Thursday, July 9, 2015

মুহাম্মদের স্ত্রী রায়হানা ছিলেন একজন ইহুদি সেনাপতির স্ত্রী



রায়হানা ছিলেন  মদিনার ইহুদিদের বানু কুরাইজা গোষ্ঠীর সেনাপতির স্ত্রী  ।  মুহাম্মদের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছিলো এক ভয়ঙ্কর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সংঘটিত হওয়ার পর । মুহাম্মদের এই বিয়েটা  নিয়ে ব্যাপক মতভেদ রয়েছে । রায়হানা ছিলেন ইহুদিদের বনি কুরাইজা গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত  বন্দিনী সহস্রাধিক নারী ও শিশুদের একজন ।   এই গোষ্ঠীর সমস্ত পুরুষকে হত্যা করার পর সকল বন্দি শিশু ও বন্দিনী নারীদের মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়েছিলো ।  রায়হানা  মুহাম্মদের ভাগে পড়েছিলেন । কেউ বলে রায়হানাকে মুহাম্মদ নিজেই পছন্দ করে  নিজের  হেফাজতে নিয়ে  তাঁকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন । বিয়ে করার জন্যে প্রথমে নুহাম্মদ তাঁকে ইসলামে দীক্ষা নিতে বলেন ।  কিন্তু রায়হানা স্বধুর্ম ত্যাগ করে মুসলমান হতে অসম্মতি জানালে  মুহাম্মদ তাঁকে দাসী তথা উপপত্নী করে রাখেন ।  ঐতিহাসিকদের একটা মত হলো যে রায়হানা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মুহাম্মদের ধর্ম গ্রহণ করেন নি এবং দাসী ও উপপত্নী অবস্থাতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন । আর একটা মত অন্য কথা বলে -  রায়হান পরে  ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং মুহাম্মদ  তাঁকে বিয়ে করেছিলেন   ।  পরের মতটাই অধিক বিশ্বাসযোগ্য ।  যাঁরা প্রথম মতের পক্ষে তাঁদের মধ্যে অন্যতম  মোহাম্মদ হোসাইন হেইকল,  মুহাম্মদের মিশরীয় জীবনীকার,  লিখেছেন, “বানু কোরাইজা গোত্রের একজন বন্দিনী, নাম রায়হানা, বণ্টনের সময় মহানবী (সাঃ) – এর ভাগে পড়ে ।  মুহাম্মদ [সাঃ]  তাকে  ইসলাম গ্রহণের জন্য দাওয়াত দেন । কিন্তু রায়হানা একগুঁয়েমি করে তা প্রত্যাখান করে । মুহাম্মদ [সাঃ] তাকে বিবাহের প্রস্তাব করেন । কিন্তু রায়হানা বন্দিনী জীবনই বেছে নেয় । এটা তার নিজস্ব ধর্মপ্রীতি এবং জনগণের প্রতি গভীর মমত্ববোধেরই পরিচায়ক । ইসলাম গ্রহণ করে মুহাম্মদকে বিবাহ করলে ওসবের মায়া পরিত্যাগ করতে হবে ।” [দ্রঃ মহানবী (সঃ) – এর বিবাহ, মহম্মদ সাদাত আলি, পৃ – ৯৬]   প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে হেইকল একজন ইসলামের অন্ধ অনুরাগী ব্যক্তিত্ব ।  দ্বিতীয় মতের পক্ষের গবেষক-লেখক    ইসলামের আর একজন অন্ধ অনুরাগী  ড: মাজিদ আলি খান  লিখেছেন – “... রায়হানা যখন মহানবী [সাঃ] – এর ভাগে পড়ে, নবীজী তাকে স্বাধীনতা দেন ও বিবাহের প্রস্তাব করেন । কিন্তু রায়হানা দাসীত্বই বেছে নেয় । কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি  ইসলাম গ্রহণের পর নবীজী রায়হানাকে বিবাহ করেন এবং মহানবী [সাঃ] বিদায় হজে থেকে প্রত্যাবর্তনের পর রায়হানা ইন্তেকাল করেন এবং  জান্নাতুল বাকীতে দাফন করা হয় ।” [দ্রঃ – ঐ, পৃ-৯৭]  প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে রায়হানাকে মুহাম্মদ যখন বিয়ে করার প্রস্তাব দেন তখন তাঁর  চার জন স্ত্রী বিদ্যমান ছিলেন । চারজন স্ত্রীর উপরে আর একজন নারীকে বিয়ে করাটা নিসঃন্দেহে নিন্দনীয় কাজ ।  তাই এই নিন্দনীয় কাজটা আড়াল করার জন্যে এই বিয়েটাকে বৈধ বলতেই হয় । তা করতে গিয়ে ইসলামের অনুরাগী লেখকগণ এমন কিছু যুক্তির অবতারণা করেছেন  যেগুলি  অপযুক্তিই বৈ নয় ।   হাফিজ গোলাম সারওয়ার, তিনিও গবেষক-লেখক বলে খ্যাত,  লিখেছেন, “মহানবী [সাঃ] যদি রায়হানাকে বিবাহের প্রস্তাব নিজের হাত বাড়িয়ে দিয়ে থাকেন তবে তা অবশ্যই তাকে [রায়হানাকে] রক্ষা করার জন্য, এর পেছনে স্বার্থপরতার কোনো উদ্দেশ্য ছিলো   না । ” [দ্রঃ – ঐ, পৃ-৯৬]   কিন্তু ঘটনা হলো যে  রায়হানাদের বন্দি ও দাসী করার আগে  মুহাম্মদ ও তাঁর শিষ্যরা মিলে  বানু কুরাইজা গোষ্ঠীর  সমস্ত পুরুষকে  [৮০০ থেকে  ৯০০ জন] হত্যা করা হয়েছিলো  যাদের মধ্যে  রায়হানার স্বামী, পিতা ও আত্মীয়-স্বজনরাও ছিলেন । রায়হানার স্বামী, পিতা, ভ্রাতা, আত্মীয়-স্বজন সবাইকে নৃসংসভাবে  হত্যা করে তাঁর কোন স্বার্থ  রক্ষা করতে চাওয়া হয়েছিলো ? একে   নিষ্ঠুর রসিকতা ছাড়া আর কী বলা যায় !   আবার  অনেকেই  বলেছেন যে    মুহাম্মদ  রায়হানাকে বিয়ে করেছিলেন  ইহুদিদের সঙ্গে মুসলমানদের মিলন সেতু গড়বার জন্যে    !   ড.ওসমান গণি, মুহাম্মদের জীবনীকার, এ প্রসঙ্গে লিখেছেন –“... এবং পরবর্তী সময়ে  ইহুদিনী রায়হানাকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করেছিলেন । এর গূঢ় তাৎপর্য ছিল, মহানবী [সাঃ] খ্রীস্টান ও ইহুদীদের সঙ্গে ভালবাসা ও সম্প্রিতি স্থাপনের জন্য উদার প্রাণে, কত মুক্তমনে খ্রীস্টান  এ ইহুদীদের স্ত্রীরূপে গ্রহণ করেছিলেন । এই অসবর্ণ বিবাহগুলো ছিল তার জ্বলন্ত প্রমাণ । তাছাড়া ওই সময়ে  সমস্ত মহিলাদের বিবাহ করার অন্য কোন কারণ ছিল না ।”  [দ্রঃ মহানবী, পৃ-৩৯৩]   একটা সম্প্রদায়ের সমস্ত পুরুষদের হত্যা করে, তাদের সমস্ত শিশু ও নারিদের বন্দি করে দাস-দাসী বানিয়ে তাদেরই একজন বন্দিনীকে বিয়ে করে মুহাম্মদ তাদের সাথে সম্প্রীতি স্থাপন করতে চেয়েছিলেন ?  ‘কাটা ঘায়ে নুনের  ছিটে দেওয়া’  আর কাকে বলে ?   এই প্রবাদ বাক্যটিও যেন যথেষ্ট নয় পৈশাচিক ও নৃশংস এই  ঘটনাটিকে বোঝানোর জন্যে  । রায়হানার ক্ষেত্রে যা ঘটেছে তাকে পৃথিবীর ইতিহাসে  এক নজিরবিহীন মানসিক নির্যাতনের এক বিরল দৃষ্টান্ত বললে অত্যুক্তি হয় না । অথচ এমন অমানবিক  ও জঘন্য ঘটনাটিকেই  মুসলিম ঐতিহাসিক ও পণ্ডিতরা অবলীলায় বর্ণনা করেছেন ইহুদীদের সঙ্গে ভালবাসা ও সম্প্রিতি স্থাপনের এক মহান উদ্যোগ ও প্রয়াস হিসেবে । এতো নির্লজ্জ ওকালতির ঘটনাও বোধ হয় ইতিহাসে বিরল ।
এখন প্রশ্ন হলো কয়েকশো বন্দি নারীর মধ্যে রায়হানাকেই কেনো মুহাম্মদ  বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন ? ইহুদিদের সঙ্গে ভ্রাতৃত্ব স্থাপনের জন্যে তো নয়ই । তা হলে কেন ? তা  বুঝতে  হলে   মুহাম্মদ ও রায়হানার বিয়েটা যে  প্রেক্ষাপটে সংঘটিত হয়েছিলো তার উপর দৃষ্টিপাত করতে হবে । সেই ঘটনাটি এরূপঃ
ঘটনাটি ঘটেছিলো ৬২৭ খৃস্টাব্দে খন্দক যুদ্ধের ঠিক অব্যবহিত পরেই । খন্দক যুদ্ধ হয়েছিলো মক্কার কোরেশদের সঙ্গে মুহাম্মদের বাহিনীর ।  তার আগে কোরেশরা  মুহাম্মদের বাহিনীর হাতে বারবার আক্রান্ত হয়েছে ।  সে সব আক্রমণে একদিকে যেমন তাদের বিপুল ধন-সম্পত্তি লুণ্ঠিত হয়েছে তেমনি অপরদিকে  মুসলমানদের হাতে তাদের অনেকেরই প্রাণহানিও ঘটেছে । তাই তারা এক সময় স্থির করে যে মুসলমানদের আক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে হলে তাদের চিরতরে আরবের বুক থেকে মুছেই ফেলতে হবে ।  সে উদ্দেশ্য নিয়েই বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে কোরেশরা মদিনা আক্রমণ করেছিলো । সৌদি আরবের এ যুগের বিশিষ্ট জীবনীকার সফি-উর-রহামান আল-মুবারকপুরী  খন্দক যুদ্ধের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লিখেছেন -  Modern Saudi biographer Safi-ur-Rahman al-Mubarakpuri expresses the right idea: . . . "[I]t was wise for the Muslims to bring the commercial routes leading to Makkah [Mecca] under their control" (p. 201). Then he lists eight raids between 623 and the Battle of Badr in AD 624. In each one, Muslims were the aggressors, to accomplish the big objective of strangling Mecca’s trade. These raids that sometimes involved hundreds of men continued steadily from that time to the Battle of the Trench. The Meccans had had enough. So they wanted to finish off Islam, once and for all.  [ http://www.answering-islam.org/Authors/Arlandson/qurayza_jews.htm]  মুহাম্মদ আগে থেকেই কোরেশদের এই আক্রমণের খবর জানতে পেরে মদিনার বাইরে তিন দিক জুড়ে বিরাট পরিখা খনন করান ।  কোরেশরা  সেই পরিখা ডিঙোতে না পেরে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে যায় । পরিখার দু’পার থেকে  পনের দিন ধরে দু’পক্ষই একে অপরকে  আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণ করেছিলো ।  যুদ্ধটা ইতিহাসে খন্দক যুদ্ধ নামে পরিচিত যদিও যুদ্ধটি আসলে দুর্লঙ্ঘ সেই পরিখাটির জন্যে হতেই পারে নি ।  কোরেশরা মক্কায় ফিরে যাওয়ার অব্যবহতি পরেই মুহাম্মদ তাঁর বাহিনীকে নিয়ে  অতর্কিতে ও বিনা প্ররোচনায় বানু কুরাইজা গোষ্ঠীর মহল্লার বিরুদ্ধে অভিযান করেন । কুরাইজা গোষ্ঠীর নিরীহ লোকেরা তখন আত্মরক্ষার্থে তাদের দূর্গ মধ্যে আশ্রয় নেয় । মুহাম্মদ তাদের মহল্লায় খাদ্য ও পানীয় জল সহ সমস্ত কিছুই প্রবেশ নিষিদ্ধ করেন । পনেরো দিন অবরুদ্ধ থাকার পর খাদ্যের রসদসম্ভার শেষ হয়ে গেলে তারা আত্মসমর্পণ করে । তারা মুহাম্মদদের কাছে তাদের সকলের প্রাণ ভিক্ষা চেয়ে প্রস্তাব পাঠায় । তারা বলে যে  তারা সমস্ত কিছু ছেড়ে দিয়ে সম্পূর্ণ খালি হাতে মদিনা ছেড়ে চলে যেতে প্রস্তুত আছে  । এই প্রস্তাবের জবাবে মুহাম্মদ কী বলেছিলেন তা আলোচনা করার আগে  আরো দু’টো ঘটনার কথা আলোচনা করা আবশ্যক । বানু কুরাইজারা  কেন এতো বড়ো ত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছিলো সেটা বোঝার জন্যেই আগের ঘটনা দু’টো সম্পর্কে অবহিত হতে হবে । ঘটনা দু’টি  এরূপঃ
মদিনায় ইহুদিদের তিনটি গোষ্ঠী বাস করতো । গোষ্ঠী তিনটি হলো বানু কাইনুকা, বানু নাজির ও বানু কুরাইজা গোষ্ঠি । তাদের মধ্যে সদ্ভাব ছিলো না এবং গোষ্ঠীবিরোধ ছিলো প্রকট । ৬২৫ সালে মুহাম্মদ বানু কানুইকা গোষ্ঠীকে মদিনা থেকে  নির্বাসিত করেছিলেন ।  তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিলো যে তারা একজন মুসলিম নারীর শ্লীলতা হানি করেছিল । এই নিয়ে ইহুদিদের সঙ্গে মুসলমানদের ঝগড়ার সূত্রপাত ঘটে এবং একজন মুসলমান ও একজন ইহুদির মৃত্যু হয় । এই ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে মুহাম্মদ তাদের কাছে গিয়ে বলেন, “হে ইহুদীগণ তোমরা যে জঘন্য কুকর্ম করিয়াছ, তাহার যথাযোগ্য প্রতিকার করিতে আমরা প্রস্তুত, আমার উপদেশ এইঃ তোমরা বশ্যতা স্বীকার কর, নতুবা কোরেশদিগের দশাই তোমাদের ঘটিবে ।” [দ্রঃ বিশ্বনবী, আহমদ পাবলিশিং হাউস, ঢাকা, পৃ – ১৬৬,১৬৭]  মুহাম্মদের এই আদেশ প্রত্যাখান করলে মুহাম্মদ তাদের উপর আক্রমণ করেন । তখন তারা ভয়ে দূর্গের মধ্যে আশ্রয় নেয় । দু সপ্তাহ দূর্গে অবরুদ্ধ থাকার পর ইহুদিরা মুহাম্মদের কাছে আত্মসমর্পণ করে । মুহাম্মদ সকলকে নির্বাসন দন্ড দেন । প্রাণ রক্ষার জন্যে বানু কুনাইকা গোষ্ঠীর ইহুদিরা স্বধর্ম ত্যাগ না করে  মদিনা ত্যাগ করে চলে যায় । অনেক  ঐতিহাসিক বলেছেন যে মুসলিম নারীর শ্লীলতাহানির ঘটনাটা ছিলো অজুহাত ।  আসল উদ্দেশ্য ছিলো  তাড়িয়ে দিয়ে তাদের সমস্ত স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির দখল নেওয়া ।  সাধারণ যুক্তিতেই  এটা বোঝা যায় যে একজন নারীর শ্লীলতাহানির ঘটনোর জন্যে গোটা সম্প্রদায় দায়ী হতে পারে না এবং তারজন্যে  সমুদয় সম্প্রদায়কে  নির্বাসনের দণ্ড  দেওয়ারও প্রশ্ন আসে না  । ঠিক তার পরের বছর বানু  নাজির গোষ্ঠীর মহল্লা অবরোধ করেন মুহাম্মদ এই অজুহাতে যে তাদের পক্ষ থেকে মুহাম্মদকে খাবারে বিষ মিশিয়ে তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছিলো । এটাও ছিলো মনগড়া অভিযোগ, কোনো প্রমাণ তিনি দেখাতে পারেন নি । তিনি বলেছিলেন যে স্বয়ং আল্লাহ তাঁকে এই ষড়যন্ত্রের কথা জানিয়েছে ।  শুধু  অবরোধই করেই ক্ষান্ত হন নি  তিনি ।   মুহাম্মদ  নির্দেশে  তাঁর শিষ্যদের  বানু নাজির গোষ্ঠীর সমস্ত খেজুর গাছ কেটে নষ্ট করার হুকুম দেন  । খেজুর গাছ কাটার জন্যে মুহাম্মদকে  প্রবল সমালোচনার মুখে পড়তে হয় । এমন কি তাঁর শিষ্যরাও অনেকেই এটা মেনে নিতে পারেনি । তখন তিনি আল্লাহর দোহায় পাড়েন । বলেন আমি যা করেছি আল্লাহর নির্দেশেই করেছি । তিনি আবৃত্তি করে শোনান একটা আয়াত  – “তোমরা যে কতক খেজুর গাছ কেটেছো অথবা ওর শিকড়ের উপর তাকে দন্ডায়মান অবস্থায় পরিত্যাগ করেছো [ অর্থাৎ কতকগুলো না কেটে রেখে দিয়েছো ] তা তো আল্লাহর অনুমতিক্রমেই ।”   [ কোরান – ৫৯/৫]  বানু নাজির গোষ্ঠির লোকেরা  দিন পনেরো পর  আত্মসমর্পণ করলে  মুহাম্মদ  তাদের  নির্বাসন দন্ডে  দন্ডিত করেন ।  ফলে প্রাণ রক্ষার্থে বানু নাজির গোষ্ঠীর  লোকজনও  বানু কুনাইকাদের মতই চিরদিনের মতো মদিনা ছেড়ে চলে যায় । এই দু’টি নজিরবিহীন  অমানবিক নির্বাসনের  পরিপ্রেক্ষিতেই বানু কুরাইজা গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে মুহাম্মদকে তারা বলেছিলো যে তাদেরকে  অবরোধ মুক্ত করলে তারাও মদিনা ছেড়ে চলে যাবে ।  
কিন্তু মুহাম্মদ  বানু কুরাইজাদের  প্রস্তাবকে  সরাসর প্রত্যাখান করেন   । তিনি বলেন যে, তোমরা আমার সঙ্গে চুক্তি   ভঙ্গ করে কোরেশদের পক্ষে আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিয়েছো, তাই তোমাদের বিচার করা হবে । আগেই বলেছি যে যুদ্ধটা আসলে হয়ই নি । খন্দক যুদ্ধ  যে বিনা যুদ্ধেই শেষ হয়েছিলো তা নিয়ে  ঐতিহাসিকদের মধ্যে কোনো  মতভেদ নেই ।  কবি গোলাম মোস্তফা, ইসলাম ও মুহাম্মদের অন্ধ অনুরাগী,  এ প্রসঙ্গে কী বর্ণনা দিয়েছেন তা  শোনা  যাক । তিনি লিখেছেন – “আবু সুফিয়ান ভাবিয়াছিল, দুই-এক দিনের মধ্যেই তাহারা মদিনা জয় করিয়া আসিবে । কিন্তু দুই সপ্তাহ কাটিয়া গেল, তবু কিছুই হইল না ।  তখন সকলেই মহা দুর্ভাবনায় পড়িল । অবরোধ তুলিয়া তাহারা ফিরিয়া যাইবার মতলব করিল ।”  তিনি আরো লিখেছেন, “ আকাশে কালো মেঘ দেখা দিল । দেখিতে দেখিতে ভীষণ মরুঝটিকা উত্থিত হইয়া কোরেশদিগের সমুদয় ছাউনি উড়াইয়া লইয়া গেল । মুষলধারে বৃষ্টিপাত আরম্ভ হইল । শিবিরে আগুন নিভিয়া গেল । রসদপত্র ও অন্যান্য উপকরণও ভাঙয়া-চুরিয়া লণ্ড-ভণ্ড । ... ভীত-ত্রস্ত ও দিশেহারা হইয়া কোরেশগণ সেই রাত্রেই মদিনা পরিত্যাগ করিয়া তাড়াতাড়ি মক্কার পথ ধরিল ।” [দ্রঃ বিশ্বনবী, পৃ – ২০২,২০৩]  একই কথা বলেছেন ইবনে ইশাক ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন  ঐতিহাসিক আলা তাবারিও । তাঁরা বলেছেন,   Early biographer Ibn Ishaq says—and modern historians are in complete agreement—that "[t]he siege continued without any actual fighting" (p. 454). Early historian Tabari agrees: "The Messenger of God and the polytheists stayed in their positions for over twenty nights—nearly a month—with no warfare between the troops, except for the shooting of arrows and the siege" (vol. 8, p. 17). Again, modern western scholars agree on this point. http://wikiislam.net/wiki/The_Genocide_of_Banu_Qurayza]  অর্থাৎ এটাই সত্যি যে খন্দক যুদ্ধে যেখানে প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধই হয় নি সেখানে বানু কুরাইজাদের মুহাম্মদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কথাটাই অবান্তর  ।  