ্ধকরণ তো জনস্বার্থ, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে অত্যন্ত জরুরী একটি পদক্ষেপ। ভোটের স্বার্থেই বিজেপি যদি এ কাজটি করে সেটা কি দোষের?
·         দুই). সামনে লোকসভা ভোট তাই বড্ড তাড়াহুড়ো করে অর্ডিন্যান্স এনেছে সরকার। এ অভিযোগটি বিভ্রান্তিকর বৈ নয়। কারণ, ক). তিন তালাক নিষিদ্ধ করার বিলে তারা সর্বাত্মক বিরোধিতা করেছে। তাদের কয়েকটি দাবী মেনে বিলে সংশোধনী আনা সত্ত্বেও তারা দু দু’বারই রাজ্যসভায় সর্বাত্মক বিরোধিতা অব্যাহত রাখে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে  বিলটিকে আটকে দেয়। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে, তিন তালাক বেআইনী করতে অর্ডিন্যান্স ছাড়া সরকারের সামনে বিকল্প কিছু ছিলো না।
·         তিন). সুপ্রিম কোর্ট যেহেতু তিন তালাক বেআইনি ঘোষণা করেছে তাই তিন তালাক বাতিল করতে আইন প্রণয়ন করায় তাড়াহুড়ো করার প্রয়োজন ছিল না। এটা এক ধরণের ডাহা মিথ্যাচার। কারণ, সুপ্রিম কোর্ট তিন তালাক বেআইনি বলে রায় দিলেও তিন তালাক অব্যাহত রয়েছে এবং তিন তালাকের অভিযোগ নিয়ে থানায় গেলে পুলিশ আইন নেই বলে অভিযোগ নিচ্ছে না। সরকারি হিসেব মতে সুপ্রিম কোর্ট রায়ের (২৯/৮/১৭) পর এ বছর (২০১৮) ১৩ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২০১ টি তালাকের ঘটনা ঘটেছে। তালাকের সব ঘটনার খবর সরকারের কাছে থাকে না। সুতরাং কোনো সংশয় নেই যে, তিন তালাকের ঘটনার প্রকৃত সংখ্যাটা আরো অনেক বেশী। এই পরিসংখ্যানটি প্রমাণ করে যে সরকারের বিরুদ্ধে তাড়াহুড়ো করে অর্ডিন্যান্স জারি করার অভিযোগটি করে বিরোধিরা কত বড়ো মিথ্যাচার করছে।      
·          চার). তিন তালাক দেওয়ার অপরাধে স্বামীর কারাবাসের বিধিতে আপত্তি তোলা হচ্ছে এই অজুহাতে যে, এটা স্ত্রীর পক্ষেই ক্ষতিকর, কারণ স্বামীর জেল হলে কে খোরপোষ দেবে? এটাও একটা প্রতারণামূলক অজুহাত। কারণ, শরিয়তি তালাক আইনে খোরপোষ দেওয়ার বিধান নেই। সুতরাং স্বামীর জেল না হলে তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী খোরপোষ পাবে, জেল হলে পাবে না - এমন কথা বলার অর্থ হলো মুসলিম নারীর সাথে সজ্ঞানে প্রতারণা করা।   
