Thursday, November 3, 2016

বাংলাদেশে সংখালঘুদের উপর হামলা অব্যাহত, অব্যাহত ‘ব্লেম গেম’ এর রাজনীতিও – রহস্যটা কী?



খুব সম্প্রতি রূপা গাঙ্গুলি বাংলাদেশের শাসক দল আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন শেষে ঢাকা থেকে ফিরে এসে সাংবাদিকদের বলেন যে সে দেশে হিন্দুরা নিরাপদে আছে। রূপার এ কথা আসলে her master’s voice (হাসিনাজির কথা) বৈ নয়। আমি তাঁর এ কথার  প্রতিবাদে টুইট করেছিলাম – "Most probably what Rupa said is not true."  আমি জানি যে সংখ্যালঘুরা মোটেই নিরাপদে নেই। তবুও রূপা যেহেতু রাজ্যসভার সাংসদ তাই  সৌজন্যবশতঃ তাঁর ঐ  বাজে কথার কড়া প্রতিক্রিয়া দিই নি। রূপা যে ভুল বলেছিলেন তাঁর জবাব মাত্র দিন কয়েক পরই তিনি পেয়ে গেছেন। গত ৩০শে অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলায় এবং হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর বাজারে হিন্দুদের বাড়ি-ঘর লুটপাট এবং মন্দির ও বিগ্রহ ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। ঘটনাটি ঘটে ২ দিন আগে একজন হিন্দু  যুবকের ফেসবুকে দেওয়া ইসলাম-বিদ্বেষী একটি পোষ্ট-এর প্রতিক্রিয়ায়। রসরাজ নামের সেই যুবকটি ফটো এডিট করে কাবার গায়ে শিবের ছবি জুড়ে দেয়। উক্ত ঘটনার ক্ষুব্ধ গ্রামবাসী ছেলেটিকে মারধোর করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। তবুও তারই জেরে নিরপরাধ ও নিরীহ হিন্দু জনগণকে ভয়াবহ হামলার শিকার হতে হলো।    
‘উল্টা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত’ ও ‘খাঁটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত’ নামে দু’টি মুসলিম মৌলবাদী সংগঠনের নেতৃত্বে কয়েক শ’ সশস্ত্র মুসলমান উক্ত হামলা চালায়। হামলায় হিন্দুদের মারধোর, তাঁদের বাড়ি-ঘর লুটপাট, মন্দির ও বিগ্রহ  ভাঙচূরের ঘটনা ঘটে অবাধে। পুলিশ যথারীতি আসে অনেক বিলম্বে, তার আগে দেড় ঘণ্টা ধরে চলে তাণ্ডব। মুসলমানদের হাতে সংখালঘুরা আক্রান্ত হলে তাদের বাঁচাতে পুলিশ কোনো তৎপরতা দেখায় না, বাংলাদেশে এটাই দস্তুর। বিএনপি কিংবা  আওয়ামী লীগ, সরকারে যারাই থাক, পুলিশের কাজের এই ধারা কম বেশী একই থাকে। আর বিলম্বে এসে পুলিশ যা করে তাতে সংখ্যালঘুরা আশ্বস্ত হওয়ার বদলে আরো বেশী আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন। কারণ,পুলিশ সাধারণতঃ সন্ত্রাসী হানার ঘটনাকে লঘু করে দেখায় এবং হামলাকারীদের আড়াল করে থাকে।  নাসিরনগর ও মাধব বাজারের ঘটনাতেও এর ব্যত্যয় ঘটে নি। পুলিশ যথারীতি ‘উল্টা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত’ এবং ‘খাঁটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত’ - কে আড়াল করে দোষ চাপিয়েছে দুষ্কৃতিদের ঘাড়ে এবং আক্রান্ত বাড়ি-ঘর ও মন্দিরের সংখ্যা দেখিয়েছে বেশ কম করে। নাসিরনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল কাদের  বলেছেন যে দুর্বৃত্তরা কুড়িটি বাড়ি ও পাঁচটি মন্দির ভাঙচুর করেছে। কিন্তু স্থানীয় সাংবাদিক মাসুদ হৃদয় বলেছেন যে নাসিরনগরের আটটি হিন্দু পাড়ায় (দত্তপাড়া, ঘোষপাড়া, গাংকুলপাড়া, মহাকালপাড়া, কাশিপাড়া, নমশুদ্রপাড়া, মালিপাড়া ওইশীলপাড়া) অন্তত তিনশটি বসতঘর এবং দশটি মন্দিরে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। অন্য একটি সংবাদ সূত্র বলেছে ক্ষতিগ্রস্ত মন্দিরের সংখ্যা ১৫টি। মাসুক আরো জানিয়েছেন যে যখন লুটপাট ও ভাঙচুর চলছিলো তখন ঘটনাস্থলের আধ কিমি দূরে  ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত’-এর বিক্ষোভ সমাবেশ চলছিলো। সেই সমাবেশ থেকেই যে হিন্দুদের উপর আক্রমণ করার জন্যে প্ররোচিত করা হচ্ছিল তা বলা বাহুল্য।    
 