তথাপি মুহাম্মদ তাদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ মনগড়া অভিযোগ নিয়ে এসেছিলেন এবং তাদের বিচারও করেছিলেন । আসলে ওটা ছিলো বিচারের নামে একটা মস্ত বড়ো প্রহসন  । আর সেটা   পৃথিবীতে বিচারের নামে যতগুলি প্রহসন হয়েছিলো তাদের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট । জার্মানির রাইখস্ট্যাগ নিজে পুড়িয়ে হিটলার  যেমন কম্যুনিস্টদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে বিচারের নামে প্রহসন করেছিলেন, কিংবা রাসায়নিক অস্ত্র রাখার মিথ্যা অভিযোগে আমেরিকা যেমন সাদ্দামের বিরুদ্ধে বিচারের নামে প্রহসন করেছিলেন,  ঠিক সে রকমই একটি প্রহসন ছিলো বানু কুরাইজাদের বিরুদ্ধে এই বিচারটি । এই প্রহসনে বিচারক নিয়োগ করা হয়েছিলো মদিনার আউস গোত্রের  যে লোকটিকে      [সা’দ বিন মাজ] সে লোকটি তার স্বধর্ম [ইহুদি]  পরিত্যাগ করে কিছুদিন আগেই মুসলমান হয়েছিলো এবং খন্দক যুদ্ধে মুহাম্মদের পক্ষে  যুদ্ধ করেছিলো । তাই কোনো সন্দেহ নেই যে সা’দ যে রায় দিয়েছিলো তা ছিলো পূর্বনির্ধারিতই যেমন জার্মানির সংসদ ভবন [রাইখস্ট্যাগ] পোড়ানোর বিচার ও সাদ্দামের বিচারের রায় ছিল পূর্বনির্ধারিত । সা’দ যে রায় দিয়েছিলো  সেটাই সম্ভবত  ইতিহাসের সবচেয়ে কুৎসিত ও বীভৎস রায় ।  সা’দের রায়ে  ছিলো – “মুসলমানদিগের সহিত সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করার দরুন সমুদয় ইহুদি পুরুষদিগের প্রাণদন্ড হইবে, স্ত্রীলোক এবং বালক-বালিকাগণ দাস-দাসীরূপে পরিগণিত হইবে এবং ইহুদীদিগের সমস্ত সম্পতি মুসলিম সৈন্যদিগের মধ্যে ভাগ করিয়া দেওয়া হইবে। ” 
প্রহসন পর্ব শেষ হলে বানু কুরাইজাদের  সমস্ত  পুরুষদের মুণ্ডুচ্ছেদ করে হত্যা করা হয় ।  তাদের মৃতদেহগুলিকে মাটিতে পুঁতে ফেলার জন্যে মদিনায় একটা বাজারে একটা গণকবর খোঁড়া হয়েছিল । এক সঙ্গে ৭/৮ জনের একটা দলকে পিছনে হাত দুটো বেঁধে কবরের কাছে নিয়ে এসে লাইন দিয়ে হাঁটু ভাঁজ করে দাঁড় করিয়ে দিয়ে তারপর  মুণ্ডূচ্ছেদ  করে তাদের লাশগুলো ঐ কবরে ফেলে দেওয়া হয়েছিলো ।  এই নৃশংস গণমুণ্ডুচ্ছেদ কাণ্ড শেষ হতে অন্ধকার নেমে এসেছিলো ।  নিধন পর্ব শেষে মাটি দিয়ে ভরাট করে দেওয়া হয়েছিলো গণকবরটি । তারপর ঐ ইহুদি সম্প্রদায়ের সমস্ত নারী ও শিশুকে মুহাম্মদের সামনে এনে লাইন  করে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছিলো । মুহাম্মদ তাদের অবজ্ঞাপূর্ণ দৃষ্টিতে অবলোকন করছিলেন ।  বানু কুরাইজাদের প্রধান সেনাপতির স্ত্রী মাত্র ঊনিশ বছর বয়সী রায়হানা ছিলেন অপূর্ব সুন্দরী । তাঁকে দেখা মাত্রই তাঁর রূপ-সৌন্দর্য ও দেহসৌষ্ঠব দেখে তিনি মুগ্ধ ও অভিভূত হয়ে পড়েন এবং তাঁকে বিয়ে করবেন বলে স্থির করে ফেলেন  ।  তাই তিনি তাঁর শিষ্যদের   রায়হানাকে তাঁর ভাগে রেখে দিতে বলেন ।  বন্দিনী নারীদের একটা দলকে মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করে দিয়ে একটা দলকে মুহাম্মদ  বাজারে বিক্রি করে  দিয়েছিলেন । বন্টন পর্ব শেষ হলে তিনি রায়হানাকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষা নিতে বলেন । রায়হানা প্রত্যাখান করেন । মুহাম্মদ তখন তাঁকে  উপপত্নী করে রেখে দেন । এবং সেই বর্বর গণহত্যাকাণ্ডের পর পরই  তিন দিন ধরে  তিনি রায়হানার  সঙ্গে মধুচন্দ্রিমা যাপন করেন । ভয়ঙ্কর এই ঘটনাটি ইরানী বংশোদ্ভূত খ্যাতনামা ঐতিহাসিক আনোয়ার হেকমত  কীভাবে বর্ণনা করেছেন তা দেখা যাক –
There was a charming young girl among them by the name of Rayhana, who lost her husband and all of her male relatives in the massacre. As soon as muhammad’s eye caught sight of the wretched Jewess in the long line of women and children, an irresistible passion to posses her came over him. He signaled his soldiers to bring her as his share of booty. “As they passed before the conqueror, his eyes marked the lovely Rayhana, and he destined her for himself.”
The girl is reported to have been around nineteen and as she refused to embrace Islam, she was sent to his harem as a concubine: the honeymoon started that very night of massacre and lasted three days.” [Vide: Women and the Koran, Page – 50, 51]
ইহুদি রমণী রায়হানাকে মুহাম্মদের বিয়ে করার এই হলো প্রেক্ষাপট । রায়হানাকে বিয়ে করার পসচাতে মুহাম্মদের কোনো খারাপ উদ্দেশ্য ছিলো না । বরং তাঁকে রক্ষা করা এবং  ইহুদিদের সঙ্গে   ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক নির্মাণ করাই ছিলো মুহাম্মদের প্রকৃত উদ্দেশ্য বলে যা দাবি করা হয় তা যে  মিথ্যার চরম বেসাতি তা একজন শিশুর পক্ষে বোঝাও কঠিন নয় ।  রায়হানার অসাধারণ রূপ-যৌবন-সৌন্দর্য ও দেহসৌষ্ঠব দেখেই  মুহাম্মদ তাঁর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং তাঁকে বিয়ে করার সেটাই যে  একমাত্র  তা নিয়ে সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই ।
 
  


  

Thursday, July 2, 2015

ধর্ম মানুষকে হিন্দু, মুসলিম, খৃষ্টান, আরো কতো কী বানায়, কেবল ‘মানুষ’ বানায় না


আদিম যুগে ধর্মের জন্ম হয়েছিলো প্রধানত অজ্ঞতা, ভয় ও আতঙ্ক থেকে । প্রাকৃতিক দুর্‍্যোগ মানুষকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলতো,  জঙ্গলবাসী বিষাক্ত সাপ ও পোকা-মাকড় এবং হিংস্র পশুর ভয়েও সদা ত্রস্ত থাকতো ।  এই সব বিপদ থেকে রক্ষা পেতে মানুষ নানা দেব-দেবী ও অলৌকিক শক্তির  কল্পনা করে তাদের সন্তুষ্ট করতে নানা আচার-অনুষ্ঠান করতো । এগুলোই পরবর্তীকালে ধর্মরূপে প্রচার ও প্রতিষ্ঠা পায় । সে কালের ধর্মের কেন্দ্রে স্বভাবতই যেমন ঈশ্বরের ধারণা ছিলো না, তেমনই ছিলো না পরকালের ধারণা ।  হাজার হাজার বছর ধরে মানব সমাজে  ধর্ম বলতে এ রকমই ছিলো । অনেক অনেক কাল পরে ধর্মের সঙ্গে  ঈশ্বর তথা স্রষ্টার ধারণা যুক্ত হয় । সেটা এমনি এমনি হয় নি । একদল মানুষ আর একদল মানুষকে ঠকাবার জন্যে, শাসন ও শোষণ করার জন্যে ধর্মকে হাতিয়ার করে নেয়। তখন থেকেই ধর্ম হয়ে ওঠে ঈশ্বরকেন্দ্রিক । এই নিবন্ধের আলোচনা এই ঈশ্বরকেন্দ্রিক ধর্ম [Religion]  নিয়েই ।
 ধর্ম, ধর্মীয় মৌলবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তি পরস্পরের পরিপূরক । ধর্ম থেকে উৎপত্তি ধর্মীয় মৌলবাদের এবং ধর্মীয় মৌলবাদ থেকে উৎপত্তি ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তির । এটাই সঠিক সমীকরণ । কিন্তু এই সমীকরণটি ভুল বলে নিরবচ্ছিন্ন প্রচার করা হয় অথবা এই সমীকরণটি গোপন  করার অপচেষ্টা পরিলক্ষিত হয় । ধর্ম ভালো, আর ধর্মীয় মৌলবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদীরা মন্দ কিংবা ধর্ম শান্তি, সম্প্রীতি অহিংসার কথা বলে, ধর্মীয় মৌলবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদীরা  অশান্তি, হিংসা ও বিভেদের কথা বলে – এই তত্ত্বটা একেবারেই ভুল, অবৈজ্ঞানিক ও অবাস্তব । যাঁরা এই তত্ত্ব প্রচার করেন তাঁদের একটি অতিশয় ক্ষুদ্র অংশ হয়তো সত্যিই শান্তি ও সম্প্রীতি চায়, কিন্তু বৃহৎ অংশটা সচেতনভাবে  মানুষকে প্রতারিত করার জন্যে এই মিথ্যেটা নানা অপযুক্তির ধুম্রজাল বুনে নিরবচ্ছিন্ন প্রচার করে । ধর্মীয় মৌলবাদের জন্মই ধর্মের গর্ভে এবং যাঁরা ধর্মীয় মৌলবাদের প্রচার ও প্রয়োগ করে  তাঁরাই ধর্মীয় মৌলবাদী । যাঁরা ধর্ম থেকে ধর্মীয় মৌলবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদীদের বিচ্ছিন্ন করার ডাক দেয় তাঁরা মিথ্যে মোহ সৃষ্টি করে মাত্র । কেউ সজ্ঞানে করে কেউ অজ্ঞতায় করে ।