·         পাঁচ). তিন তালাক বাতিল আইনের বিরুদ্ধে তাদের আর একটি বড় আপত্তি হলো এই যে, এই আইনের না কি পুরুষদের বিরুদ্ধে অপব্যবহার হতে পারে। এরূপ অভিযোগ উত্থাপন সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কারণ, তিন তালাক না দিলে কারো বিরুদ্ধে এই আইন প্রয়োগ করার প্রশ্নই ওঠে না। সুতরাং এটা একটা হাস্যকর অজুহাত বৈ নয়। নির্লজ্জ মানুষদের পক্ষেই এমন অজুহাত খাড়া করা সম্ভব।
তিন তালাক নিয়ে বিজেপি ও বিরোধী দলগুলির মধ্যে যে তীব্র লড়াই চলছে সেই লড়াইয়ে নাগরিক সমাজ ও মিডিয়ার ভূমিকা খুবই হতাশাব্যাঞ্জক। বিজেপি ও বিরোধীদের মধ্যেকার লড়াইটা আসলে মুসলিম নারী বনাম মোল্লাতন্ত্রের লড়াই। মুসলিম নারী বনাম মুসলিম পুরুষদের লড়াই। এই লড়াইয়ে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি পক্ষ নিয়েছে মুসলিম নারীরএটা একেবারেই অবিশ্বাস্য ঘটনা। অবিশ্বাস্য, কারণ, আরএসএস ও বিজেপি হিন্দুরাষ্ট্রের লক্ষ্যে অবিচল এবং তাদের মূল প্রতিপক্ষ হলো ইসলাম ও ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা। তথাপি মোদিজি তিন তালাককে বেআইনী করতে কেন এত তৎপর ও সংকল্পবদ্ধ তা এক বিরাট রহস্য। অপরপক্ষে তথাকথিত সংখ্যালঘু (মুসলিম) দরদি এবং নারীর সমানাধিকার ও সমাজতন্ত্রের প্রবক্তারা সরাসরি নগ্নভাবে মুসলিম নারীর বিরুদ্ধে মোল্লাতন্ত্রের পক্ষে ওকালতি করছেনএটা প্রমাণ করে যে, এ দেশে এ যুগে কোনো রাজনৈতিক দলেরই নীতি ও আদর্শ বলতে কিছু নেই। এই লড়াইয়ে নাগরিক সমাজের লেখক, বুদ্ধিজীবী ও বিদ্বজনগণ যাঁরা পান থেকে চূণ খসলে, কিংবা কোথাও  মানবাধিকারের ঘটনা ঘটলে তার প্রতিবাদে সরকারের বিরুদ্ধে তৎক্ষণাৎ মুখর হন তাঁরা চূড়ান্ত রূপে মূক ও বধির সেজে বসে রয়েছেন। তাঁদের এই ভূমিকা শুধু হতাশাব্যাঞ্জকই নয়, ভীষণ লজ্জাজনকও। অন্যদিকে মিডিয়ার বৃহৎ অংশ কার্যতঃ অবস্থান নিয়েছে নিয়েছে মুসলিম নারীর বিরুদ্ধে কংগ্রেস, টিএমসি, সিপিআই, সিপিএম সহ তামাম বিরোধী পক্ষ তিন তালাক বিরোধী বিল ও অর্ডিন্যান্সের বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার করছে সেগুলিকেই তারা ব্যাপক মাত্রায় প্রচার করে জনগণকে বিভ্রান্ত ও বিপথে পরিচালিত করার চেষ্টা করছেপ্রধানতঃ বাণিজ্যিক কারণেই যে মিডিয়া এই অন্যায় পক্ষপাত করছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। কিন্তু নাগরিক সমাজ কেন অন্ততঃ  বিবেকের তাগিদে মুসলিম নারীর ন্যায় লড়াইয়ের পাশে দাঁড়াবার সৎসাহস দেখাতে পারছে না তা চরম বিষ্ময়কর ব্যাপার। নাগরিক সমাজের এই কাপুরুষোচিত বধিরতাকে নিন্দা জানাবার ভাষা আমার নেই।

