Monday, March 10, 2025

বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাইনি – পাঁচ

 

দ্বিতীয় অধ্যায়

শেখ হাসিনা ও শেখ মুজিবের প্রতি তীব্র গণরোষের নেপথ্যে

২০২৪ এর জুলাই অভ্যুত্থানের সফল পরিসমাপ্তি ঘটে ৩৬ দিন পর (৫ই আগষ্ট) শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করার মধ্যে দিয়ে। শেখ হাসিনা গণভবন ত্যাগ করে যাবার কিছুক্ষণের মধ্যে লাখো ছাত্র-জনতা সেখানে পৌঁছে যায়। সেখানে তাঁকে না পেয়ে তাদের বুকের মাঝে জমে থাকা যত ক্ষোভ ও রোষ দীর্ঘদিন ধরে পুঞ্জিভূত হয়েছিল তার সবই উগরে দেয় গণভবনের উপর। শুরু করে ভাঙচুর ও ব্যাপক লুটপাট। তারপর এক পর্যায়ে আগুন লাগিয়ে ধরিয়ে দেয়। কয়েকঘণ্টার উন্মত্ত তাণ্ডবে ভবনটি প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। একদিকে যখন গণভবনে তাণ্ডব চালিয়ে বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের মনের জ্বালা মেটাচ্ছে তখন জনতারই একাংশ শেখ মুজিবের মূর্তি ভাঙা শুরু করে তাদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভের উপশম ঘটাতে।  

 না, কোনো অজুহাতেই এরূপ নৈরাজ্যকর তাণ্ডবলীলা সমর্থনযোগ্য নয়, হতে পারে না। কিন্তু এটাও আমরা অস্বীকার করতে পারি না যে এর দায় শুধু সেদিনের সেই বিক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ মানুষগুলোর উপরেই বর্তায় না, সমান দায় বা তার থেকেও বেশী বর্তায় পলাতক স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং মুক্তিযুদ্ধোত্তর সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে যিনি একদলীয় শাসনব্যবস্থা চাপিয়ে গনতন্ত্রকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিলেন সেই শেখ মুজিববুর রহামানের উপরেও।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ব্যাপক শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে কোটা সংস্কারের আন্দোলন যখন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে তখন শেখ হাসিনা সেই আন্দোলনকে একদিকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালিয়ে দমন করার চেষ্টা করেছেন আর একদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিরুদ্ধে তাঁর সরকারকে উৎখাত করার জামায়াতে ইসলামীদের গভীর ষড়যন্ত্র বলে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়েছেন।  সেই মিথ্যা প্রচারণায় কণ্ঠ মিলিয়েছিল তাঁর কুক্ষিগত সমস্ত মেইন স্ট্রীম মিডিয়া, সমাজমাধ্যম এবং  সরকারের উচ্ছ্বিষ্টভোজী সকল বুদ্ধিজীবী লেখক কলাকুশলীরা। রাষ্ট্রের কাছে কীভাবে মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীরা নতজানু হয় এবং কতখানি বশংবদসুলভ আচরণ করে তা আমরা প্রতিনিয়ত টের পায় আমাদের দেশে ও রাজ্যে। আমাদের ভারতে ও রাজ্যেও সে সময় আমরা দেখেছি শেখ হাসিনার সেই বানানো বয়ানের প্রচারণা চলেছে সমান মাত্রায়। তাই ৫ই আগষ্ট শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের পর গণভবন ও শেখ মুজিবের মূর্তির উপর যে ধ্বংসকাণ্ড চলেছিল তাকেই মুসলিম জঙ্গিবাদের সাক্ষাৎ প্রমাণ বলে প্রচারণা শুরু হয়ে যায়।