অনেক মনীষীই ধর্মের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন বা করার চেষ্টা করেছেন । কার্ল মার্কস ধর্মকে আফিঙ বলেছেন । ব্রাট্রার্ন্ড রাসেল বলেছেন, সব ধর্মই ক্ষতিকর ও অসত্য । কবি সুধিন্দ্রনাথ ধর্ম সম্পর্কে বলেছেন, আরণ্যক নির্বোধের ভ্রান্ত দুঃস্বপ্ন । বিখ্যাত ব্যক্তিদের ধর্ম সম্পর্কে এই উক্তিগুলি নিশ্চয়ই সত্য ও যথার্থ, তবু যেন ঠিক যথার্থ মনে হয়, এই বাখ্যায় মন ভরে না, মন্তব্যগুলো খুব নিরীহ মনে হয় । বরং বাংলাদেশের তরুণ কবি রুদ্র মহম্মদ শহীদুল্লাহর মন্তব্যটি  অনেক বেশী স্পষ্ট, বলিষ্ঠ ও যথার্থ  মনে হয় । তিনি বলেছেন, ধর্ম হলো হেমলক বিষ । হ্যাঁ, চারিদিকে তাকালে, খুব ভালোভাবে  নিরীক্ষণ করলে মনে হয় ধর্মের চেয়ে ভয়ঙ্কর নেশা, ধর্মের চেয়ে ভয়ঙ্কর বিষ, ধর্মের চেয়ে ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর, ধর্মের চেয়ে ভয়ঙ্কর মিথ্যে আর কিছু নেই । ধর্ম তো হেমলক বিষই, তার চেয়েও মারাত্মক কোনো বিষ থাকলে ধর্ম হলো তাই-ই । ধর্ম কেবল মিথ্যাই নয়, প্রতারণার আর প্রবঞ্চনার আর এক নাম ধর্ম । ধর্ম কতো অনায়াসে ও কতো অবলীলায় যে মানুষকে ধোঁকা দেয়, ঠকায়, বোকা বানায় যা আমাদের তাজ্জব করে দেয় ! ধর্ম মানুষকে হিন্দু বানায়, মুসলমান বানায়, খৃষ্টান বানায়, ইহুদি বানায়, আরো কতো কী বানায়, কেবল ‘মানুষ’ বানায় না । ধর্ম মানুষকে শুধু ভাগ আর ভাগের ভাগই করে না, মানুষকে স্বার্থপর করে, লোভী করে,আত্মকেন্দ্রিক করে, সঙ্কীর্ণকরে, নীচ করে, হীন করে, বিদ্বেষী করে, হিংস্র করে, জঙ্গি করে, নিষ্ঠুর করে, বর্বর করে, অমানবিক করে, হৃদয়হীন করে, বিবেকহীন করে, যুক্তিহীন করে, নির্বোধ করে, অন্ধ করে; ধর্ম মানুষকে উগ্র করে, গোঁড়া করে, ধর্ম আবার হাজার হাজার   মানুষকে ঘাতকও করে । আরো যা কিছু কুৎসিৎ আছে মানব সমাজে ধর্ম মানুষকে সে সবই করে । ধর্ম কেবল মানুষকে সত্যিকারের মানুষ, নির্ভেজাল মানুষ করে না । আমরা একথা ভুলতে পারি না যে লাদেন, মোল্লা ওমর, আল-জাওয়াহিরি, আবুবকর আল-বাগদাদী [আইএসের খলিফা], আবুবকর সেকাও [বোকো হারামের নেতা], আল-মাওদুদী, গোলাম আজম, দেলওয়ার হোসাইন সাঈদী প্রমুখ মুজাহিদরা ইসলামের সৃষ্টি; দামোদর বিনায়ক সাভারকার [বীর সাভারকার], হেডগাওয়ার, গোলওয়ালকার, ভাগবত, নাথুরাম গডসে, অশোক সিংঘল, প্রবীণ তোগাড়িয়া, উমাভারতী, লালকৃষ্ণ আদবানি [বাবরি মসজিদ ধ্বংসকাণ্ডের সেনাপতি], মোদি [গুজরাটে মুসলিম নিধনকাণ্ডের নেপথ্য নায়ক] প্রমুখ হিন্দু মৌলবাদীরা হিন্দু ধর্মের সৃষ্টি; এবং যারা সক্রটিস ও ব্রুনোকে হত্যা করেছিলো তারা খৃস্টান ধর্মের সৃষ্টি । হ্যাঁ একথা ঠিক যে ঈশ্বরবিশ্বাসী মানুষদের মধ্যেও ভালো মানুষ আছে যারা সৎ, সুন্দর, উদার, দয়াবান,  সহনশীল, ধৈর্যশীল, ক্ষমাশীল ও মননশীল । তাদের সংখ্যা খুবই কম এবং তাদের মধ্যে বিদ্যমান এসব সদগুণে ধর্মের কোনো ভূমিকা নেই, কৃতিত্ব নেই ।  তাদের মধ্যে এই যে ভালো গুণাবলী রয়েছে সেতা এজন্যে যে তারা ধর্মের প্রভাব কাটাতে সক্ষম হয়েছেন । তারা ধর্মের প্রভাব কাটাতে পেরেছেন বলে মানুষ হিসেবে তাদের অনেকটাই উত্তরণ সম্ভব হয়েছে ।   ধর্মবিশ্বাসী ভালো মানুষগুলো ধর্মের যাবতীয় ক্ষতিকর উপাদানগুলো ধারণ না করে বর্জন করেছেন বলে তারা ভালো মানুষ হতে পেরেছেন । এখন প্রশ্ন হলো ধর্মের উপাদানগুলো কেনো অহিতকর ও ক্ষতিকর । এটা বুঝতে হলে  তার উৎস-মূলে যেতে হবে ।  
মানুষের যে প্রথম সমাজ ব্যবস্থাটা ছিলো সেটা আদিম সাম্যবাদী সমাজ নামে ইতিহাসে খ্যাত । তখন মানুষের মধ্যে শ্রেণি ছিলো না, শোষণ ছিলো না, রাষ্ট্রও ছিলো না । এবং অবশ্যই তখন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মও ছিলো না । হাজার হাজার বছর মানুষ ধর্ম বা ঈশ্বর ছাড়াই বেঁচেছিলো, কখনোই তাদের ঈশ্বরের প্রয়জনও পড়ে নি । মানব সমাজ যখন বিভক্ত হলো দুটো শ্রেণিতে, একদিকে দাস ও আর একদিকে দাস-মালিক,  সে সময় আবির্ভাব হলো রাষ্ট্রের । সে সময়েই, কিছু আগে পরে উদ্ভব হয় ধর্মেরও ।  শুরু হলো যেমন মানুষের উপর মানুষের শোষণ, প্রায় তার সাথে সাথে  দেখা দিলো  শোষিত শ্রেণিকে দমন-পীড়নের প্রয়োজনও । দমন-পীড়নের জন্যে রাষ্ট্রের প্রয়োজন হলো, ফলে  আবির্ভাব হলো রাষ্ট্রেরও । তখন থেকেই  ধর্মকে হাতিয়ার করাও শুরু হয় । ধর্ম হয়ে ওঠে  ক্রীতদাসদের শোষণ করার হাতিয়ার, এবং  তাদের দমন করার হাতিয়ারও । শাসন-শোষণ এবং দমন-পীড়নকে  ন্যায়সঙ্গত ও যুক্তিগ্রাহ্য করে তোলার জন্যে জোর কদমে শুরু হয় মিথ্যে প্রচারনা ও প্রতারণা ঈশ্বরের নামে ।  তোমরা দাস হয়ে জন্মেছো, কষ্ট ভোগ করছো, এ সবই  ঈশ্বরের  বিধিলিপি, তোমাদের পূর্ব জন্মের পাপের ফল । যারা দাস-মালিক তারা তাদের পূর্ব জন্মের সুকর্মের সুফল ভোগ করছে, ওদের প্রতি ক্ষোভ করো না, হিংসা করো না । ঈশ্বরের বিধান মেনে শান্ত থাকো, ঈশ্বরকে স্মরণ করো, মরণের পর স্বর্গ পাবে, এবং পরের জন্মে সুখ পাবে । তথাকথিত ঈশ্বরের এই বাণীগুলো এখনো প্রচার করা হয়, মানুষ বিশ্বাসও করে ।  এই বাণীগুলোই প্রমাণ করে যে, ধর্ম এসেছে মানব কল্যাণের জন্যে নয়, এসেছে শোষক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করার জন্যেই । আসলে ধর্ম ঈশ্বর প্রেরিত কোনো আলোর দর্শন নয়, শোষক শ্রেণি ও শাসক শ্রেণিই ঈশ্বরের স্রষ্টা এবং ওই শোষক শ্রেণিই ঈশ্বরকে সৃষ্টি করে তথাকথিত অমরলোকের গল্প বানিয়ে সেখান থেকে  ঈশ্বরকে মর্তে [মানব সমাজে] স্থাপন করেছে তাদের নিজেদের স্বার্থ পূরণ ও চরিতার্থ করতে,  লোকার চোখে ধূলো দিতে,  তাইতো তারা বলে ঈশ্বর নিরাকার, অদৃশ্য ।
ঈশ্বর ও ঈশ্বরের  ধর্ম যে তাদেরই সৃষ্টি তা আরও স্পষ্ট বোঝা যায় যখন দেখা যায় যে সমাজ ব্যবস্থার   বিকাশ, পরিবর্তন ও রূপান্তরের সাথে সাথে কতো সুন্দরভাবে ও কতো সামঞ্জস্যপূর্ণরূপে  ঈশ্বরের বাণীগুলো  তথা ধর্মের বিধানগুলোও পাল্টে পাল্টে যায় । দাস সমাজে ঈশ্বরের বিধান ছিলো – দাসকে পশুর মতো কেনা-বেচা ও হত্যা করা বৈধ, তাতে দোষ নেই, পাপ নেই । সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় ঈশ্বরের বিধান পাল্টে যায় । ঈশ্বরের নামে এক শ্রেণির যাজক বললো – দাসকে হত্যা করা শুধু পাপই নয়, মানুষকে দাস করে রাখাও পাপ । দাসদের মুক্তি দিতে হবে । ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় ঈশ্বরের বিধান আবার বদলে গেলো । এই সমাজে  একদল যাজক ঈশ্বরের দোহাই দিয়ে বললো – মানুষকে শুধু ক্রীতদাসত্ব থেকেই নয়, মুক্তি দিতে হবে ভূমিদাসত্ব থেকেও  । দাস-মালিকদের পরাস্ত করে রাষ্ট্র ক্ষমতা যখন কেড়ে নিয়েছে সামন্ত শ্রেণি তখন তাদের দখলে থাকা বিশাল ভূ-সম্পত্তি চাষ করার জন্যে প্রচুর লোক দরকার । কিন্তু মানুষ তো দাস-মালিকের হাতে বন্দি ।  