Saturday, June 16, 2018

হিজাব সকল মুসলিম নারীর জন্যেই প্রযোজ্য, কেবল মুহাম্মদের পত্নী ও কন্যাদের জন্যে নয়


হিজাব কী শুধু মুহাম্মদের পত্নী ও কন্যাদের জন্যে প্রযোজ্য, না কি সকল মুসলিম নারীর জন্যেই? এ প্রশ্নে মুসলিম সমাজ দ্বিধা বিভক্ত। মুসলিম সমাজ আবার বহুধা বিভক্ত হিজাব পরার ধরণ নিয়ে। বহুধা বিভক্ত হিযাবের প্রেক্ষাপট নিয়েও। বহুধা বিভক্ত হিজাবের পোশাক নিয়েও। হিযাবের তৃতীয় ও চতুর্থ বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের প্রচুর অবকাশ রয়েছে। কিন্তু প্রথম দুটি বিষয় নিয়ে মতভেদ থাকার কথা নয়। তবুও আছে প্রবলভাবেই আছে।
হিজাব কাদের জন্যে তা নিয়ে মতভেদ ও বিতর্ক কেন?
 
Hijab for safety of women, ensures they're not harassed
হিজাব নিয়ে মতভেদ ও বিতর্ক যেটা আছে সেটা তৈরী করা। ইসলামি বিধানে অস্পষ্টতা বা ধোঁয়াশা থাকার কারণে বিতর্ক ও মতভেদ তৈরী হয়েছে এমনটা আদৌ নয়। হ্যাঁ, আবারো বলছি যে, হিজাব কাদের জন্যে প্রযোজ্য এবং কীভাবে হিজাব পরতে হবে সে বিষয়ে ইসলামি বিধান অত্যন্ত প্রাঞ্জল যেখানে অস্পষ্টতা বা ধোঁয়াশা একেবারেই নেই। মুসলিম বুদ্ধিজীবীগণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হিজাব নিয়ে কিছু বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন। মুসলিম বুদ্ধিজীবীগণের মধ্যে যাঁরা মডারেট তকমাধারী বুদ্ধিজীবী তাঁরাই এই বিতর্কের স্রষ্টা। এই বুদ্ধিজীবীরা ইংরাজী পরিভাষায় apologist বলে  পরিচিতএঁরা ইসলামের পশ্চাদপদ, বর্বর ও অমানবিক বিধানগুলিকে প্রাণপণ আড়াল করার চেষ্টা করেন এবং সেই বিধানগুলির মনগড়া বাখ্যা দিয়ে ইসলামের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করে দেখানোর চেষ্টা করেন। এঁরাই বলেন যে, হিজাব প্রযোজ্য কেবল মুহাম্মদের পত্নী ও কন্যাদের জন্যে, সকল মুসলিম নারীর জন্যে নয়। তাঁরা আবার হিজাব পরার ধরণেও মডারেট পন্থার স্রষ্টা।  
আধুনিক যুগে মুসলিম নারীর জন্যে হিজাব পরার বিধানটি অতি নিন্দনীয় একটি কুৎসিত বিধান হিসেবে পরিগণিত। হিজাব অনেকের চোখেই একটি চলমান কারাগার সদৃশ। হিজাবকে নারী দাসত্বের প্রতীক হিসেবেও গণ্য করা হয়। যে যে বিধানগুলির জন্যে ইসলামের কঠোর সমালোচনা ও নিন্দা করা হয় তার মধ্যে অন্যতম একটি হলো হিজাব। মুসলিমরা কিন্তু দাবী করে যে ইসলাম নারীকে পুরুষের অধীনতা ও দাসত্ব থেকে মুক্ত করেছে, নারীকে স্বাধীনতা ও সম্মান দিয়েছে এবং পুরুষের সমানাধিকার দিয়েছে। মুসলিমরা মুহাম্মদকে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ নারীবাদী ব্যক্তিত্ব বলেও দাবী করেন। মুসলিমদের এই সকল দাবীকে সম্পূর্ণ নস্যাত করে দেয় হিজাবের