যারা তাণ্ডবলীলা চালিয়েছিল তাদের মধ্যে সন্দেহ নেই যে জামায়াত ও বিভিন্ন মুসলিম মৌলবাদী দল ও সংগঠনের অনেক মানুষ ছিল। কিন্তু তারা তো ছিল বিক্ষুব্ধ ও বিশৃঙ্খল জনসমষ্ঠির একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ মাত্র। তাদের তুলনায় সংখ্যায় বহুগুণে বেশি ছিল তারা যারা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দল ও অন্যান্য ধর্মভিত্তিক মুসলিম মৌলবাদী দলগুলো অনুসারী নয়, সমর্থকও নয়। এখানে একটা তথ্য দেওয়া যাক তাহলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে। ধর্মভিত্তিক মুসলিম দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় দল হলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বাকি দলগুলোর (হেফাজতে বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলন, হিযবুত তাহরির ইত্যাদি) অস্তিত্ব শোভা পায় শুধু কাগজে ও সাইনবোর্ডে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের জনসমর্থনও এত কম যে এককভাবে নির্বাচনে লড়ে একটা আসন জেতারও শক্তি ও সমর্থন তাদের নেই। ১৯৯১ সালে জামায়াত সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছিল ১২.১৩% যেবার  তারা  বিএনপির সঙ্গে জোট করেছিল। আর ১৯৯৬ সালে এককভাবে ভোটে লড়ে সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছিল ৮.৬২%। এই তথ্য পরিসংখ্যানই এটা বোঝানোর জন্যে যথেষ্ট যে ৫ই আগষ্টে গণভবন ও শেখ মুজিবের মূর্তি ভাঙার ঘটনায় তাদের সংখ্যা ছিল কতটুকু। 

শেখ হাসিনার প্রতি গণরোষ তৈরি হওয়ার কারণ তিনি নিজেই

শেখ হাসিনা বাংলাদেশে বহুত লম্বা সময় ধরে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। তার মধ্যে টানা ক্ষমতায় ছিলেন ২০০৮ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৬ বছর। সেই ষোল বছরে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার সীমাহীন অপপ্রয়োগ করে বাংলাদেশের জনগণের গণতন্ত্র, তাদের বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ভোটদানের অধিকার সম্পূর্ণ হরণ করেছেন, তাদের উপর নারকীয় জুলুম অত্যাচার চালিয়েছেন নির্মমভাবে, স্বজনপোষণ ও দুর্নীতি করেছেন সীমাহীন, দেশের সম্পদ লুট করে তাঁর নিজের ও পরিবারের সদস্যদের সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। এসব অপকীর্তি ও অপকর্ম যা তিনি করেছেন তার নজির সারা বিশ্বে খুব খুব কমই আছে। এইসব ঘটনা সবিস্তারে আলোচনা করার পরিসর এখানে অপ্রতুল। এখানে তাই মাত্র কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করা হল।

২০০৮ সালে ভোটে জিতে (সেই নির্বাচন নিয়েও অনেকের নানা প্রশ্ন আছে) প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরপরই তিনি সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানটি বাতিল করে দেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান ছিল বাংলাদেশের মানুষের কঠিন সংগ্রামের একটি অর্জিত ফসল যে সংগ্রামের অংশীজন ছিলেন স্বয়ং হাসিনাও। বাংলাদেশে যত নির্বাচন হয়েছে তার মধ্যে একমাত্র তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়া নির্বাচনগুলো ছিল তূলনামূলকভাবে সুষ্ঠ ও অংশগ্রহণমূলক। গণতন্ত্রের প্রধান স্তম্ভ সুষ্ঠ নির্বাচনের সেই মোটামুটি নির্ভরযোগ্য আইনটিকেই তিনি প্রথমেই বাতিল করে দেন। তারপর তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্বের অধীনে যে তিনটি নির্বাচন (২০১৪, ২০১৬ ২০২৪) হয়েছে তার সবগুলোই নির্বাচনের নামে প্রহসন মাত্। অর্থাৎ তিনি ১৬ বছর যে ক্ষমতা ভোগ করেছেন তা সম্পূর্ণ স্বৈরতান্ত্রিক উপায়ে। স্বভাবতই ক্ষমতায় টিকে থাকতে তিনি বিরোধিদের সমালোচনা ও প্রতিবাদ করার অধিকারগুলি নগ্নভাবে খর্ব করেছিলেন। বিরোধী দল মিছিল মিটিং সমাবেশ করতে চায়লে হয় অনুমতি দিতেন না, দিলেও পুলিশ ও গুণ্ডা দিয়ে ছত্রভঙ্গ করার ব্যবস্থা করতেন। সরকারের সমালোচনা করে সংবাদ ছাপা হলে সংবাদপত্রের সাংবাদিক ও মালিকদের জেলে পোরা হত, লেখক বুদ্ধিজীবীদের কেউ সরকারের সমালোচনা করলে তাদেরও একই পরিণতি হত।  আইন-আদালত, পুলিশ-প্রশাসন সবকেই কুক্ষিগত করেছিলেন। ফলে না পুলিশের কাছে না আদালতের কাছে গিয়ে মানুষ বিচার পেত। ঘুরিয়ে পুলিশের কাছে গিয়ে শাসক দলের অত্যাচারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে অভিযোগকারীকেই গ্রেপ্তার করে কঠিন মামলা দিয়ে জেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হত। বিরোধী কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করতে ব্যাপক গুম, খুন ও আদালত বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালানো নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সরকারের সমালোচকদের সে বিরোধী দলের লোক হোক কিংবা ব্যক্তি বিশেষ হোক তাদের গুম করে আয়নাঘর নামক মুরগির খুপরির মতন ছোট জায়গায় বছরের পর বছর তাদের উপর সীমাহীন শারিরীক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হত।  কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ছাত্রলীগের বন্দীশালায় পরিণত করা হয়েছিল যেখানে শেখ হাসিনা ও শেখ মুজিবের গুনগান করা সকলের জন্যে বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল, না করলে করা হত ব্যাপক অত্যাচার যার হাত থেকে নারী শিক্ষার্থীদেরও রেহাই মিলত না। এমনি ছিল শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনামলের কিছু খণ্ডিত চিত্র। আজীবন ক্ষমতায় টিকে থাকার সর্বগ্রাসী আকাঙ্খায় তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন যে রাষ্ট্রশক্তির সাহায্যে জনশক্তিকে চিরদিন দাবিয়ে রাখা যায় না।