রাষ্ট্র তখন  মানুষকে ক্রীতদাস করে রাখা ও হত্যা করা নিষিদ্ধ করলো  ।  তখন ঈশ্বরও  তার  বিধানে  পরিবর্তন  নিয়ে এলো । মালিকদের কাছ থেকে ক্রীতদাসগণ মুক্তি পেয়ে দলে দলে সামন্তপ্রভুর কাছে কাজের জন্যে নাম লেখাতে শুরু করলো । সামন্তপ্রভুরা আইন তৈরী করলো যে  কেউ ভূস্বামীদের অনুমতি ছাড়া অন্য কারো অধীনে কাজে যেতে পারবে না । নতুন সমাজ ব্যবস্থায় ক্রীতদাসরা ভূমিদাসে পরিণত হলো । তারপর এক সময় বুর্জোয়া শ্রেণি  রাষ্ট্রক্ষমতা কেড়ে নিলো সামন্ত শ্রেণির কাছ থেকে ।   তাদের শিল্পের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানোর জন্যে অনেক শ্রমিক দরকার, কিন্তু পাবে কোথায়, সবাই তো ভূমিদাস হয়ে বন্দি হয়ে আছে সামন্ত শ্রেণির কাছে  । বুর্জোয়া রাষ্ট্র সামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্রের আইন পরিবর্তন করে  মানুষকে  ভূমি থেকে মানে ভূমিদাসত্ব মুক্ত করে দিলো তাদের স্বার্থে । মুক্ত মানুষ এবার মজুরীর  বিনিময়ে  মজুরের খাতায় নাম লেখালো বুর্জোয়া শ্রেণির অধীনে । মার্কসের ভাষায়  ভূমিদাসরা মজুরিদাসে পরিণত হলো ।  বুর্জোয়া রাষ্ট্রের তৈরী করা নতুন নতুন আইনের সাথে সাথে পাল্টে যেতে থাকলো তখন ঈশ্বরের বাণী ও বিধানও । সমাজবিকাশ ও বিবর্তনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে এই ভাবেই যেমন যেমন শাসক ও শোষক শ্রেণির রঙ ও রূপ তথা শ্রেণি চরিত্র পাল্টায় তেমনি তেমনি ঈশ্বরের বিধানগুলোও কী চমৎকারভাবে পাল্টে পাল্টে যায় । রাষ্ট্রের আইনের ক্রমাগত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঈশ্বরের বিধানগুলির এই ক্রমাগত ও ধারাবাহিক পরিবর্তনগুলি প্রমাণ করে যে পৃথিবীতে যতো ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থ আছে সবই মনুষ্য সৃষ্টি । সুতরাং এটা স্পষ্ট যে ধর্মের  জন্ম মিথ্যার পাঁকে;  ধর্মের জন্ম হয়েছে মানুষকে ঠকাবার জন্য, ধোঁকা দেবার জন্যে; ধর্মের জন্ম মানুষকে স্বর্গের লোভ দেখিয়ে বা নরকের ভয় দেখিয়ে লোভী, কাপুরুষ, ভীতু ও পুতুল বানাবার জন্যে । সে জন্যেই মানব সমাজে ধর্মের চেয়ে মন্দ কিছু আর নেই  । ধর্ম কোনো কালে বা কোনো যুগে উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ ও সমাজ বিকাশের পথা সহায়তা দেয় নি, বরং প্রতি পদে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে । মানব সমাজের উন্নতি ও বিকাশের জন্যে তাই ধর্মের স্বরূপ উন্মোচন করা, ধর্ম যা তাকে মানুষের সামনে ঠিক সেভাবেই উপস্থাপন করা একান্তই আবশ্যক । ধর্মীয় মৌলবাদের শিকড় যেহেতু ধর্মের গর্ভেই রয়েছে তাই ধর্মীয় মৌলবাদকে ধর্ম থেকে পৃথক করে আলাদা করে তার বিরুদ্ধে লড়াই করা শুধু অর্থহীনই নয়, এ ধরণের লড়াই এক প্রকার  নগ্ন প্রতারণাও । যাঁরা ধর্মের বন্দনা করেন অথচ ধর্মীয় মৌলবাদীদের সমালোচনা করেন  তাঁরা ভণ্ড ও প্রতারক শ্রেণিভুক্ত জীব বৈ নয় ।  এঁই শ্রেণিভুক্ত মুখোশধারী বুদ্ধিজীবীগণ ধর্মীয় মৌলবাদীদের হাতকেই শক্তিশালী করেন । তাই ধর্ম, ধর্মীয় মৌলবাদ আর এই ভণ্ড ও প্রতারক বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ব্যতীত মানব সমাজের কল্যাণ ও বিকাশে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব নয় ।
ধর্ম, ধর্মান্ধতা ও ধর্মীয় মৌলবাদের ধারক ও বাহকরা হলেন যাজক সম্প্রদায় । ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম তাই প্রকৃত অর্থে যাজকতন্ত্রের বিরুদ্ধেই সংগ্রাম । মুসলিম সমাজের যাজকগণ সাধারণভাবে মোল্লা নামে পরিচিত । মাওলানা, মুফতি, ইমাম প্রভৃতি ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানী ব্যক্তিরা মোল্লা সমাজের অন্তর্ভুক্ত । এঁরা যে তত্ত্ব অনুসরণ করেন সেটাই মোল্লাতন্ত্র । সেই তত্ত্ব হলো  সারা পৃথিবীতে – কী রাষ্ট্রীয় জীবনে কী সমাজ জীবনে – ইসলামি তথা শরিয়তি শাসন কঠোরভাবে বাস্তবায়িত করা । বলা বাহুল্য যে   ইসলামি যাজকতন্ত্র তথা মোল্লাতন্ত্র অন্যান্য যাজকতন্ত্র  থেকে অনেক  বেশী শক্তিশালী ।  এটা শুধু এদেশেই নয়, সমগ্র বিশ্বের ক্ষেত্রেই এটা সত্যি  । এর ফলে অবশ্য সব থেকে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মুসলিম সমাজই, তারাই পড়ে রয়েছে সব চেয়ে বেশি পশ্চাদে ।  তার প্রধান কারণ,  মোল্লাতন্ত্রই তো  মুসলিম সমাজের কল্যাণ ও বিকাশের পথকে রুদ্ধ করে রেখেছে ।  এই পশ্চাদপদতা দূর করতে তাই সব চেয়ে  জরুরী কাজ হলো মোল্লাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা । বলা বাহুল্য যে এই  সংগ্রামটা সবচেয়ে কঠিন সংগ্রামগুলির একটি । ইসলাম ধর্ম এবং এই ধর্মের প্রবর্তক মুহাম্মদের সামান্যতম সমালোচনা সহ্য করার মতো ন্যূনতম সহনশীলতা এবং  গণতান্ত্রিক চেতনা ও  মূল্যবোধ আজো সারা বিশ্বে মুসলিম সমাজ অর্জন করতে পারে নি । সামান্য সমালোচানাতেও  মুসলিম সমাজ অসম্ভবব উত্তেজিত ও অস্থির হয়ে ওঠে । এমনকি হয়ে ওঠে ভয়ঙ্কর রকমের হিংস্রও  । এটা মানব সমাজের পক্ষে যতোটা ভীতিকর, তার চেয়েও বেশী লজ্জাকরও ।  মুসলিম সমাজের কোনো যুক্তিবাদী মানুষ যদি সেরূপ  সমালোচনা সামান্য মাত্রাতেও করে তবে তো পরিস্থিতিকে  আরো ভয়ঙ্কর করে তোলে মোল্লা সমাজ । কোরানের পুনঃ পুনঃ শাস্তির হুমকির কথা – সীমা লঙ্ঘনকারীদের আল্লাহ ক্ষমা করে না, তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর শাস্তি – বারবার ধর্মীয় নেতারা উচ্চারণ করেন, কথায় কথায় স্মরণ করিয়ে দেন । মুসলিম সমাজের যাঁরা বলেন শরিয়তি আইনগুলো অন্ধভাবে অনুসরণ না করতে, বলেন যে যুক্তি ও বাস্তবতার নিরিখে যেগুলো অনাবশ্যকীয় ও হানিকর সেগুলো বর্জন করতে,  তাঁদের সীমালঙ্ঘনকারী ও মোরতাদ  তকমা দিয়ে মোল্লা-মুফতি সমাজ তাঁদের প্রতি হিংস্র হয়ে ওঠে এবং  তাঁদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের ফতোয়া জারি করে ।  সেই ফতোয়া কার্যকর করার জন্যে মুসলিম সমাজের একদল ধর্মান্ধ ও হিংস্র মানুষ  উন্মত্ত হয়ে ওঠে  । জাত উগ্র ও  হিংস্র ফতোয়াবাজ সেই মোল্লা সমাজের  হাতেই মুসলিম সমাজ আজো কুক্ষিগত হয়ে রয়েছে । ফলতঃ প্রায় চোদ্দ শ’ বছরের পুরানো ও জরাজীর্ণ সেই শরিয়তি আইন-কানুন, শরিয়তি মূল্যবোধ ও আদর্শ এবং শরিয়তি শিক্ষা-সংস্কৃতিতেই  মুসলিম সমাজ এখনো আবর্তিত হচ্ছে এবং ক্রমাগত পশ্চাদগামী হচ্ছে । মুসলিম সমাজের তাই  উন্নতি ও অগ্রগতির প্রধান শর্তই হচ্ছে শরিয়তের ফাঁস থেকে এই সমাজটাকে মুক্ত করা এবং একটি  গণতান্ত্রিক ও বিজ্ঞান-মনস্ক আধুনিক সমাজ গড়ে তোলা । যে সব মুসলিম বুদ্ধিজীবী  ও রাজনীতিকগণ  শরিয়তের প্রশংসা করেন কিংবা শরিয়ত প্রসঙ্গে নীরব থেকে মুসলিম সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন তাঁরাও ভণ্ড ও প্রতারক । এঁরা মোল্লাতন্ত্রের বিরুদ্ধে  সংগ্রামটাকে আরো জটিল ও কঠিন করে তোলেন ।
