মোদি প্রধান মন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার পূর্বেই তাঁকে খোলা একটি চিঠি দিলেন
মহাত্মা গান্ধীর নাতি গোপাল কৃষ্ণ গান্ধী । এই চিঠির প্রতিটি কথার সঙ্গে আমি একমত
নয় । তবুও আমি মনে করি যে, চিঠিটি ভাষায়, মেধায়, মননে, ঐশ্বর্যে, স্পর্ধায় ও
বলিষ্ঠতায় একটি ঐতিহাসিক চিঠি হিসাবে গণ্য হওয়ার উপযুক্ত । এই চিঠিটি সম্পূর্ণরূপে
উপেক্ষা করা মোদির পক্ষে খুবই কঠিন কাজ হবে, কারণ চিঠিটির পক্ষে গোটা দেশ জুড়েই রয়েছে
প্রবল জনসমর্থন । তাই চিঠিটি আমার ফেসবুক ও টুইটার বন্ধুদের জন্যে পোষ্ট করতে
মনস্থ করলাম । গোপাল কৃষ্ণ গান্ধী খোলা চিঠিতে
যা লিখেছেনঃ
মনে রাখবেন যাঁরা আপনাকে এই সম্মানীয় পদে চাননি, আমি তাঁদের একজন । আপনিই
সবচেয়ে ভালো জানেন, কেন এই দেশের অনেকেই মনে করেছিলেন যে, আপনি প্রধানমন্ত্রী
হলে কয়েক কোটি মানুষের বিড়ম্বনা বাড়বে বৈ কমবে না । কিছুদিন আগেও যখন কিছু
সমীক্ষা বলেছিল যে, আপনি প্রায় ক্ষমতার বৃত্তে চলে এসেছেন তখনও আমি বিশ্বাস করিনি
। কারণ, যে পদে আপনি বসতে চলেছেন সে পদে জওহরলাল নেহরুর মতো মানুষ বসেছিছেন । লাল
বাহাদুর শাস্ত্রী ছিলেন । ইন্দিরা গান্ধীর জরুরী অবস্থার বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক লড়াই
করে আপনারই গুজরাতের একজন মোরারজি দেশাই ওই পদে বসেছিলেন । আর ছিলেন আপনার
রাজনৈতিক গুরু অটলবিহারী বাজপেয়ীর মতো মানুষ । যাঁরা চেয়েছিলেন যে, আপনার ঐ পদে
বসা উচিত নয় তাঁদেরও আজ মানতে হচ্ছে যে, আপনি ওখানে বসতে চলেছেন ।
কেউ খুব গরীব পরিবার থেকে উইঠে এসে প্রধানমন্ত্রীর পদে বৃত হতে চাইছেন, এমন
লোককে আমি কুর্ণিশ করি । কারণ, এতে আমাদের সমানাধিকারের সংবিধানেরই মহত্ত্ব ফুটে
ওঠে ।
দেশের ভাবনা
কেউ যখন আপনাকে ‘চা-ওয়ালা’ বলে কর্কশভাবে সম্বোধন করে, তখন আমার পেটের
ভিতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে । আমি নিজেকেই বলি, কী চমকপ্রদ ব্যাপার । যে লোকটা মানুষকে
চা দিয়ে বেড়াত, সে এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী হবে । একজনের চামচা হওয়ার চেয়ে অনেকে
চায়ের পেয়ালা হাতে নিয়ে ঘুরে ঘুরে চা বিক্রি করা অনেক ভালো । ... মিস্টার মোদি
আপনি নিশ্চয় জানেন, এবার ভোট হয়েছে, যাঁরা আপনাকে চান আর যাঁরা আপনাকে চান না
তাঁদের মধ্যে । আমার কাছে মনে হয়, এই প্রশ্নটাই বড়ো, মোদি দেশের রক্ষাকর্তা, না তা
নন? বিজেপি ক্ষমতা করায়ত্ত করেছে । কারণ তারা ভোটারদের ৩১ শতাংশকে প্রভাবিত করতে
পেরেছে । তার মানে দেশের ৬৯ শতাংশ কিন্তু আপনাকে রক্ষাকর্তা হিসেবে চান নি । এই ৬৯
শতাংশ দেশগঠনে আপনাদের চিন্তাভাবনার সাথে
একমত নন ।
দেশের ওইক্য ও স্থায়িত্বের প্রস্নে আপনি প্রায়শই সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের
নাম করেন । আপনার হয়তো জানা রয়েছে, সর্দার সাংবিধানিক পরিষদে সংখ্যালঘু সংক্রান্ত
কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন । যদি ভারতের সংবিধান দেশের সংখ্যালঘুদের শিক্ষা,
সংস্কৃতি ও ধর্মীয় স্বাধীনতা দিয়ে থাকে, তারজন্য ধন্যবাদ প্রাপ্য বল্লভভাই