উপরের দীর্ঘ জুলুম অত্যাচারের কথা বাদ দিয়ে শুধু যদি ১লা জুলাই থেকে ৫ই আগষ্ট পর্যন্ত ৩৬ দিন ব্যাপী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিকের উপর চালানো  শেখ হাসিনার দলীয় গুণ্ডাবাহিনী এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্মম উৎপীড়নের কথা বিবেচনায় আনা যায় তাহলেই তো যে কারও তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হবে শেখ তাঁর প্রতি। সেই ৩৬ দিনে দু হাজারেরো বেশী শিক্ষার্থী ও নাগরিককে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে। পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি মানুষকে আহত করা হয়েছে যাদের মধ্যে শিশুও আছে, অনেকের চোখ চলে গেছে, কয়েক হাজার চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছে। আন্দোলন দমন করতে হেলিকপ্টার থেকেও গুলি চালানো হয়েছে। অসংখ্য লাশ গুম করা হয়েছে। যারা আহত হয়ে হাসপাতালে গেছে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয় নি ঘুরিয়ে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে তাদের টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে জেলে পুরে দেওয়া হয়েছে। আন্দোলনকারীদের অনেককে গ্রেপ্তার করে গুমঘরে নিয়ে তাদের উপর শারিরীক ও মানসিক পাশবিক অত্যাচার চালানো হয়েছে। 

এ রকম একজন স্বৈরাচারী দানবিক শাসকের প্রতি গণরোষ তৈরি হওয়ার মধ্যে অস্বাভাকিতা কিছু থাকতে পারে না। অবশ্য বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে কিংবা বিভ্রান্ত হয়ে কিংবা স্রেফ সন্দেহের বশে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে জঙ্গিবাদের ভূত দেখে তাদের কথা আলাদা। জঙ্গিবাদের ভূত যাদের মগজকে নিয়ন্ত্রণ করে তাদের অনুভূতিতে বছর বছর ধরে চরম মাত্রায় অত্যাচারিত ও নিপীড়িত মানুষের মনের তৈরি হওয়া ক্ষোভ, ক্রোধ ও ঘৃণা ধরা পড়বে না।

শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষমতায় ছিলেন মাত্র চার বছর মত। সেই স্বল্প পরিসরেই তিনি যেভাবে গণতন্ত্রকে হত্যা করে বিরোধিদের উপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নামিয়েছিলেন তার তুলনা মেলা ভার। তাই তার প্রতিও জনরোষ কম পুঞ্জিভূত হয়ে ছিল না। সে আলোচনা করব পরের অংশে।  ক্রমশ  ----- 

 

 

Wednesday, March 5, 2025

বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাইনি – চার

 