সংগ্রামটা যতোই জটিল ও কঠিন হোক আমাদের কিন্তু  লড়তেই হবে, কেননা এর কোনো সহজ, সরল ও মসৃণ বিকল্প নেই । শুধু জটিল ও কঠিনই নয়, এটা একটা দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামও বটে । সংগ্রাম করতে হবে যেমন এই সময়ের মোল্লাতন্ত্রের ফতোয়ার বিরুদ্ধে এবং ধর্মীয় গোঁড়ামি ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে , একই সঙ্গে সংগ্রাম চালাতে হবে তেমনি মোল্লাতন্ত্রের উৎস-মুখটা বন্ধ করার লক্ষ্যেও । মাদ্রসাগুলি,  বিশেষ করে  খারিজি মাদ্রাসা ও সিনিয়র মাদ্রাসা, হলো মোল্লাতন্ত্রের একটি উল্লেখযোগ্য ও অন্যতম প্রধান উৎস-মুখ । এই মাদ্রাসাগুলি মোল্লাতন্ত্রকে তার প্রধান নেতৃত্বকারী অস্ত্র মাওলানা,ইমাম ও মুফতি  সরবরাহ করে । মাদ্রাসা সম্পর্কে মুসলমান সমাজের মোহমুক্তি অনেকটাই  ঘটছে ঠিকই, কিন্তু এখনও অসংখ্য মাদ্রাসা চলছে । এই মাদ্রাসাগুলি চলছে প্রধানতঃ মুসলিম সমাজের অর্থেই, যদিও সৌদি আরব ও অন্যান্য ইসলামি রাষ্ট্র থেকে মাদ্রাসার জন্যে প্রচুর অর্থ সাহায্য আসে । মাদ্রাসা সম্পর্কে মোহমুক্তির এই মন্থর গতিকে আমাদের কর্তব্য হলো  দ্রুত গতিতে পরিণত করা  এবং মুসলিম সমাজকে মাদ্রাসা-ব্যাধি থেকে মুক্ত করা । মুসলিম সমাজের দ্রুত উন্নতি ও অগ্রগতির জন্যে আবশ্যক হলো আধুনিক শিক্ষা । যেমন যেমন শিক্ষার্থীর অভাবে মাদ্রাসাগুলি দুর্বল হবে ঠিক সেভাবেই মোল্লাতন্ত্রও দুর্বল হবে এবং মুসলিম সমাজের কল্যাণের রুদ্ধ মুখ খুলে ধীরে ধীরে  যাবে । তাই শুধু আধুনিক শিক্ষার আবশক্যতার কথা বললেই হবে না, এর পাশাপাশি মাদ্রাসা শিক্ষা ও মাদ্রাসাকে  বর্জন করার কথাটাও স্পষ্ট করে বলার সাহস অর্জন করতে হবে । আবার আধুনিক শিক্ষার প্রতিষ্ঠাগুলির আঙিনাতেও  ধর্মীয় মৌলবাদ তথা মোল্লাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার ক্ষেত্র তৈরী করা সম্ভব এবং তা করা আমাদের  কর্তব্যও বটে । কারণ আমাদের প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীরা যারা ভবিষ্যতে সমাজে নেতৃত্ব করবে তারা যাতে মোল্লাতন্ত্রের শিকার না হয় সে বিষয়েও আমাদের সতর্ক থাকা ও যত্নবান হওয়া একান্তই আবশ্যক । কিন্তু আমাদের সরকার এবং শিক্ষাবিদগণ এ বিষয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন ও নির্বিকার । বরং এমনই শিক্ষাক্রম রচনা করা হয় বা রচনা করানো হয় যার উপরে থাকে ধর্মের ব্যাপক প্রভাব । ফলে পুঁথিগত শিক্ষার শেষে দেখা যায় অধিকাংশ উচ্চশিক্ষিত মানুষের বিশ্বাস  অটুট থাকে  তাঁদের ধর্মগ্রন্থগুলির প্রতি । তাঁরা বিশ্বাস করেন যে  কোরান, পুরাণ, বেদ,  বাইবেল ইত্যাদি ধর্মগ্রন্থগুলি ঐশী গ্রন্থ এবং  মহা পবিত্র গ্রন্থ  । তাঁদের  দশটি আঙ্গুলে দশ রকমের পাথরযুক্ত আংটি, কোমরে-বাহুতে-গলায় মাদুলি বা তক্তি এবং কব্জিতে বিপদতারিণী লাল ধাগা দেখা যায় । তাঁরা নিজ নিজ ধর্মিয় উপাসনালয়ে গিয়ে ব্যক্তিগত ও পরিবার-পরিজনের সুখ-সমৃদ্ধি কামনায় স্বার্থপরের মতো আল্লাহ-ভগবানের পদতলে মাথা নতো করেন । সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালনে তাঁদের প্রতি কোনো আগ্রহ পরিলক্ষিত হয় না, এমনকি তাঁদের একাংশকেও ধর্মীয় মৌলবাদীরূপে আত্মপ্রকাশ করতেও দেখা যায় । তাই শুধু গতানুগতিক ও পুঁথিগত আধুনিক শিক্ষাদানই নয়, আমাদের প্রিয় শিক্ষার্থীদের  এমনভাবে পাঠদান করা উচিত যাতে তাদের মানসিক গঠন সংকীর্ণ, অনুদার,  আত্মকেন্দ্রিক এবং সমাজবিমুখ না হয়ে ওঠে  । বরং যাতে তারা  সংস্কার-কুসংস্কারমুক্ত,  বিজ্ঞানমনস্ক ও যুক্তিবাদী এবং উদার চিত্তের প্রকৃত মানুষ  হয়ে গড়ে ওঠে সে লক্ষ্যে  শ্রেণিকক্ষে তাদের পাঠদান করতে হবে  ।   
এরূপ পাঠদান করা নিশ্চয় সহজ কাজ নয় । বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ, বাইরের পরিবেশ এবং সমগ্র পরিবেশই এরূপ পাঠদানের পক্ষে প্রতিকূল । পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক ও এরূপ পাঠদানের অনুকূল ও সহায়ক নয় । সামগ্রিক পরিবেশ ও পরিস্থিতি এবং সমাজের মানসিক গঠন এমনই যে, এরূপ পাঠদান কেবল সুকঠিনই নয়, ঝুঁকিপূর্ণও বটে ।   তথাপি এ কথাটাও ঠিক যে, এ কাজটি   সম্পাদন করা  কিন্তু অসম্ভব নয় ।   এরূপ পাঠদানের জন্যে পাঠ্যপুস্তক থেকে প্রত্যক্ষ সাহায্য পাওয়া যাবে না, কারণ প্রচলিত পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচীতে প্রচুর সীমাবদ্ধতা ও ঘাটতি রয়েছে । সামগ্রিক  প্রতিকূলতা  এবং পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচীর  সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও  ইচ্ছা থাকলে  শ্রেণিকক্ষে  পাঠ্যপুস্তকের  অন্তর্ভুক্ত বিষয়ে পাঠদানের  সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের  সংস্কারমুক্ত, যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক  করে গড়ে তোলার জন্যে প্রয়োজনীয়  শিক্ষাদান  করা সম্ভব । 
বাড়ির পরিবেশ থেকে শিক্ষার্থীরা  ঈশ্বর, ঈশ্বরের দূত, ধর্ম, ধর্মগুরু ও ধর্মগ্রন্থের প্রতি তৈরী হওয়া অন্ধবিশ্বাস, অন্ধানুগত্য ও  অগাধ শ্রদ্ধা  নিয়েই বিদ্যালয়ে যায় । কিন্তু অল্প বয়স হেতু তাদের মস্তিষ্কে সেই  অন্ধবিশ্বাস, অন্ধানুগত্য ও  অগাধ শ্রদ্ধাগুলি  যথেষ্ট দৃঢ়ভাবে দানা বাঁধতে পারে না । মস্তিষ্কে সেগুলি থাকে খুব আলগা অবস্থায় । একটু একটু করে বিজ্ঞান, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও যুক্তির আঘাত  দিলে সেই নেতিবাচক ও অবৈজ্ঞানিক অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের আবর্জনাগুলি তাদের  মস্তিষ্ক থেকে   ধীরে ধীরে  বের করে দেওয়া সম্ভব । গায়ের পোশাকে যেমন ধূলোবালির আস্তরণ প্রথম পর্যায়ে ভীষণ আলগাভাবে লেপ্টে থাকে, শিক্ষার্থীদের মস্তিষ্কেও ঠিক তেমনি  অন্ধবিশ্বাস, অন্ধানুগত্য ও শ্রদ্ধার ধূলোবালির ময়লাগুলো আলগাভাবেই অবস্থান করে ।  পোশাকের ওপর থেকে হালকা টোকা মেরে ধূলো ঝেড়ে ফেলার মতোই ওদের মস্তিষ্ক থেকেও ঐ ময়লাগুলো বিজ্ঞান ও যুক্তির হালকা  হালকা টোকায় উড়িয়ে ফেলা সম্ভব । তারজন্যে প্রয়োজন হলো পাঠ্যপুস্তকের পাঠ্যবিষয়ের  শিক্ষাগুলো আলোচনা করার পাশাপাশি  সেই বিষয়গুলিতে ধর্মগ্রন্থগুলিতে ঈশ্বরের নামে কী বলা হয়েছে  সেগুলিও তুলে ধরা  । পাশাপাশি দুটো শিক্ষা তুলে ধরলে তারা সহজেই বুঝতে পারবে যে এতদিন তারা যা জেনে এসেছে তা কতো  ভুল ।  কল্পনাপ্রসূত কোনো চিন্তা-ভাবনা থেকে এ  কথা বলছি না ।  একজন শিক্ষক হিসেবে আমার যে   উপলব্ধি হয়েছে সে কথাই আমি এখানে তুলে ধরবার চেষ্টা করছি মাত্র । এটা আমার উপলব্ধিই শুধু নয়, এটা আমার সুদীর্ঘ শিক্ষক জীবনের পরিক্ষালব্ধ ও অভিজ্ঞতালব্ধ এক প্রকার অর্জিত জ্ঞানও বটে । এ অর্জন আমার জীবনের অন্যতম সেরা অর্জনও বটে ।
আমি যা বিশ্বাস করি, তা অকপটে লিখি, এ লেখায় জীবনের ঝুঁকি রয়েছে জেনেও লিখি, জীবনকে বাজি রেখেই লিখি । লিখি মানব সমাজের কল্যানের জন্যে, বিশেষতঃ মুসলিম সমাজের কল্যাণের জন্যেই লিখি । আর তাই তো শরিয়তের সমালোচনা করি , শরিয়ত বর্জন করার আহ্বান  জানাই, কারণ শরিয়তি আইন-কানুন, ধ্যান-ধারণা ও সংস্কৃতিই সব চেয়ে বড়ো বাধা সৃষ্টি করে মুসলিম সমাজের উন্নতি ও অগ্রগতির পথে । এ সব লেখার কারণে মোল্লাতন্ত্রের রোষানলে পড়েছি । ধর্ম মানুষকে উগ্র করে, উন্মত্ত করে, হিংস্র করে, ভয়ঙ্কর আরো কত কী করে তা প্রথমেই বলেছি । যা বলেছি তা স্বচক্ষে দেখেছি ও প্রত্যক্ষ করেছি সেই দিনগুলোতে [২০০৫ সাল] যখন আমাকে মোরতাদ ঘোষণা করা হয় এবং আমার মুণ্ডচ্ছেদকারীকে পাঁচ লক্ষ টাকা পুরস্কার দেবার ঘোষণা দেওয়া হয় । দেখেছি মোল্লা সমাজ ও ধর্মান্ধ মানুষগুলো কীভাবে ও কতটা হিংস্র ও বর্বর হয়ে ওঠে । কিন্তু সে সময়  এও লক্ষ্য করেছি যে, ঐ উন্মাদতুল্য বর্বর লোকগুলোর দলে আমার  কোনো  ছাত্র  যোগ দেয় নি ।   বহু লোক ছিলো যারা আমার মাথা কেটে নেওয়াকে সমর্থন না করলেও আমার প্রতি ভীষণ ক্ষুব্ধ ছিলো এবং আমাকে সমাজচ্যুত করার ফতোয়াকে সমর্থন করেছিলো । আমি লক্ষ্য করেছি, আমার কোনো ছাত্র গিয়াসুদ্দিনের মুণ্ডু চাই ধ্বনি তোলে তাদের সঙ্গে কণ্ঠ মেলায়  নি ।  বরং আমার অনেক প্রাক্তন ছাত্র আমাকে গোপনে জানিয়েছে যে তারা আমার লেখা সমর্থন করে । সেই ঝড়ের দিনগুলোতে যখন  ‘আমি মুসলমানদের এক নম্বর শত্রু’ – এরূপ  আওয়াজে আকাশে বাতাস মুখরিত ও তীব্র আন্দোলিত, সেই সময়েও  আমি শ্রেণীকক্ষে মুসলিম ছাত্রছাত্রীদের চোখেমুখে বিন্দুমাত্র অশ্রদ্ধার  ছাপ দেখি নি । বরং দেখেছি মোল্লাদের ফতোয়ায় আমার জন্যে তাদের মুখমণ্ডলে উদ্বেগের চিহ্ন । আমি ওদের জিজ্ঞাসা করেছি, তোরা কোন পক্ষে ? যারা আমার বিরুদ্ধে ফতোয়া দিয়েছে তাদের পক্ষে ? ওরা স্বতঃস্ফুর্তভাবে সমস্বরে জবাব দিয়েছে, স্যার, না আমরা আপনার বিরুদ্ধে নই, আমরা আপনাকে শ্রদ্ধা করি  । যে মুসলিম ছাত্রটি দু’ বছর আগেও ধর্মগ্রন্থের উপর আমার মন্তব্য ও আলোচনা শুনে পীড়িত বোধ করতো, সে ছাত্রটিও নীরব থাকে নি, সেও অন্যদের সঙ্গে গলা মিলিয়েছে । এ যে আমার কত বড় প্রাপ্তি, এবং  এ প্রাপ্তির মহানন্দে যে কত সুখ তা প্রকাশ করা সাধ্যাতীত ব্যাপার ।