প্যাটেলের। একইসঙ্গে ধন্যবাদ প্রাপ্য কমিটির অন্য সদস্যদেরও । বিশেষ করে ধন্যবাদ
প্রাপ্য রাজকুমারী অমৃতা কাউরের, কাপুরথালার শিখের খ্রিষ্টান কন্যার । মিস্টার
মোদি, সংবিধান সংখ্যালঘুদের যে বিধান দিয়েছে, তা পুরোপুরি মানুন, কাটছাঁট করবেন
না, তরলিকৃত করবেন না, আংশিক মানবেন না । আপনার দুর্মর বল্লভভাই সংখ্যালঘু কমিটিতে
কী বলেছিলেন, তা পড়ে দেখতে পারেন । কেন আজ দেশজুড়ে এত মানুষের মধ্যেভয় ? কারণ আপনি
যখ সমাবেশে ভাষণ দেন, তখন আপনি এমন এক ডেমোক্রাটের কথা শুনতে চান যিনি দেশের
আমজনতার প্রতিনিধিত্ব করেন, আপনি কোনো সম্রাটকে চান না, যিনি শুধু ম্নির্দেশ দিয়ে
বেড়ান । মিস্টার মোদি, সংখ্যালঘুদের
পুনরাশ্বস্ত করুন । মনে রাখবেন, উন্নয়ন নিরাপত্তার বিকল্প নয় । আপনি বলেন, একহাতে
কুরআন আর অন্যহাতে ল্যাপটপ দেখতে চান । এই দৃশ্যটা তাদের পুনরাশ্বস্ত করতে পারে না
। কারণ, একটা পাল্টা দৃশ্য তাদের চোখের সামনে জ্বল জ্বল করে ওঠে, তাদের আতণকিত করে
তোলে । দৃশ্যটি এরকম – একজন মস্তান গোছের হিন্দু একহাতে গীতার ডিভিডি নিয়ে
অন্যহাতে ত্রিশূল নিয়ে তান্ডবনৃত্য করছে ।
আগেকার দিনে প্রধানশিক্ষকেরা স্কুলের শ্রেণীকক্ষের এককোণে একটি বেত রেখে
দিতেন । শরীরের বিশেষ অংশে চাবুকে দগদগে করে দেওয়ার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে ঐ ভয়ঙ্করটি
বেতটি শোভা পেত । কয়েক মাসের আগের স্মৃতি মুজাফফরনগরের দাঙ্গা, সেখানে ৪২ জন
মুসলিম ও ২০ জন হিন্দুর মৃত্যু হলো । ৫০ হাজার মানুষ গৃহহীন হলেন । সেই ঘটনাও ওয়ি
স্কুলে রাখা বেতের মতই ভয়ার্ত । ‘মনে রেখো, ঐ দশা তোমারও হতে পারে’ ... এমন হুমকি
কোনো গণতান্ত্রিক দেশে মানা যায় না ।
কিন্তু এটা ঘটনা এই বার্তা লক্ষ লক্ষ মানুষের দিনের ও রাতের নিরাপত্তা হরণ
করছে ।
এখন আপনার হাতেই রয়েছে এই ভয় কাটানোর মন্ত্র । আপনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে
এই ভয় ইচ্ছা করলেই দূর করতে পারেন । এর যাবতীয় ক্ষমতা রয়েছে আপনার । আমি আশা করব,
ক্ষুদ্রমনের পরামর্শ উপেক্ষা করে আপনি এটা করবেন ।
শুধু মুসলিম নন, ভারতের সমস্ত ধর্মীয় সংখ্যালঘু, এমন কী পশ্চিম পাকিস্তানে
উৎখাত হওয়া সমস্ত শিখ ও হিন্দু, কাশ্মীরি পন্ডিতদের মনে এই আতঙ্ক রয়েছে । এই আতঙ্ক হলো সত্যিকারের অথবা
ভুয়া প্ররোচনা থেকে দাঙ্গা বাধার এবং পরিণামে মেয়েদের উপর নির্যাতন নেমে আসার ভয় ।
এ দেশে প্রতি মিনিটে দলিত ও বৈচিত্রপূর্ণ অরণ্য আদিবাসীরা, বিশেষ করে তাদের মেয়েরা
নির্যাতনকে সঙ্গী করে বেঁচে থাকে । অবিরাম চলছে বৈষম্য, নাগরিকত্ব হারানোর
শিকারিকরণ, নৈতিকতাহীনতা ও অমানবিকতা । মিস্টার মোদি কেন এইসব হচ্ছে, তা খতিয়ে
দেখে এসব নির্যাতিতাদের হৃদয় স্পর্শ করুন । আপনি পারেন তাদের এ বিষয়ে আশ্বস্ত করতে
যে আপনিই হবেন তাদের স্বার্থের প্রথম প্রতিভু । আমাদের মতো বহুতন্ত্রে কারও
অভিন্ন বিধি রচনার কথা বলার মতো অবিবেচক মন্তব্য করাই উচিত নয় । বহুত্বের
কল্পনা করে একত্বের কথা আওড়ানোও তেমনই বিষয় ।