বিধানটিহিজাব শুধু নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যতা,  স্বাধীনতা ও স্বাধিকারই খর্বই করে নি, নারীকে করেছে চরম অপমান ও অপদস্থও। তবে হিজাব আরোপ করে নারীকে খাটো করতে গিয়ে ইসলাম নিজেও কম খাটো হয় নি। হিজাবের কারণে মানব সমাজে ইসলামের মাথাও যথেষ্ট হেঁট হয়েছেহিযাব ইসলামের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল তো করেই নি, বরং ঢের মলিন ও কালিমালিপ্ত করেছে। ইসলামের যে যে বিধানের জন্যে মডারেট মুসলিম বুদ্ধিজীবীগণ প্রচণ্ড বিব্রত বোধ করেন তার মধ্যে একটি হলো হিজাব উলামা (মুসলিম ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ) ইসলামে ভাল মন্দ যা আছে তার সবটার জন্যেই গর্ব বোধ করেন। ফলে কোনো বিধানকেই, তা যতই খারাপ, কুৎসিত ও বর্বর হোক, তাঁরা অস্বীকার ও আড়াল করেন না এবং কোনো বিধানের জন্যেই তাঁরা বিব্রত বোধ করেন নাহিজাবের ক্ষেত্রেও তাঁরা তাই কোনো প্রকার ছলনা করেন না, বরং সৎ ও অকপট থাকেন মডারেট মুসলিম বুদ্ধিজীবীগণ কিন্তু ইসলামের অনেক বিধানের জন্যেই বিব্রত বোধ করেন তাই তাঁরা সেই বিধানগুলির বেলায় উলামার মতো সৎ ও অকপট থাকতে পারেন না। আধুনিক যুগের পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামের যে বিধানগুলি মডারেট মুসলিম বুদ্ধিজীবীদেরকে অস্বস্তিকর ও লজ্জাকর অবস্থায় ফেলে সেগুলির কয়েকটি হলো বহুবিবাহ, মুতা বিবাহ, হালালা বিবাহ, বাল্যবিবাহ, তালাক, জিহাদ, দাসপ্রথা, গণিমতের মাল, ফারাজ আইন, দত্তক আইন, হিজাব ইত্যাদি ইত্যাদি। মুহাম্মদের ব্যক্তিজীবনের বহু ঘটনাও তাঁদের প্রচণ্ড বিব্রত ও লজ্জিত করে। এ রকম বিব্রতকর ও লজ্জাকর অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে তাঁরা ব্যাপক কপটতা ও মিথ্যাচারের আশ্রয় নেন। তাঁরা মিথ্যাচার করেন আপাদমস্তক কুৎসিত ও বর্বর ইসলামি বিধানগুলি বর্ণনা ও বাখ্যা করার সময়। যে বিধানগুলি ইসলামের ভাবমূর্তি মলিন ও মসীলিপ্ত করে সেই বিধানগুলিকে তাঁরা মনের মাধুরী মিশিয়ে এমনভাবে বর্ণনা ও ব্যাখ্যা করেন যাতে ইসলামের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল দেখায়, এবং ইসলামকে একটা মহান ধর্ম বলে দাবী করা যায়ফল হয় এই যে, তাঁদের বর্ণনাকৃত ও ব্যাখ্যাকৃত বিধানগুলির সঙ্গে কোরানে বর্ণিত ও ব্যাখ্যাকৃত বিধানগুলির মধ্যে সামঞ্জস্য থাকে না। শুধু তাই নয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বৈপরীত্যও দেখা যায়। মডারেট মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের মিথ্যাচারের শিকার হিজাবের বিধানও। ফলে হিজাব নিয়ে মুসলিম সমাজে তুমুল মতভেদ ও বিতর্কের উদ্ভব হয়েছে।     
 