দ্বিতীয় অধ্যায়

শেখ হাসিনার পতন ও পলায়ন পরবর্তী মুহূর্তগুলো  

৫ই আগষ্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঢাকা লং মার্চের ডাকে গোটা দেশ থেকে লাখো লাখো ছাত্র ও জনতার ঢল নেমেছিল ঢাকার রাস্তায়। গোটা দেশের সকল রাস্তা সেদিন আকশরিক অর্থেই যেন ঢাকায় এসে  মিলে গিয়েছিল। ঢাকা শহরের লাখো মানুষের মাথায় বাঁধা বাংলাদেশের লাল সবুজের জাতীয় পতাকা ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছিল না, রাস্তার কালো পিচ ঢাকা পড়ে গিয়েছিল জনসমুদ্রের একের পর এক উত্তাল ঢেউয়ে। তার সঙ্গে লক্ষ লক্ষ জনতার সমবেত কণ্ঠের গগনবিদীর্ণ করা ‘দফা এক, দাবি এক, হাসিনার পদত্যাগ’; ‘এক দফা এক দাবি, হাসিনা তুই কবে যাবি’; ইত্যাদি শ্লোগানে ঢাকা মহানগরীতে যেন শেষ যুদ্ধের দামামা বাজছে চারিদিকে লক্ষ লক্ষ মানুষের পদভারে কম্পিত ঢাকার সমস্ত রাজপথের গন্তব্য তখন একটাই, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাসভবন, গণভবন। বাংলাদেশের সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ্জামান প্রধানমন্ত্রীকে যত দ্রূত সম্ভব পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার   পরামর্শ দেন। তিনি তাঁকে আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন যে তাঁর সেনাবাহিনী সন্তানসম শিক্ষার্থীদের উপর আর গুলি না চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উপায়ান্তর না দেখে অগত্যা ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করে শেখ হাসিনা তখন বিকালের পড়ন্ত বেলায় বোন রেহানাকে সঙ্গে সেনাপ্রধানের বদান্যতায় হেলিকপ্টারে চেপে দেশ ছাড়েন ভারতের  উদ্দেশ্যে।

শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই উত্তেজনা জনসমুদ্রের উত্তাল ঢেউ একের পর এক আছড়ে পড়ে পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাসভবন তথা গণভবনে। শুরু হয় বাসভবনে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট। জনসমুদ্রের একটা অংশ ঝাঁপায় শেখ মুজিবের মূর্তির উপর লাঠি, শাবল, কোদাল, হাতুড়ি, দা প্রভৃতি যন্ত্রপাতি যা হাতের কাছে পেয়েছে তা দিয়েই মুজিবের মূর্তি ধ্বংস করার যজ্ঞে মেতে ওঠে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেই তাণ্ডবলীলা চলে।   

  Following her resignation on Monday, former Bangladeshi Prime Minister Sheikh Hasina's official residence, Ganabhaban, in Dhaka was stormed by thousands of protesters who engaged in vandalism and looting.

বলা বাহুল্য যে ভয়ংকর রকমের সেই তাণ্ডবলীলা ও ধ্বংস যজ্ঞের দৃশ্য দেখেছে গোটা দুনিয়া। কারণ, বিশ্বের প্রায় সমস্ত সংবাদ চ্যানেলে সেই ঘটনাবলী সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছে। ভারত সরকার, ভারতের সকল মিডিয়া, প্রচারমাধ্যম ও ভারতের মানুষ সমস্বরে তখন নিন্দার ঝড় তুলেছে সেই তাণ্ডব, লুটপাট ও ধ্বংসকাণ্ডের বিরুদ্ধে। এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। মানুষের যতই ক্ষোভ ও ঘৃণা থাকুক না কেন কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না জনগণের ঐ রকম হিংসাত্মক ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড। ভারতের প্রচার মাধ্যম ও জনগণ কিন্তু শুধু নিন্দা করেই তাদের কাজ সারে নি। তীব্র নিন্দাজনক ঐ তাণ্ডব ও ধ্বংসলীলাকে তারা হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেছে বাংলাদেশের আওয়ামীপন্থী মানুষ ছাড়া বাকি তাবত মানুষ এবং ৩৬ জুলাই অভ্যুত্থানকে কালিমালিপ্ত করার কাজে। ৩৬ জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে জঙ্গিবাদের উত্থান বলে টানা প্রচার চালিয়েছে। বিক্ষুব্ধ জনগণের ঐ তাণ্ডবে অংশ নেওয়াকেই তারা মুসলিম জঙ্গিবাদের জ্বলন্ত অকাট্য প্রমাণ বলে চালানোর চেষ্টা করেছে। আমাদের ভারতের সরকারী বেসরকারী ব্যাপক শক্তিধর প্রচার মাধ্যমগুলি  শুধু নিজের দেশবাসীকেই নয়, সমগ্র দুনিয়াকেই বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানকে মুসলিমদের জঙ্গিঅভ্যুত্থান বলে বিভ্রান্ত ও প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে।