পরিশেষে বলতে চাই যে মোল্লাতন্ত্রের রিক্রুটিং সেণ্টার হলো খারিজি মাদ্রসা ও সিনিয়র মাদ্রাসাগুলি । সিনিয়র মাদ্রাসাগুলি সরকার অনুমোদিত ও সরকারি ব্যয়ে পরিচালিত । এই মাদ্রাসাগুলিই  তৈরী করে মোল্লাতন্ত্রের ধারক-বাহক তথা ইমাম ও মুফতিদের ।  আমরাও [ যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষক-অধ্যাপক]  যারা সমাজের  সংস্কার চাই, সমাজের দেহ থেকে  মধ্যযুগীয় যাবতীয় ঘূণ ধরা,  মরচে পড়া ধ্যানধারণা ও সংস্কার-কুসংস্কার দূর করে আধুনিক ও সভ্য সমাজ নির্মাণ করতে চাই, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি থেকে সমাজ সংস্কার ও পরিবর্তনের সংগ্রামের জন্যে সৈনিক তৈরী করতে পারি । পারি  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে, শ্রেণিকক্ষগুলিকে  আমাদের সংগ্রামের রিক্রুটিং সেন্টার হিসেবে ব্যবহার করতে ।



  

Saturday, June 27, 2015

ভগবান রাম নারী ও শুদ্রদের মানুষই মনে করত না



হিন্দু ধর্মের সাধারণ মানুষদের নিয়ে কোনো সমস্যা নেই । সমস্যা হিন্দুত্ববাদীদের নিয়ে । তারা ভারতের বুকে, পারলে পৃথিবীর বুকেও হিন্দুত্ব কায়েম করতে চায় । সেটা কিন্তু ভয়ঙ্কর এক তত্ত্ব । হিন্দুত্বের তত্ত্ব মানে ভারতের মাটিতে রামায়ণ ও মহাভারতের যুগ ও আদর্শকে ফিরিয়ে আনা, প্রাচীন বৈদিক সমাজের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা । হিন্দুত্বের তত্ত্ব কী ভয়ঙ্কর তা বোঝাতে বেদ, রামায়ণ ও মহাভারত থেকে নিয়ে কয়েকটা কথা লিখে ফেসবুকে পোস্ট করেছিলাম । তাতেই গোঁড়া হিন্দুরা চটে লাল । তারা চটলো না ফাটলো তাতে কিছু যায় আসে না । কিন্তু  অনেক হিন্দুই আছেন যারা হিন্দুত্ববাদের মৌলবাদী রাজনীতিকে সমর্থন করেন না,  তাদেরও কিন্তু রামায়ণ, মহাভারত ও বেদ সম্পর্কে গভীর আস্থা ও শ্রদ্ধা রয়েছে । তারাও আমার লেখায় ব্যথিত হয়েছেন হয়তো এটা ভেবে যে আমি মিথ্যা কথা লিখে হিন্দুদের ঐ ধর্মগ্রন্থগুলিকে কলঙ্কিত করেছি । তাদের জন্যেই এই পোস্টটি । পরে আরো কয়েকটি পোস্ট সময় পেলে লিখতে হবে । এই পোস্টটির কয়েকটি কথা কেবল রাম ও রামায়ণকে নিয়ে । 
রাম হিন্দুদের কাছে ভগবান । সেই ভগবানও যে তার স্ত্রী সীতাকে অপমান করতে পারে তা ধর্মপ্রাণ হিন্দুদের বিশ্বাসের অতীত । কিন্তু নির্মম সত্যিটা হলো যে সীতা রামের কাছে চূড়ান্ত অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়েছিলো । এই সত্যিটাই তুলে ধরার চেষ্টা করেছি । না, তারজন্যে একটাও মনগড়া কথা লিখি নি । সুকুমারী ভট্টাচার্যের লেখা  ‘বাল্মীকির রাম ফিরে দেখা’  পুস্তিকা থেকে মাত্র কয়েকটা কথার উল্লেখ করেছিলাম । সেই পুস্তিকা থেকেই তুলে এখন আবার দিচ্ছি রাম ও সীতার কথোপকথনের কিছু অংশ । সীতাকে উদ্ধার করার পর প্রথম দর্শনে রাম সীতাকে কী বলে সম্ভাষণ করেছিলো তার বর্ণনা প্রসঙ্গে সুকুমারী ভট্টাচার্য লিখেছেন,
·         “সীতা রামের কাছে এসে প্রণাম করে দাঁড়ালে নতমুখী মৈথিলীকে দেখে রাম তাঁর হৃদয়ের অন্তর্গতভাব ব্যক্ত করতে শুরু করলেন [৩/১১৫/১] । কী সেই ভাব ? যে – সীতাকে না দেখতে পেয়ে বনে বনে হা হুতাশ করে বেড়িয়েছিলেন রাম, তাঁকে দেখতে পেয়েই কী বললেন ? ‘যুদ্ধে শত্রুকে জয় করেছি, তোমাকেও মুক্ত করেছি, ভদ্রে । পৌরুষ দিয়ে যা করবার ছিল তা আমি করেছি । বৈরভাবের শেষ প্রান্তে পৌঁছেছি, ধার্ষণ প্রমার্জনা করেছি । শত্রু এবং অপমান একই সঙ্গে শেষ করেছি। আজ আমার পৌরুষ প্রকাশিত হয়েছে, আমার শ্রম সফল হয়েছে । প্রতিজ্ঞা থেকে আজ উত্তীর্ণ হয়েছি, নিজের প্রভুত্ব ফিরে পেয়েছি , [৬/১১৫/১-৪] । একথা শুনে সীতার চোখ দুটি মৃগীর মত  উৎফুল্ল হয়ে উঠল, জল ভরে এল চোখে [৬/১১৫/১০] । তারপর, তা দেখেও রাম বলতে লাগলেন, ‘তোমার কুশল হোক, জেনে রাখ, এই যে যুদ্ধের পরিশ্রম, বন্ধুদের বীরত্বের সাহায্যে যা থেকে উত্তীর্ণ হয়েছি, তা তোমার জন্যে নয় । আমার চরিত্র মর্যাদা রক্ষা করার জন্যে এবং প্রখ্যাত আত্মবংশের  কলঙ্ক মোচন করার জন্যেই তা করেছি । তোমার চরিত্র সন্দেহজনক হয়ে উঠেছে । আমার সামনে তুমি আছ, চক্ষুপীড়াগ্রস্তের সামনে প্রদীপ যেমন পীড়াদায়ক হয় তেমনই । তাই জনকাত্মজা, এই দশদিক পড়ে আছে, যেখানে ইচ্ছা তুমি চলে যাও আমি অনুমতি দিলাম তোমাকে – তোমাকে আর আমার কোনো প্রয়োজন নেই । কোন সদ্বংশজাত তেজস্বী পুরুষ বন্ধুত্বের লোভে পরগৃহবাস করেছে যে, স্ত্রী, তাকে ফিরিয়ে নেবে ? রাবণের কোলে বসে পরিক্লিষ্ট, তার তার দুষ্ট দৃষ্টিতে দৃষ্টা তুমি, তোমাকে গ্রহণ করে আমি আমার উজ্জ্বল বংশের গৌরব নষ্ট করব ? যেজন্যে যুদ্ধ জয় করেছি তা পেয়েছি, তোমার প্রতি আমার অভিলাষ নেই, যেখানে খুশী চলে যাও তুমিঃ বুদ্ধিমান আমি তোমাকে বলছি, লক্ষণ, ভরত, শত্রুঘ্ন, সুগ্রীব বা বিভীষণ এদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা মনোনীত করে নাও । তোমার মত দিব্যরূপা মনোরমা নারীকে দেখে রাবণ নিজগৃহে খুব বেশীদিন চুপচাপ সহ্য করে নি’ [৬/১১৫/১৫-২৪] । [পৃ-১০]
সুকুমারী ভট্টাচার্য লিখেছেন যে মহাভারতে বনপর্বের অন্তর্গত রামোপখ্যানে রামের বয়ান একটু অন্য রকম এবং আরো বেশি অপমানকর । সেখানে  রাম সীতাকে কী বলছেন সে কথাগুলি  সুকুমারী ভট্টাচার্য বর্ণনা করেছেন  এভাবে –
·         ‘যাও বৈদেহী, তুমি মুক্ত । যা করণীয় ছিল তা করেছি । আমাকে স্বামী পেয়ে তুমি রাক্ষসের  বাড়িতে বুড়ো হয়ে যাবে এটা হয় না, তাই রাক্ষস [রাবণ]-কে হত্যা  করেছি । আমার মত ব্যক্তি ধর্ম ও অধর্মের ভেদ জেনেও পরহস্তাগতা নারীকে কেমন করে এক মুহূর্ত ধারণ করবে ? তুমি সচ্চরিত্রই হও আর অসচ্চরিত্রই হও, মৈথিলী তোমাকে আমি ভোগ করতে পারিনে, [তুমি[ যেন কুকুরে চাটা ঘি ।’ [৩/২৭৫/১০-১৩] । [পৃ-১১]
·          