হিজাবের কোরানীয় বিধান 
 
কোরানে অনেকগুলি আয়াত আছে যেগুলির সঙ্গে হিজাবের সম্পৃক্ততা রয়েছেকিন্তু শুধু হিজাব নিয়েই অন্ততঃ যে দু’টি আয়াত আছে তাতে অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় বলা হয়েছে যে, সমস্ত মুসলিম নারীকেই হিজাব পরতে হবে। না, শুধু বলাই হয় নি, নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। হিযাবের প্রথম যে আয়াতটি মুহাম্মদ আবৃত্তি করেন ওহীর নামে তাতে হিযাব আরোপ করা হয় তাঁর স্ত্রী ও কন্যা এবং সকল মুসলিম নারীদের উপর। হিজাবের দ্বিতীয় যে আয়াতটি মুহাম্মদ আবৃত্তি করেন সে আয়াতে শুধু মুসলিম নারীদের হিজাব পরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেখানে তাঁর স্ত্রী ও কন্যাদের কথা আলাদা করে উল্লেখ করা হয় নি। হিযাবের প্রথম যে আয়াতটি মুহাম্মদ তাঁর সাহাবীদের শোনান সেটা হলো ৩৩/৫৯ নং আয়াত। এই আয়াতটির আদি সুরা নম্বর হলো ৯০ (নব্বই)। এই আয়াতটির ভাষ্য হলো,         
·          হে নবী (সঃ)! তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে এবং মুমিনদের নারীদেরকে বলঃ তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ তাদের নিজেদের উপরে টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে; ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে নাআল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু” (সুরা আহযাব, ৩৩/৫৯)  
এই আয়াত এটা স্পষ্ট করেছে যে, শুধু নবীর স্ত্রী ও কন্যাদেরকেই নয়, সকল মুসলিম নারীকেই হিজাব পরতে হবে। হিজাবের যে আয়াতে মুহাম্মদের পত্নী ও কন্যাদের কথার উল্লেখ নেই, কেবল সাধারণ মুসলিম নারীর কথা বলা হয়েছে সেটি হলো ২৪/৩১ নং আয়াত (আদি নম্বর ১০২ একশ’)। এই আয়াতটির বয়ান হলোঃ
·         “এবং বিশ্বাসিনী নারীদিগকে বল, তারা যেনো স্ব স্ব দৃষ্টি সকলকে বদ্ধ করে এবং স্ব স্ব ভূষণ যাহা তাহা হইতে ব্যক্ত হইয়া থাকে তদ্ব্যবতীত প্রকাশ না করে, এবং যেন তাহারা আপন কণ্ঠদেশে স্বীয় বস্ত্রাঞ্চল ঝুলাইয়া রাখে, আপন স্বামী বা আপন শ্বশুর বা আপন পুত্র (এবং পৌত্র) বা আপন স্বামীর পুত্র (সপত্নীজাত পুত্র) বা আপন ভ্রাতা বা আপন ভ্রাতুষ্পুত্র বা আপন ভাগিনেয় বা আপন (ধর্মাবলম্বী) নারিগণ বা তাহাদের দক্ষিণ হস্ত যাহাদের উপর স্বত্ব লাভ করিয়াছে সেই (দাসীগণ) বা নিষ্কাম অনুগামী পুরুষগণ এই সকলের এবং যাহারা নারিগণের লজ্জাজনক ইন্দ্রিয় সম্বন্ধে জ্ঞান রাখে না সেই শিশুদিগের নিমিত্ত ভিন্ন তাহারা আপন আভরণ যেন প্রকাশ না করে, এবং তাহারা যেন আপন শব্দায়মান (ভূষণযুক্ত) চরণ বিক্ষেপ না করে, তাহা করিলে তাহারা আপন ভূষণ যাহা গোপন করিয়া থাকে (লোকে) তাহা জানিতে পাইবে, এবং হে বিশ্বাসিগণ, তোমরা একযগে ঈশ্বরের দিকে ফিরিয়া আইস, সম্ভবতঃ তোমরা মুক্ত হইবে” (সুরা নুর, ২৪/৩১)  

৩৩/৫৯ নং আয়াতটি স্পষ্টতই জারি হয়েছে মুহাম্মদের স্ত্রী, কন্যা ও সকল মুসলিম নারীদের উদ্দেশ্যে। ২৪/৩১ নং আয়াতটি জারি হয়েছে সকল মুসলিম নারীর জন্যে যেখানে তাদের উদ্দেশ্যে বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে জানানো হয়েছে যে কীভাবে হিজাব পরতে হবে এবং কার কার সামনে হিজাব পরার দরকার নেই। ৩৩/৫৯ নং আয়াতে মুসলিম নারীদের কেন হিজাব পরতে হবে তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে যে, এতে তাদের চেনা সহজ হবে; ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না অর্থাৎ নারীদের হিজাব পরার আদেশ দেওয়া হয়েছে যাতে তাদের কেউ ‘উত্যক্ত’ না করে। ‘উত্যক্ত’ হওয়ার হাত থেকে মুহাম্মদ নিশ্চয় সকল মুসলিম নারীকে রক্ষা করার কথাই ভেবেছেন, শুধু তাঁর স্ত্রী ও কন্যাদের রক্ষা করার কথাই  ভাবেন নি। সুতরাং নিঃসংশয়ে বলা যায় যে, মডারেট মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা  যা বলেন (হিজাবের বিধান শুধু মুহাম্মদের স্ত্রী ও কন্যাদের জন্যেই প্রযোজ্য, সাধারণ মুসলিম নারীর জন্যে নয়) তা নির্ভেজাল মিথ্যা।

বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে হিজাব
 
হিজাব কথাটা এসেছে আরবি ‘হাজাবা’ শব্দ থেকে। হাজাবা শব্দের অর্থ আড়াল করা। হিজাবের মূল উদ্দেশ্যই হলো নারীর চেহারা পুরুষের সামনে থেকে আড়াল করা। আরও স্পষ্ট করে বললে নারীকে পর পুরুষের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা। প্রাক ইসলাম যুগে নারী পুরুষ স্বচ্ছন্দে মেলামেশা করতো, পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতো, নারী পছন্দ করে বিয়ে করতে পারতো ও বিয়ে ভাঙতে পারতো, এক কথায় নারী অনেক স্বাধীন ছিলো এবং তাদের অনেক অধিকার ছিলো। ইসলাম নারীর সে সমস্ত অধিকারগুলি একে একে হরণ করে নিয়েছে। আল্লাহর দোহায় দিয়ে মুহাম্মদ যে যে বিধানগুলির সাহায্যে নারীর সমস্ত অধিকার হরণ করেছেন তার মধ্যে হিজাব হলো অন্যতম একটি। হিজাব বলতে আমরা সাধারণতঃ বুঝি যে এটা মুসলিম নারীর জন্যে কেবল ঘরের বাইরে রাস্তাঘাটে চলাফেরা করার সময় প্রযোজ্য। কিন্তু আসলে তা নয়, হিজাব নারীর জন্যে আপন গৃহের মধ্যেও সমান প্রযোজ্য। আসলে হিজাব একটা অনেক বড়ো বিষয় শরিয়তি সংস্কৃতিতে, এটা শুধু এক টুকরো কাপড় দিয়ে নারীর শরীর বা চেহারা ঢেকে ফেলার বিষয় নয়। তাই হিযাবের নানা দিক আছে, নানা ধরণ আছে। হিযাবের আর একটি সহজ প্রতিশব্দ হল পর্দা। ইসলামে নারীর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী জোর দেওয়া হয়েছে এই পর্দার উপর। হিজাব বা পর্দার মূল উদ্দেশ্য হলো নারীকে পুরুষজাতির (স্বামী এবং রক্তযোগ আছে এমন কতিপয় পুরুষ ছাড়া) থেকে সম্পূর্ণ আড়াল করা, বিচ্ছিন্ন করা এবং আপন গৃহের বাইরের জগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা। এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত করার জন্যে ইসলাম নারীকে তার বাস গৃহের মধ্যেই অন্তরীণ থাকার নির্দেশ দিয়েছে। নারীকে গৃহবন্দী থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কোরানের ৩৩/৩৩ নং আয়াতে। সেই আয়াতে বলা হয়েছে,
·                 "তোমরা আপন আপন গৃহ সকলে স্থিতি করিতে থাক ও প্রাক-জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না।"  

পূ    নামাজ পড়ার জন্যে মুসলমানদের মসজিদে যাওয়ার নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু নারীর ক্ষেত্রে মুহাম্মদ বলেছেন যে তারা মসজিদে যেতে পারে, তবে তাদের জন্যে বাড়িই উত্তম। তিনি ঠিক কী বলেছেন তা শোনা যাকঃ
·     রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর বাদীদেরকে আল্লাহর মসজিদে যেতে বাধা প্রদান করবে না। কিন্তু তাদের উচিত যে, তারা বাড়ীতে যে সাদাসিধা পোশাকে পরে থাকে ঐ পোশাক পরেই যেন মসজিদে গমন করে।” অন্য একটি রেওয়াতে আছে যে, স্ত্রীলোকদের জন্য বাড়ীই উত্তম। (তফসিরঃ ইবনে কাথির, ১৫ খণ্ড, পৃষ্ঠা – ৭৮৪) 
মুহাম্মদ নারীকে মসজিদে যেতে নিরুৎসাহিত করেছেন কেন? সেটা যে তাদেরকে পুরুষজাতি ও বাইরের জগত থেকে  বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যেই তা বলা বাহুল্য। পুরুষজাতির থেকে নারীকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার জন্যে পুরুষকেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কোরানে। সেই নির্দেশে বলা হয়েছে যে তারা যেন নারীর কাছ থেকে কিছু চাইলে আড়াল থেকেই চায়। সেই নির্দেশটি হলো,
·            "তোমরা তাঁদের (নবী পত্নীদের) নিকট কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাও। এই বিধান তোমাদের ও তাদের হৃদয়ের জন্য অধিকতর পবিত্রতার কারণ।" (৩৩/৫৩) 
 