কথায় আছে দশচক্রে ভগবান ভূত। হ্যাঁ, সমস্বরে ভারতের গদি মিডিয়া, অন্যান্য মেইন স্ট্রীম মিডিয়া, সমস্ত সমাজ মাধ্যমের একযোগে বাংলাদেশের ছাত্র ও জনতার সফল ও ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানকে জঙ্গি-অভ্যুত্থান বলে প্রচারের তীব্র প্রাবল্যে ও জোয়ারে আমার উপরেও কিছুটা প্রভাব ফেলেছিল। ঐ যে ‘দশচক্রে ভগবান ভূত’ এর মতন অবস্থা আর কী। তবে ঐ প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। শেখ হাসিনার সরকারী বাসভবন ভাঙচুর ও লুটপাট করা এবং শেখ মুজিবের মূর্তি ভাঙার ঘটনায় যারা অংশ গ্রহণ করেছিলো তাদের মধ্যে নিশ্চয়ই একটা ভালো অংশ যে উগ্রপন্থী মুসলিম তথা বর্বর দুষ্কৃতিকারী ছিল তা সংশয়াতীত। কিন্তু এটাও সংশয়াতীতভাবে সর্বৈব মিথ্যাচার যে তাণ্ডবে অংশ নেওয়া সকল মানুষগুলো ছিলো জঙ্গি বা জঙ্গিবাদের সমর্থক। প্রকৃত ঘটনা হলো ঐ তাণ্ডব ও ধ্বংসলীলা ছিল আসলে তীব্র জনরোষের ফল। দেড় দশক ধরে ভোটের নামে প্রহসন করে ক্ষমতা আঁকড়ে থেকে বিরোধী দলসহ সমগ্র জনগণের উপর তিনি চালিয়েছিলেন বর্বর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, তার সাথে তিনি ও তাঁর দলের নেতা-মন্ত্রীরা ঐ দীর্ঘ সময় জুড়ে দেশটাকে কার্যত লুট করেছেন, বিপুল অর্থ পাচার করে বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। এ সবেরই পরিণতিতে একটা নিরীহ কোটা সংস্কারের দাবির আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয় এবং গণরোষ আছড়ে পড়ে তাঁর বাসভবনে।  

নিকট অতীতেই (২০২২ সালে) তো আমরা দেখেছি কী ভয়ঙ্কর গণরোষের শিকার হয়েছিল শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি গোঠাভয় রাজাপক্ষে ও তাঁর সরকারী বাসভবন। সেদিনও তো শ্রীলঙ্কার বিক্ষুব্ধ জনগণ রাষ্ট্রপতির সরকারী বাসভবনে চালিয়েছিল ব্যাপক তাণ্ডব, চালিয়েছিল তারসঙ্গে ব্যাপক লুটপাটও। যে ঘটনা শ্রীলঙ্কার মানুষ ঘটালে গণরোষ বলে গণ্য হয় বা মান্যতা পায় সে ঘটনা বাংলাদেশে ঘটলে হয়ে যায় জঙ্গি কার্যকলাপ। এতো সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষপাতমূলক দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ বৈ নয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর গোটা দেশ জুড়ে লেনিন, স্ট্যালিন ও মার্কসের মূর্তি ভাঙা হয়েছিল, সাদ্দাম শাসন খতম হওয়ার পর তাঁর মূর্তি ভাঙার তাণ্ডব হয়েছিল, এরূপ ঘটনার ভুরিভুরি দৃষ্টান্ত রয়েছে বিশ্ব ইতিহাসে। সে সব ঘটনা গণরোষ বলে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছে। তাহলে বাংলাদেশে শেখ মুজিবের মূর্তি ভাঙার ঘটনা গণরোষ বলে গণ্য হবে না কেন? কেন জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের তাণ্ডব বলে ধ্বিকৃত হবে?    

শেখ হাসিনার প্রতি গণরোষের সঞ্চার হওয়ার যেমন অজস্র কারণ রয়েছে, অনুরূপভাবে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের মনে গণরোষ তৈরি হওয়ারও যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এসব নিয়ে আলোচনা হবে পরের লেখায়। ক্রমশ ....  

 

 

     

   

       

 

Tuesday, March 4, 2025

বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের পেছনে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাইনি – তিন

 

কোটা সংস্কারের আন্দোলনের প্রথম পর্বে যা দেখেছি ও বুঝেছি

শিক্ষার্থীদের কোটা আন্দোলন ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান হয়ে ওঠার পর্যায়ের কিছু কথা  

 Student protests in Bangladesh pose serious challenge for ...

রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস যত বেড়েছে ছাত্রদের আন্দোলন তত উত্তাল হয়েছে। তবে ১৬ই জুলাই পুলিশের গুলিতে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদের মৃত্যু যেন আগুনে ঘি ঢালে। ফলে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনও সেই পর্যায়ে সহিংস হয়ে ওঠে। পুলিশের উপর পালটা আক্রমণ, মেট্র রেল, বাংলাদেশ টিভি স্টেশন, প্রভৃতি বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠানে আগ্নি সংযোগের ঘটনাসহ লুটপাটের ঘটনা ঘটে। আন্দোলন যেমন যেমন তীব্র হয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের সাথে যোগ দিয়েছে ডান বাম নির্বিশেষে সমস্ত ছাত্র সংগঠনের কর্মী এবং  রাজনৈতিক দলের কর্মীরা। যোগ দেয় গর্ত থেকে বেরিয়ে আসা মুসলিম মৌলবাদী ও জঙ্গী সংগঠনের কর্মীরা। সাধারণত তারাই পুলিশকে হত্যাসহ ধ্বংসাত্মক ও হিংসাত্মক কাজে লিপ্ত হয়। সেই পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা কিছুটা কৌশল পরিবর্তন করে শিক্ষার্থীদের কোটা আন্দোলনকে বাগে আনার চেষ্টা করে। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী কার্যক্রম জারি রেখেও আন্দোলনের নেতৃত্বকে তাঁর সরকারী বাসভবনে (গণভবনে) ডেকে আলোচনার প্রস্তাব পাঠান। কোটা পুনঃপ্রবর্তনের আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করবে বলে জানান। আন্দোলনের নেতৃত্বের আস্থা অর্জনের জন্যে সরকারের পক্ষ থেকে আপীলও করেন। আবার তারই পাশাপাশি মুখ্য সংগঠকদের আটক করে, আয়না ঘরে গুম করে রেখে, তাদের উপর নির্মমভাবে মানসিক ও শারিরীক নির্যাতন চালান। সে অবস্থায় তাদের অর্থ ও ক্ষমতার প্রলোভনও দেখানো হয়। তবে একটা পর্যায়ে ব্যাপক গণবিক্ষোভের ফলে তাদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।

গণবিক্ষোভের সেই উত্তাল পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ আদালত হাই কোর্টের কোটা পুনর্বহালের রায় খারিজ করে দেয়। শেখ হাসিনা তখন সর্বোচ্চ আদালতের রায় মেনে নেওয়ার ঘোষণা দেন এবং  ছাত্র আন্দোলন সমাপ্ত করার আহ্বান জানান। শিক্ষার্থীরা সেই আহ্বানকে ফিরিয়ে দিয়ে সরকারের কাছে ন’দফা দাবী পেশ করে এবং সেগুলো সরকার যতক্ষণ না মানছে ততক্ষণ তারা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সঙ্কল্প ঘোষণা করে। সেই দাবিগুলোর মধ্যে প্রধান কয়টি দাবি ছিল এ রকমঃ ছাত্র-নাগরিকদের হত্যার দায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে, ছাত্র ও জনতা হত্যার দায় নিয়ে পদত্যাগ করতে হবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সড়ক পরিবহন মন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, তথ্য প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ ও এ আরাফাতকে পদত্যাগ করতে হবে, যেখানে যেখানে ছাত্র ও নাগরকদের হত্যা করা হয়েছে সেখানকার ডিআইজি, পুলিশ কমিশনার ও পুলিশ সুপারদের বরখাস্ত করতে হবে, বাংলাদেশের যে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনী সশস্ত্র হামলা করেছে সেই সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও প্রক্টরদের পদত্যাগ করতে হবে, যে সব পুলিশ, র‍্যাব ও সেনা সদস্যরা শিক্ষার্থীদের উপর গুলি করেছে, যে সকল নির্বাহী মেজিস্ট্রেট গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে হবে এবং দ্রুততম সময়ে গ্রেপ্তার করতে হবে,  দেশব্যাপী যে সকল ছাত্র ও নাগরিক নিহত ও আহত হয়েছে তাদের পরিবারকে অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