·         রামের এই উক্তির তাৎপর্য বাখ্যা করতে গিয়ে সুকুমারী ভট্টাচার্য লিখেছেন, “রাম স্পষ্টই বলেছেন সীতার চরিত্র ভাল হলেও তাকে গ্রহণ করা যায় না, কারণ সে ‘পরহস্তাগতা’ হয়েছিল,  অতএব কুকুরে চাটা ঘি দিয়ে যেমন যজ্ঞীয় কর্ম করা যায় না, তেমনি সীতাকে তিনি ‘পরিভোগ’ করতে পারেন  না । প্রাচীন ভারতবর্ষে স্বামি-স্ত্রী সম্পর্কের মূলমন্ত্র উচ্চারিত হল, ‘পরিভোগ’ । খুব নির্মমভাবে  সীতাকে বলেছেন রাম, যে সীতাকে উদ্ধারের জন্যে রাম মোটেই যুদ্ধ করেননি, করেছেন ইক্ষুবাকু কূলের রাজবধূ রাক্ষসের বাড়িতে বুড়ো হয়ে গেলে তাঁর বংশ মর্যাদা হানি হয়, তাই । ... সীতাকে পরিত্যাগ কালে রাম অনায়াসেই বলছেন লক্ষণ, ভরত, শত্রুঘ্ন, সুগ্রীব, বিভীষণ যাকে ইচ্ছা পতিত্বে বরণ কর । বিধবা নারীর পক্ষেই শুধু শাস্ত্রের বিধান ছিল, দেবরকে বরণ করা । তবে কি রাম বলতে চান, সীতার পক্ষে তিনি মৃত ? স্বামী পরিত্যক্তা নারী কি বিধবার তুল্য ? আর সুগ্রীব, বিভীষণ ? বানর রাক্ষসকেও সীতা গ্রহণ করতে পারেন ? এ অপমান করার অধিকার রাম কোথা থেকে পেলেন ? শূর্পণখাও রামকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন, তবে রামও কি কুকুরে চাটা ঘি ? সীতার জন্যে এত যে বিলাপ তা কি শোকোচ্ছ্বাস না পরিভোগবঞ্চিত কামুকের আর্তনাদ ?” [পৃ-১১]  

রামের মুখ থেকে ওই সব কুৎসিত ও কদর্য কথাবার্তা শুনে চরম লাঞ্ছিত ও অপমানিত সীতা কী বলেছিলেন ? তা শোনা যাক সুকুমারী ভট্টাচার্যের লেখনি থেকেই । তিনি লিখেছেন, রামের মর্মন্তুদ কথা শুনে সীতা বললেন,
·         ‘আমার গাত্র যে স্পর্শ করা হয়েছে তখন ত আমি বিবশা দুর্বল বলে প্রবলের বশে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম । স্বেচ্ছায় আমি সেটা ঘটাই নি, এখানে অপরাধ দৈবের । আমার অধীন যেটা,  আমার হৃদয়, সেটা ত তোমাতেই সমর্পিত । দেহটা পরের অধীনে গেলে অসহায় আমি কি করব ? হে, মানদ, তোমার সঙ্গে এক সঙ্গে বেড়ে উঠেছি । তাও যদি তুমি আমাকে না জেনে থাক, তাহলে চিরিদিনের মতই আমি অভিশপ্ত । ... লঘুচিত্তে মানুষের মত তুমি আমার নারীত্বকেই সামনে রাখলে, জনকের সামনে পৃথিবী থেকে উত্থিত হয়েছিলাম সে কথাটা, আর, হে চরিত্রজ্ঞ আমার চরিত্রের বহুতর নিদর্শন ছিল তাকে প্রাধান্য দিলে না । স্বীকার করলে না যে বালিকা বয়সেই তুমি আমার পাণি গ্রহণ করেছিলে, আমার ভক্তি, চরিত্র এসব পেছনে ফেলে দিলে’ [৬/১১৬/৬,৯,১১০,১৫,১৬] । [পৃ-১২]   
·          
সীতাকে অকারণে যেভাবে রাম অপমান করে পরিত্যাগ করেছে তা শুধু ব্যক্তি নারী সীতার অপমান নয় । এ অপমান সমগ্র নারী জাতির । এই রাম হিন্দুদের কাছে বিশ্বাসে ভগবান হতে পারে, কিন্তু রামের এ আদর্শ গ্রহণযোগ্য নয় । তাই রামরাজ্য আরএসএস ও বিজেপি চাইতে পারে কিন্তু যারা নারীর স্বাধীনতা ও সমান অধিকারে বিশ্বাস করে তাদের কাছে রামরাজ্য  কাঙ্খিত নয় । সুকুমারী ভট্টাচার্য রামের এই আচরণের তীব্র সমালোচনা করেছেন এবং তাকে প্রশ্নে প্রশ্নে ক্ষত-বিক্ষত করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, “বালিকাবয়সে বিবাহের উল্লেখের তাৎপর্য হল, সীতার যৌবন কেটেছে রামের সান্নিধ্যে, তাতে কখনই কি কিছু সন্দেহের লেশ মাত্র পেয়েছেন রাম ? আর একটা তাৎপর্য আছে দেহ ও মনের পার্থক্যে । যে দেহটাকে পরের স্পর্শ থেকে বাঁচানোর বল বা সামর্থ ছিল না সেইটেই বড় হয়ে উঠল ? যে-মনটা আকৈশর অবিচল-ভাবে রামের উদ্দেশ্যে সমর্পিত থেকেছে, তার কোন মূল্য নেই ?  আগেই বলেছি রামের সঙ্গে বনে আসার কোন দরকারই ছল না সীতার ।  শুধু রামকে ছেড়ে থাকা তাঁর পক্ষে দুঃসহ ছিল বলেই জোর করে সঙ্গে এসেছিলেন । এসব তুচ্ছ হয়ে গেল, শুধু তার গায়ের জোরটা রাবণের চেয়ে কম ছিল বলে ? ... লোকাপবাদের ভয়ে তিনি নির্দোষ অন্তঃসত্ত্বা নারীকে বনবাস দিচ্ছেন। নিত্যদিন প্রেমের একনিষ্ঠতা নিয়ে যে নারী স্বামীর সহচারিণী ছিলেন, তাঁকে ত্যাগ করবার আগে প্রজাদের কাছে নিজে একবার বলাও দরকার মনে করলেন যে সীতা লঙ্কায় অগ্নিশুদ্ধা, রাম ও লক্ষণ তার সাক্ষী । সমস্ত কর্তব্য শুধু ভ্রান্ত সন্দেহে সন্দিহান প্রজাদের  প্রতি, দীর্ঘদিনের নিষ্কলুষ অন্তঃশুদ্ধা সঙ্গিনীর প্রতি কোন কর্তব্য নেই ?” [পৃ – ১২]
রামরাজ্যে নারীর সম্মান, মর্যাদা, স্বাধীনতা ও অধিকার যেমন ছিল না তেমনি নিম্ন বর্ণের হিন্দুদের অবস্থাও ছিলো তদ্রুপই । বরং বলা যেতে পারে তাদের অবস্থান ছিলো আরো হীনতর । হিন্দুত্ববাদীরা 'ঘর ওয়াপসি' করছে । তাদের কাছে প্রশ্ন, তারা যাদের হিন্দু করে ঘরে তুলছে তাদের বর্ণগত অবস্থান কী হবে ? নিশ্চয় ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় তথা উচ্চ বর্ণে তাদের বরণ করা হবে না । তাদের অবস্থান হবে নিম্ন বর্ণের সমতুল্য বা তাদেরও নীচে । শুদ্ররা হলো সর্ব নিম্ন বর্ণের মানুষ যাদের রামরাজ্যে মানুষ বলেই মনে করা হতো না । তা ভগবান রামের চোখে শুদ্রদের অবস্থান কত নিম্নে ছিলো তা শোনা যাক রামায়ণের বর্ণনা থেকেই । সেই বর্ণনা দিচ্ছেন সুকুমারী ভট্টাচার্য তাঁর ‘বাল্মীকির রাম ফিরে দেখা’ পুস্তিকাতেই ।  তিনি লিখেছেন –
·         এর কিছুদিন পরে এক ব্রাহ্মণের বালকপুত্র অসময়ে মারা যায় । রাজপুরোহিতরা রামকে বলেন, রাজ্যে কেউ পাপ করেছে, যার ফলে এই অঘটন ঘটল । খোঁজ করতে করতে দেখা গেল শম্বুক নামে এক শুদ্র সশরীরে দেবত্ব পাবার জন্যে তপস্যা করছে, সে নিজেই সে কথা স্বীকার করল [৭/৬/২] । ‘সেই শুদ্রটি কথা বলতে বলতেই উজ্জ্বল খড়্গ কোষ থেকে বের করে তার মুণ্ডু ছেদ করলেন রাঘব ।’ তখন দেবতারা রামকে সাধুবাদ দিয়ে বললেন, ‘রাম তুমি দেবতাদের কার্যসাধন করলে, তোমার জন্য এই শুদ্র স্বর্গভাক হতে পারল না ।’ [পৃ – ১৩]  
সুকুমারী ভট্টাচার্য রামায়ণ থেকে বর্ণ-বৈষম্যের আর একটি চিত্র তুলে ধরেছেন । সেটা এ রকম –
·         বনে যাবার পথে প্রথম রাত্রে তিনজন এলেন রামের বন্ধু নিষাদ রাজ গুহকের রাজ্যে । গুহক নানা খাদ্যসম্ভারে আয়োজন করতে চাইলে রাম বললেন, ‘তাঁরা বনবাসী, ফলমূলই খাবেন, অন্যের দান প্রতিগ্রহণ করবেন না [২/৫০/৪৩,৪৪] । গুহক যদি রথের ঘোড়াদের জন্যে খাদ্য দেন তাহলে উপকার হয় ।’ বনবাসে কিন্তু রাম-লক্ষণ-সীতা, অত্রি-অনুসূয়া, ভরদ্বাজ ও অন্যান্য মুনিদের দেওয়া ফলমূল ভোজন করেছেন, গুহকের কাছেও তা করতে পারতেন, কিন্তু তা না করে তারা রাত্রিতে তাঁরা উপবাসে কাটালেন । সেটা কি গুহক জাতিতে নিষাদ ছিল বলে?  [পৃ – ৭]
সুকুমারী ভট্টাচার্য রামের এই আচরণের তীব্র সমালোচনা  করেছেন । তিনি লিখেছেন, “গুহকের আতিথ্য গ্রহণ না করার মধ্যেও বর্ণ-বৈষম্যের প্রশ্ন ওঠে । ফলাহারী ঋষিরাও অন্যের দেওয়া ফল খেতে পারেন, বনবাসকালে রাম বেশ কয়েকজন মনুঋষির আতিথ্য নিয়েওছেন । গুহক চণ্ডাল,  তাই তার কাছে  শুধু পশুর খাদ্যই গ্রহণ করলেন ।” [পৃ – ১৫]   তিনি আরো লিখেছেন, “অন্ধমুনি বৈশ্য, তাঁর স্ত্রী শুদ্রা [২/৫৭/৬৩] । তিনি নিজেকে ‘বানপ্রস্থী’ বলেন কী করে ? তাহলে শম্বুকের সাধনাও তো অশাস্ত্রীয় হয় না ? এই শম্বুককে রাম বধ করেছেন এক ব্রাহ্মণের অকাল মৃত পুত্রকে বাঁচাতে । তাহলে প্রাণের মূল্য রামরাজত্বে বর্ণগতভাবে আপেক্ষিক, ব্রাহ্মণ-পুত্রের প্রাণ শুদ্রদের প্রানের চেয়েও দামি ? এটা মেনে নেওয়া হচ্ছে সমস্ত প্রক্ষিপ্ত অংশে । রামরাজ্যে চণ্ডালের সঙ্গে বন্ধুত্ব শুধু কথায় ? যে ফল জল ব্রাহ্মণ ঋষিদের কাছে নেওয়া যায় তা চণ্ডাল বন্ধুর কাছে নেওয়া যায় না ? শুদ্র শম্বূক  তপস্বী, কৃচ্ছ্রসাধনে রত কিন্তু সাধারণ এক ব্রাহ্মণ বালকের তুলনায় তার প্রাণের মূল্য কিছু নেই । [পৃ – ১৫]    
এই সেই রামরাজ্য যেটা সঙ্ঘ পরিবারের সদস্যরা ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দিয়ে  ভারতের মাটিতে আবার পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছে !

বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাইনি – পাঁচ

  দ্বিতীয় অধ্যায় শেখ হাসিনা ও শেখ মুজিবের প্রতি তীব্র গণরোষের নেপথ্যে ২০২৪ এর জুলাই অভ্যুত্থানের সফল পরিসমাপ্তি ঘটে ৩৬ দিন পর (৫ই ...