দ্বিতীয় অধ্যায়
শেখ হাসিনা ও শেখ মুজিবের প্রতি তীব্র গণরোষের নেপথ্যে
২০২৪ এর জুলাই অভ্যুত্থানের সফল পরিসমাপ্তি ঘটে ৩৬ দিন পর (৫ই আগষ্ট) শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করার মধ্যে দিয়ে। শেখ হাসিনা গণভবন ত্যাগ করে যাবার কিছুক্ষণের মধ্যে লাখো ছাত্র-জনতা সেখানে পৌঁছে যায়। সেখানে তাঁকে না পেয়ে তাদের বুকের মাঝে জমে থাকা যত ক্ষোভ ও রোষ দীর্ঘদিন ধরে পুঞ্জিভূত হয়েছিল তার সবই উগরে দেয় গণভবনের উপর। শুরু করে ভাঙচুর ও ব্যাপক লুটপাট। তারপর এক পর্যায়ে আগুন লাগিয়ে ধরিয়ে দেয়। কয়েকঘণ্টার উন্মত্ত তাণ্ডবে ভবনটি প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। একদিকে যখন গণভবনে তাণ্ডব চালিয়ে বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের মনের জ্বালা মেটাচ্ছে তখন জনতারই একাংশ শেখ মুজিবের মূর্তি ভাঙা শুরু করে তাদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভের উপশম ঘটাতে।
না, কোনো অজুহাতেই এরূপ নৈরাজ্যকর তাণ্ডবলীলা সমর্থনযোগ্য নয়, হতে পারে না। কিন্তু এটাও আমরা অস্বীকার করতে পারি না যে এর দায় শুধু সেদিনের সেই বিক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ মানুষগুলোর উপরেই বর্তায় না, সমান দায় বা তার থেকেও বেশী বর্তায় পলাতক স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং মুক্তিযুদ্ধোত্তর সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে যিনি একদলীয় শাসনব্যবস্থা চাপিয়ে গনতন্ত্রকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিলেন সেই শেখ মুজিববুর রহামানের উপরেও।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ব্যাপক শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে কোটা সংস্কারের আন্দোলন যখন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে তখন শেখ হাসিনা সেই আন্দোলনকে একদিকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালিয়ে দমন করার চেষ্টা করেছেন আর একদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিরুদ্ধে তাঁর সরকারকে উৎখাত করার জামায়াতে ইসলামীদের গভীর ষড়যন্ত্র বলে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়েছেন। সেই মিথ্যা প্রচারণায় কণ্ঠ মিলিয়েছিল তাঁর কুক্ষিগত সমস্ত মেইন স্ট্রীম মিডিয়া, সমাজমাধ্যম এবং সরকারের উচ্ছ্বিষ্টভোজী সকল বুদ্ধিজীবী লেখক কলাকুশলীরা। রাষ্ট্রের কাছে কীভাবে মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীরা নতজানু হয় এবং কতখানি বশংবদসুলভ আচরণ করে তা আমরা প্রতিনিয়ত টের পায় আমাদের দেশে ও রাজ্যে। আমাদের ভারতে ও রাজ্যেও সে সময় আমরা দেখেছি শেখ হাসিনার সেই বানানো বয়ানের প্রচারণা চলেছে সমান মাত্রায়। তাই ৫ই আগষ্ট শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের পর গণভবন ও শেখ মুজিবের মূর্তির উপর যে ধ্বংসকাণ্ড চলেছিল তাকেই মুসলিম জঙ্গিবাদের সাক্ষাৎ প্রমাণ বলে প্রচারণা শুরু হয়ে যায়।
যারা তাণ্ডবলীলা চালিয়েছিল তাদের মধ্যে সন্দেহ নেই যে জামায়াত
ও বিভিন্ন মুসলিম মৌলবাদী দল ও সংগঠনের অনেক মানুষ ছিল। কিন্তু তারা তো ছিল
বিক্ষুব্ধ ও বিশৃঙ্খল জনসমষ্ঠির একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ মাত্র। তাদের তুলনায় সংখ্যায়
বহুগুণে বেশি ছিল তারা যারা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দল ও অন্যান্য ধর্মভিত্তিক
মুসলিম মৌলবাদী দলগুলো অনুসারী নয়, সমর্থকও নয়। এখানে একটা তথ্য দেওয়া যাক
তাহলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে। ধর্মভিত্তিক মুসলিম দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় দল হলো
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বাকি দলগুলোর (হেফাজতে বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইসলামী
আন্দোলন, হিযবুত তাহরির ইত্যাদি) অস্তিত্ব শোভা পায় শুধু কাগজে ও সাইনবোর্ডে। বাংলাদেশ
জামায়াতে ইসলামের জনসমর্থনও এত কম যে এককভাবে নির্বাচনে লড়ে একটা আসন জেতারও শক্তি
ও সমর্থন তাদের নেই। ১৯৯১ সালে জামায়াত সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছিল ১২.১৩% যেবার তারা বিএনপির সঙ্গে জোট করেছিল। আর ১৯৯৬ সালে এককভাবে
ভোটে লড়ে সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছিল ৮.৬২%। এই তথ্য পরিসংখ্যানই এটা
বোঝানোর জন্যে যথেষ্ট যে ৫ই আগষ্টে গণভবন ও শেখ মুজিবের মূর্তি ভাঙার ঘটনায় তাদের সংখ্যা
ছিল কতটুকু।
শেখ হাসিনার প্রতি গণরোষ তৈরি হওয়ার কারণ তিনি নিজেই
শেখ হাসিনা বাংলাদেশে বহুত লম্বা সময় ধরে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। তার মধ্যে টানা ক্ষমতায় ছিলেন ২০০৮ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৬ বছর। সেই ষোল বছরে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার সীমাহীন অপপ্রয়োগ করে বাংলাদেশের জনগণের গণতন্ত্র, তাদের বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ভোটদানের অধিকার সম্পূর্ণ হরণ করেছেন, তাদের উপর নারকীয় জুলুম অত্যাচার চালিয়েছেন নির্মমভাবে, স্বজনপোষণ ও দুর্নীতি করেছেন সীমাহীন, দেশের সম্পদ লুট করে তাঁর নিজের ও পরিবারের সদস্যদের সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। এসব অপকীর্তি ও অপকর্ম যা তিনি করেছেন তার নজির সারা বিশ্বে খুব খুব কমই আছে। এইসব ঘটনা সবিস্তারে আলোচনা করার পরিসর এখানে অপ্রতুল। এখানে তাই মাত্র কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করা হল।
২০০৮ সালে ভোটে জিতে (সেই নির্বাচন নিয়েও অনেকের নানা প্রশ্ন আছে) প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরপরই তিনি সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানটি বাতিল করে দেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান ছিল বাংলাদেশের মানুষের কঠিন সংগ্রামের একটি অর্জিত ফসল যে সংগ্রামের অংশীজন ছিলেন স্বয়ং হাসিনাও। বাংলাদেশে যত নির্বাচন হয়েছে তার মধ্যে একমাত্র তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়া নির্বাচনগুলো ছিল তূলনামূলকভাবে সুষ্ঠ ও অংশগ্রহণমূলক। গণতন্ত্রের প্রধান স্তম্ভ সুষ্ঠ নির্বাচনের সেই মোটামুটি নির্ভরযোগ্য আইনটিকেই তিনি প্রথমেই বাতিল করে দেন। তারপর তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্বের অধীনে যে তিনটি নির্বাচন (২০১৪, ২০১৬ ২০২৪) হয়েছে তার সবগুলোই নির্বাচনের নামে প্রহসন মাত্। অর্থাৎ তিনি ১৬ বছর যে ক্ষমতা ভোগ করেছেন তা সম্পূর্ণ স্বৈরতান্ত্রিক উপায়ে। স্বভাবতই ক্ষমতায় টিকে থাকতে তিনি বিরোধিদের সমালোচনা ও প্রতিবাদ করার অধিকারগুলি নগ্নভাবে খর্ব করেছিলেন। বিরোধী দল মিছিল মিটিং সমাবেশ করতে চায়লে হয় অনুমতি দিতেন না, দিলেও পুলিশ ও গুণ্ডা দিয়ে ছত্রভঙ্গ করার ব্যবস্থা করতেন। সরকারের সমালোচনা করে সংবাদ ছাপা হলে সংবাদপত্রের সাংবাদিক ও মালিকদের জেলে পোরা হত, লেখক বুদ্ধিজীবীদের কেউ সরকারের সমালোচনা করলে তাদেরও একই পরিণতি হত। আইন-আদালত, পুলিশ-প্রশাসন সবকেই কুক্ষিগত করেছিলেন। ফলে না পুলিশের কাছে না আদালতের কাছে গিয়ে মানুষ বিচার পেত। ঘুরিয়ে পুলিশের কাছে গিয়ে শাসক দলের