ভারত এক বৈচিত্রপূর্ণ অরণ্য । এই বৈচিত্রপূর্ণ অরণ্য চায় আপনি মানবসমাজকে
লালন-পালন করুন । রাজনৈতিক একেশ্বরবাদের একরঙ্গা বহুসংস্কৃতিবাদকে আগে বসাবেন না ।
সংবিধানের ৩৭০ নং ধারা নিয়ে আপনার ধারণা, অভিন্ন দেওয়ানি বিধির ঘ্যানঘ্যানে
মান্ধাতা আমলের দাবী, উত্তর-পূর্বের হিন্দু বাস্তুহারাদের সম্পর্কে আপনার যে
বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে বেরিয়েছিল, বাংলায় ও উত্ত্রপূর্বে মুসলিম বাস্তুহারাদের
সম্পর্কে আপনার ধারণা মানুষকে শুধু আতঙ্কিতই করে, আস্থা জোগায় না । মিস্টার মোদি,
গণআতঙ্ক ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের বৈশিষ্ট হতে পারে না । ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে
আপনি হবেন এই প্রজাতন্ত্রের রক্ষাকর্তা ।
ভারতের সংখ্যালঘুরা দেশবিচ্ছিন্ন এক জনগোষ্ঠী নয়, তাঁরা দেশের জনসাধারণের
সঙ্গে মূল ধারায় সম্পৃক্ত হয়ে গিয়েছে । এদের কেউ বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না ।
ভারতমাতা কি জয় যে কেউই বলতে পারেন । তার চেয়েও বড়ো হলো সুভাষচন্দ্রের স্লোগান,
‘জয় হিন্দ’ ।
আপনার এই ঐতিহাসিক জয়ের জন্যে আপনাকে আরও একবার ধন্যবাদ । এক ঐতিহাসিক
ইনিংস শুরু করুন । আপনার যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তা রয়েছে । প্রাগৈতিহাসিক যুগের একজনে
পরামর্শ শুনে নিজেকে নষ্ট করবেন না । আপনাকে যেমন একাধারে আপনার জনসমর্থনের ভিত্তি
সুদৃঢ় করতে হবে, তেমনই আপনাকে আপনার বিরোধীদেরও জয় করতে হবে । যখন আপনি সংখ্যালঘু
কমিশন পুনর্গঠিত করবেন তখন বিরোধীদের কাছে নাম চান এবং সেই নাম্পগুলিও মেনে নিন ।
তপশিলি কমিশন ও ভাষাগত সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রেও তাই করুন । পরবর্তী মুখ্য তথ্য
কমিশনার, পরবর্তী ক্যাগ, পরবর্তী ভিজিল্যান্স কমিশনার ঠিক করার সময়েও দলের লোকদের
না নিয়ে অন্যদের মত নিয়ে নাম ঠিকি করুন । আপনার মনের দৃঢ়তা রয়েছে । তাই আপনি এসব
করার ঝুঁকি নিতে পারেন ।
মিস্টার মোদি, আপনার পরিমন্ডলে দক্ষিণের লোকেওর বড়োই অভাব । হিন্দি বলয়ে
আপনার সাফল্য কিন্তু উত্তর-দক্ষিণে বিভেদের জন্ম দিতে পারে । আপনি বরং দক্ষিণ থেকে একজনকে উপপ্রধানমন্ত্রী
করুন । নেহরুর সঙ্গে ছিলেন সম্মুখ ম চেট্টি, জন মাথাই, সিডিদেশমুখ, কেএলরাও । এঁরা
কেউই কংরেসি ছিলেন না । এমনকি রাজনীতির লোকই ছিলেন না । ইন্দিরা গান্ধীর আমলে
ছিলেন এস চন্দ্রশেখর, ভিকেআরভিরাও ছিলেন । ইউপিএ কেন স্বামীনাথন বা শ্যাম
বেনেগালকে রাজ্যসভার সদস্য করলো না জানি না । আপনি আচরণে মহারানা প্রতাপের মতো
লড়াকু হোন । কিন্তু আকবরের কথাও মাথায় রাখবেন । আপনার হৃদয়ে সাভারকার থাকুক,
অবশ্যই থাকবে জানি । কিন্তু আম্বেদকরকেও মনে রাখতে হবে । আপনি আগমার্কা আরএসএস প্রশিক্ষিত লোক, আপনার
ডিএনএতে হিন্দুত্ব রয়েছে । আপনি যদি মনে করেন হিন্দুস্থানের ওয়াজিরে – এ – আলম হতে
পারেন । যে ৬৯ শতাংশ আপনাকে ভোট দেয় নি, তারাও তখন ভাবতে বাধ্য হবে ।
ইতি গোপাল কৃষ্ণ গান্ধী
( চিঠিটির বাংলা তর্জমা করেছে ‘কলম’ পত্রিকা )
No comments:
Post a Comment