উপরের আয়াতটি যদিও মুহাম্মদের সাহাবিদের উদ্দেশ্যে জারি করা হয়েছে, কিন্তু এর মধ্যে দিয়ে আসলে সমস্ত মুসলমান পুরুষ ও নারীদের কাছেই একটা স্পষ্ট বার্তা পাঠানো হয়েছে যে পুরুষরা চেনাজানা  বা প্রতিবেশী কোনো পরিবারের নারীর কাছে কিছু চাইলে যেন পর্দার আড়াল থেকেই চায়নারীর একান্ত প্রয়োজনেও যদি ঘরের বাইরে যাওয়া আবশ্যক হয়ে পড়ে তবুও একা তার বাইরে যাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মুহাম্মদ বলেছেনঃ
·             কোনও স্ত্রী লোক যেন সাথে মুহরিম আত্মীয় ছাড়া একাকি একদিন এক রাত্রির দুরত্ব অতিক্রম না করে।  (তিরমিযি শরীফ, হাঃ নং১১০৬ )
পাছে নারী একাকী বাইরে গিয়ে অন্য পুরুষের সাথে কথা বলে, তাদের সাথে মেলামেশা করে, তাই নারীর উপর এই অন্যায় ও অপমানকর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে এমনকি নারীকে অন্ধ লোকের সামনেও পর্দা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ কথা শোনা গেছে মুহাম্মদের স্ত্রীদের কাছ থেকেইসেই হাদিসটি বর্ণনা করেছেন মুহাম্মদের পত্নী  উম্মে সালমা হাদিসটি এরূপঃ
·               "হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি এবং হযরত মাইমুনা (রাঃ) রাসূলুল্ললাহ (সঃ) – এর নিকট ছিলেন এমন সময় হযরত ইবনে উম্মে মাকতূম (রাঃ) তথায় আগমন করেনএটা ছিলো পর্দার হুকুম নাযিল হওয়ার পরের ঘটনা। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা পর্দা কর।” তাঁরা বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তিনি তো অন্ধ লোক। তিনি আমাদেরকে দেখতেও পাবেন না এবং চিনতেও পারবেন না।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তোমরা তো অন্ধ নও যে তাকে দেখতে পাবে না?” (দ্রঃ ইবনে কাসিরের তফসির, ১৫শ’ খণ্ড, ২৪/৩১ – এর তফসির, পৃঃ ১৪৪)
অন্ধ পুরুষ মানুষের সামনেও নারীকে পর্দা করতে হবে কেন? মুহাম্মদের স্ত্রীদের প্রশ্ন বা আপত্তি ছিলো যথার্থ। কিন্তু মুহাম্মদ তাঁদের আপত্তি উড়িয়ে দিয়েছেন তাচ্ছিল্যের সঙ্গে যেভাবে স্বৈরশাসকরা উড়িয়ে থাকেন। নারীজাতিকে পুরুষজাতি ও বহিঃর্জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও নিঃসঙ্গ করতেই মুহাম্মদ অন্ধ পুরুষদের সামনেও নারীকে পর্দা করার নির্দেশ দেন। এসব কুৎসিত উদাহরণগুলি থেকেও এটা বোঝা যায় যে, মুহাম্মদ হিযাবের বিধান আরোপ করেছেন সমগ্র মুসলিম নারীর উপর, শুধু তাঁর স্ত্রী ও কন্যাদেরে উপর নয়

মূলত মডারেট মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের সৌজন্যে শুধু হিজাবের বিধান নিয়েই নয়, ব্যাপক বিতর্ক ও মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে হিজাবের আকার, আয়তন ও ধরণ নিয়েও। এটার উপর আলোকপাত করবো অন্য একটি লেখায়।

 
 

বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাইনি – পাঁচ

  দ্বিতীয় অধ্যায় শেখ হাসিনা ও শেখ মুজিবের প্রতি তীব্র গণরোষের নেপথ্যে ২০২৪ এর জুলাই অভ্যুত্থানের সফল পরিসমাপ্তি ঘটে ৩৬ দিন পর (৫ই ...