বলা বাহুল্য যে, শেখ হাসিনা শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো মানতে অস্বীকার করেন যদিও বলেন যে তিনি যে গুলি চালানোর সকল ঘটনার তদন্ত করে যারা দোষী তাদের বিচার করা হবে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা প্রধানমন্ত্রীর সেই আশ্বাসে ভরসা রাখেনি। আমারও মনে হয়নি যে শেখ হাসিনার কথায় বা আশ্বাসে তখন ভরসা রাখার সামান্যতম কোনো অবশিষ্ট ছিল। কারণ, তখনও হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও নাগরিকদের নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনায় তিনি একবার ভুলে করেও দুঃখ প্রকাশ পর্যন্ত করেননি, তাদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া তো দূরের কথা। ঘুরিয়ে যারা পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে ও  গুরুতরভাবে আহত হয়েছে তাদের বিরুদ্ধেই পুলিশ হত্যা ও সরকারী সম্পত্তি ধ্বংসের যথেচ্ছ মামলা দিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। সন্তানসম শিক্ষার্থীরা যারা হাসপাতালের বেডে বা মেঝেয় পড়ে থেকে যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে তাদের কাছে আগে না গিয়ে শেখ হাসিনা ছুটে গিয়েছেন কোথায় কোথায় সরকারী সম্পত্তি নষ্ট বা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে তা দেখতে এবং তা দেখে ক্যামেরার সামনে লোক দেখানো   অশ্রু বিসর্জন করে আহত নিহত শিক্ষার্থীদের জঙ্গী ও সন্ত্রাসী তকমা দিয়ে তাদের কঠোর শাস্তি দিবেন বলে বজ্রকণ্ঠে হুঁঙ্কার ছেড়েছেন। এরূপ পরিস্থিতিতে ছাত্রদের সামনে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া ছাড়া অন্য বিকল্প ছিল ন। ফলত তারা ঘোষণা দেয় যে যতক্ষণ না তাদের সকল দাবী মানা হবে ততক্ষণ তারা রাজপথ ছেড়ে যাবে না।   

শেখ হাসিনার হুঙ্কারকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে তারা আন্দোলনকে আরও তীব্র করেছে। সেই পর্যায়ে তারা নতুন নতুন আগুন ঝরা শ্লোগান এবং কর্মসূচী দিয়েছে যে কথা ইতিমধ্যেই আলোচনা করেছি। সেই সময়ের শ্লোগানগুলো প্রমাণ করে যে হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ ও ক্রোধ কত তীব্র হয়ে আকার ধারণ করেছিলো এবং সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ না করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য যে কোনো মূল্য চুকাতে তারা প্রস্তুত ছিল। 

৩৬ দিনের এই আন্দোলনের শেষ তিন সপ্তাহে তৈরি হয়েছে নতুন নতুন স্লোগান, বদলেছে দাবির ভাষাও। আমি কে তুমি কে, রাজাকার, রাজাকার; কে বলেছে, কে বলেছে, স্বৈরাচার, স্বৈরাচার’—এর মতো শ্লেষের প্রতিবাদ একপর্যায়ে রূপ নেয় সরকার পতনের এক দফা এক দাবিতে। এক দুই তিন চার, শেখ হাসিনা গদি ছাড় - এর মত বজ্রকঠিন কিছু স্লোগান ওঠে। মাঝের তিন সপ্তাহে যে সব স্লোগান শোনা গিয়েছিল - চাইলাম অধিকার হয়ে, হয়ে গেলাম রাজাকার’; ‘আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম, দালালি না রাজপথ, রাজপথ ইত্যাদি। ১৬ই জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নিহত হন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ। এর পর থেকেই স্লোগান শুরু হয়, ‘আমার খায়, আমার পরে, আমার বুকেই গুলি করে’; ‘তোর কোটা তুই নে, আমার ভাই ফিরিয়ে দে’; ‘বন্দুকের নলের সাথে ঝাঁজালো বুকের সংলাপ হয় নাএবং লাশের ভেতর জীবন দে, নইলে গদি ছাইড়া দে’—এসব স্লোগান।  এই শ্লোগানগুলির শব্দ চয়ন বুঝিয়ে দেয় শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল প্রাণ হারানোর কত যন্ত্রণা। সেই সময় পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছিল দ্রুতলয়ে আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন স্লোগান ২রা আগষ্ট রাজধানীর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে শিক্ষার্থীরা স্লোগান দেয় - 'আমার সোনার বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই';একাত্তরের হাতিয়ার গর্জে ওঠো আরেকবার’; ‘যে হাত গুলি করে, সে হাত ভেঙে দাওএবং অ্যাকশন অ্যাকশন ডাইরেক্ট অ্যাকশন ৩রা আগষ্ট ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ থেকে শোনা যায়, ‘আমার ভাই কবরে, খুনিরা কেন বাইরে’; ‘আমার ভাই জেলে কেনএবং গুলি করে আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না। সায়েন্স ল্যাব মোড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিল থেকে শোনা যায়, ‘জাস্টিস জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস’; ‘জ্বালো রে জ্বালো, আগুন জ্বালোএবং ‘দিয়েছি তো রক্ত, আরও দেব রক্ত’;এর মতো স্লোগানগুলো। রিক্সাওয়ালারাও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে একাত্ম হয়ে ৩রা আগষ্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে শ্লোগান দেয়,  গুলি করে আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না’; ‘রক্তের বন্যায়, ভেসে যাবে অন্যায়’; ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার, কে বলেছে কে বলেছে স্বৈরাচার স্বৈরাচারএবংআমার ভাইয়ের রক্ত, বৃথা যেতে দেব নাইত্যাদি তবে সবচেয়ে বেশি সাড়া ফেলেছিল এই শ্লোগানটি – ‘বুকের ভিতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’।   