অত্যাচারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে অভিযোগকারীকেই গ্রেপ্তার করে কঠিন মামলা দিয়ে জেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হত। বিরোধী কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করতে ব্যাপক গুম, খুন ও আদালত বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালানো নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সরকারের সমালোচকদের সে বিরোধী দলের লোক হোক কিংবা ব্যক্তি বিশেষ হোক তাদের গুম করে আয়নাঘর নামক মুরগির খুপরির মতন ছোট জায়গায় বছরের পর বছর তাদের উপর সীমাহীন শারিরীক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হত। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ছাত্রলীগের বন্দীশালায় পরিণত করা হয়েছিল যেখানে শেখ হাসিনা ও শেখ মুজিবের গুনগান করা সকলের জন্যে বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল, না করলে করা হত ব্যাপক অত্যাচার যার হাত থেকে নারী শিক্ষার্থীদেরও রেহাই মিলত না। এমনি ছিল শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনামলের কিছু খণ্ডিত চিত্র। আজীবন ক্ষমতায় টিকে থাকার সর্বগ্রাসী আকাঙ্খায় তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন যে রাষ্ট্রশক্তির সাহায্যে জনশক্তিকে চিরদিন দাবিয়ে রাখা যায় না।
উপরের দীর্ঘ জুলুম অত্যাচারের কথা বাদ দিয়ে শুধু যদি ১লা জুলাই থেকে ৫ই আগষ্ট পর্যন্ত ৩৬ দিন ব্যাপী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিকের উপর চালানো শেখ হাসিনার দলীয় গুণ্ডাবাহিনী এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্মম উৎপীড়নের কথা বিবেচনায় আনা যায় তাহলেই তো যে কারও তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হবে শেখ তাঁর প্রতি। সেই ৩৬ দিনে দু হাজারেরো বেশী শিক্ষার্থী ও নাগরিককে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে। পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি মানুষকে আহত করা হয়েছে যাদের মধ্যে শিশুও আছে, অনেকের চোখ চলে গেছে, কয়েক হাজার চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছে। আন্দোলন দমন করতে হেলিকপ্টার থেকেও গুলি চালানো হয়েছে। অসংখ্য লাশ গুম করা হয়েছে। যারা আহত হয়ে হাসপাতালে গেছে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয় নি ঘুরিয়ে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে তাদের টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে জেলে পুরে দেওয়া হয়েছে। আন্দোলনকারীদের অনেককে গ্রেপ্তার করে গুমঘরে নিয়ে তাদের উপর শারিরীক ও মানসিক পাশবিক অত্যাচার চালানো হয়েছে।
এ রকম একজন স্বৈরাচারী দানবিক শাসকের প্রতি গণরোষ তৈরি হওয়ার মধ্যে অস্বাভাকিতা কিছু থাকতে পারে না। অবশ্য বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে কিংবা বিভ্রান্ত হয়ে কিংবা স্রেফ সন্দেহের বশে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে জঙ্গিবাদের ভূত দেখে তাদের কথা আলাদা। জঙ্গিবাদের ভূত যাদের মগজকে নিয়ন্ত্রণ করে তাদের অনুভূতিতে বছর বছর ধরে চরম মাত্রায় অত্যাচারিত ও নিপীড়িত মানুষের মনের তৈরি হওয়া ক্ষোভ, ক্রোধ ও ঘৃণা ধরা পড়বে না।
শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষমতায় ছিলেন মাত্র চার বছর
মত। সেই স্বল্প পরিসরেই তিনি যেভাবে গণতন্ত্রকে হত্যা করে বিরোধিদের উপর রাষ্ট্রীয়
সন্ত্রাস নামিয়েছিলেন তার তুলনা মেলা ভার। তাই তার প্রতিও জনরোষ কম পুঞ্জিভূত হয়ে
ছিল না। সে আলোচনা করব পরের অংশে। ক্রমশ -----