শ্লোগান লেখা ছিল প্ল্যাকার্ডেওঅনাস্থা অনাস্থা, স্বৈরতন্ত্রে অনাস্থা’; ‘চেয়ে দেখ এই চোখের আগুন, এই ফাগুনেই হবে দ্বিগুণ’; ‘তবে তাই হোক বেশ, জনগণই দেখে নিক এর শেষ’; ‘আমরা আম-জনতা, কম বুঝি ক্ষমতা’; ‘তোমারে বধিবে যে গোকূলে বাড়িছে সে’; ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’; ‘হাল ছেড় না বন্ধু বরং কণ্ঠ ছাড় জোরে’; ‘ফাইট ফর ইওর রাইটস’; ‘নিউটন বোমা বোঝো মানুষ বোঝো নালেখার মতো শ্লেষাত্মক প্ল্যাকার্ডও ছিল হাতে হাতে।

এমন তীব্র গণবিক্ষোভেও শেখ হাসিনার শুভবুদ্ধির উদয় না হলে শিক্ষার্থীরা ৩রা আগষ্ট ৯ দফা দাবি ছেড়ে এক দফা দাবি তথা হাসিনার পদত্যাগের দাবি তোলে এবং দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন ও ঢাকায় লং মার্চের ডাক দেয়। সে সময় তাদের শ্লোগান ছিল – ‘দফা এক দাবি এক, হাসিনার পদত্যাগ’ এবং এক দফা এক দাবি, হাসিনা তুই কবে যাবি’। প্রথমে ৬ই মার্চ ঢাকায় লং মার্চের  ডাক দেয়, পরে একদিন এগিয়ে নিয়ে এসে সেটা ৫ই মার্চ করে। তারপরের যা হয়েছে তাতো ইতিহাস, এক ভয়ংকর স্বৈরাচারী নারী প্রধানমন্ত্রীর পতন হয়েছে, বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে ইতিহাসের এক বিরল অধ্যায়ে প্রবেশ করে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা তাঁর সরকারকে উৎখাত করার জামায়াতি ইসলামী ও মুসলিম জঙ্গি সংগঠনগুলোর একটা গভীর ষড়যন্ত্রের যে অভিযোগ তুলেছিলেন তাকে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয় নি। কারণ, প্রথমত কোটা সংস্কারের দাবি ছিল অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত যে দাবি না মেনে শেখ হাসিনা দমন করার চেষ্টা করেছেন তাঁর দলীয় গুণ্ডাবাহিনী ও রাষ্ট্রশক্তির সাহায্যে নির্মমভাবে। দ্বিতীয়ত ৩৬ দিনের রক্তক্ষয়ী গণবিক্ষোভে লক্ষ লক্ষ ছাত্র ও নাগরিক পথে নেমেছিলো স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে ও মাথায় বেঁধে, মুসলিম জঙ্গিদের কলেমা লেখা কালো পতাকা তেমন চোখে পড়েনি বললেই চলে, ‘আল্লাহো আকবর’, ‘নারায়ে তকবির’, এসব ইসলামী শ্লোগান শোনা যায় নি, শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে ছিল বাংলা ভাষার কবিদের লেখা দেশপ্রেমের গান ও কবিতা,  একাত্তরকে স্মরণ করে শ্লোগান দিয়েছে একাত্তরের হাতিয়ার গর্জে ওঠো আরেকবার’, ধর্মীয় বিভেদসহ সকল বিভেদ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় শ্লোগান ‘আমার সোনার বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই’।  ক্রমশ ...

বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাইনি – পাঁচ

  দ্বিতীয় অধ্যায় শেখ হাসিনা ও শেখ মুজিবের প্রতি তীব্র গণরোষের নেপথ্যে ২০২৪ এর জুলাই অভ্যুত্থানের সফল পরিসমাপ্তি ঘটে ৩৬ দিন পর (৫ই ...