পুলিশ অবশ্য যথারীতি গোটা ঘটনার দায় দুর্বৃত্তদের কাঁধে চাপিয়ে বলেছে যে কোনো একটা চক্র সরকারের ভাবমুর্তি নষ্ট করতে এ হামলা সংঘটিত করেছে। রাজনৈতিক ভাষ্যকাররা বলছেন, পুলিশের এটা বাঁধা গদের বয়ান। আর চক্র-টক্র নয়, আওয়ামী লীগ তো সরাসরি হামলার দায় চাপিয়েছে বিএনপি-র ঘাড়ে। অপরদিকে বিএনপি-সহ গোটা বিরোধী পক্ষই শুধু আঙুল তুলছে শাসক দল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে।  এভাবেই তারা পরষ্পরকে দোষারোপ করে সুকৌশলে মূল অপরাধী মুসলিম সন্ত্রাসবাদীদের আড়াল করতে চাইছে।  এটাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি।  কোনো সরকারই সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে বা হামলাকারীদের চিহ্নিত করে শাস্তি দিতে আগ্রহী নয়। নাস্তিক ব্লগারদের হত্যার ক্ষেত্রেও তাই হয়। এটা বাংলাদেশে ‘ব্লেম গেম’ – এর রাজনীতি বলে খ্যাত। এ  প্রসঙ্গে বাংলাদেশশের একজন বিশিষ্ট অধ্যাপক ড. অনুপম সেন বলেছেন, ‘ব্লেম গেমে অপরাধীরা আড়ালে চলে যাচ্ছে।’ আর একজন বিশিষ্ট অধ্যাপক ও লেখক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘দেশের প্রধান দু’টি দল মনে করে দোষারোপের সংস্কৃতি দিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিক করা যাবে।’ (সূত্রঃ প্রথম আলো, ২৭.৬.১৬)
বাংলাদেশে  সংখ্যালঘুদের উপর সহিংস অত্যাচার ও নির্যাতনের ঘটনার বিরাম নেই। বন্ধ হওয়ার লক্ষণও নেই। স্বভাবতই দু’টো প্রশ্ন ক্রমশঃ বড়ো হয়ে উঠছে। প্রশ্ন - এক).সংখ্যালঘুদের উপর মুসলিমরা (পড়ুন ঈমানদার মুসলিমরা, সব  মুসলিম নয়) কেন হামলা করে এবং এ হামলা বন্ধ হয় না কেনো? প্রশ্ন – দুই). প্রত্যেকটি হামলায়  সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলি হামলাকারীদের কেনো আড়াল করে? কী তাদের স্বার্থ? দ্বিতীয় প্রশ্নটার উত্তর আগে দি। সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলি আসল অপরাধীদের আড়াল করে প্রধানত যে কারণে তার দুটি দিক আছে। একটি হলো রাজনৈতিক, এবং অন্যটি হলো অর্থনৈতিক, তবে এ ছাড়া অন্য কারণও আছে। রাজনৈতিক কারণটির আবার দুটি ভাগ আছে। তা হলো, এক). সংখ্যালঘুদের মনের মধ্যে মুসলিম মৌলবাদীদের জুজুর ভয় জিইয়ে রাখা যাতে তারা ভয়ে তাদের (পড়ুন আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি) ছত্রছায়ায় থাকতে বাধ্য হয়। এবং দুই). হামলাকারীদের দলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দলের নেতা-কর্মীরাও সামিল থাকে। রাজনীতির ময়দানে এই দুই দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে যতোই দ্বন্দ থাক, সংখ্যালঘুদের উপর হামলা করার সময় তারা সব দ্বন্দ ভুলে এক হয়ে যায়।  তখন দলীয় পতাকা  রেখে ইসলামের পতাকার নীচে জোটবদ্ধ হয়ে সংখ্যালঘুদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। দলীয় এই নেতা-কর্মীদের  ঝাঁপিয়ে পড়ার পেছনে অর্থনৈতিক কারণ বা স্বার্থটি হলো সংখ্যালঘুদের টাকা-পয়সা, জিনিষপত্র ও গয়নাগাঁটি লুট করা, এবং  জমি-জায়গা ও  ব্যবসা-বাণিজ্য দখল করা।  একটি সমীক্ষায় পাওয়া গিয়েছে যে শত্রুসম্পত্তি আইনের প্যাঁচে ফেলে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা হিন্দুদের ৬০% শতাংশ জমি দখল করে নিয়েছে। এ তথ্যটি  জানিয়েয়েছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হায়দার আকবর খান রনো। (সূত্রঃ ঐ)  আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-র সাংসদরা যে সংখ্যালঘুদের জমি দখলে জড়িত সে কথা বলেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সদস্য এবং আইন সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সুলতানা কামালও। গতো গতো ৯ই জানুয়ারী ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবে তিনি বলেন যে, ক্ষমতাবানরা বিভিন্নভাবে দুর্বলের জমি ও সম্পত্তি  দখল করছে। সম্পদ ও পরিবারের ওপর হামলা চালাচ্ছে। বেশিরভাগ জায়গায় সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ আসছে।  তাঁর দেওয়া একটি রিপোর্টে সরাসরি কয়েকজন মন্ত্রী ও সাংসদের নাম উঠে এসেছে যাঁদের মধ্যে রয়েছেন ঠাকুরগাঁওয়ের  সাংসদ  দবিরুল ইসলাম,  পিরোজপুরের সাংসদ এ কে এম এ আউয়াল, দিনাজপুরের পার্বতীপুরের সাংসদ মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার  এবং  রয়েছে ফরিদপুরের মন্ত্রীর নামও। (সূত্রঃ  http://www.thebengalitimes.com/politics/2016/01/09/9817) সংখ্যালঘুদের উপর হামলাকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে আড়াল করার পেছনে অন্য যে কারণটি রয়েছে সেটি উল্লেখ করবো শেষে। 
এবার প্রথম প্রশ্নের প্রসঙ্গে আসা যাক। হিন্দুদের উপর মুসলমানরা কেনো আক্রমণ করে এবং এ আক্রমণ কেনো বন্ধ হয় না? প্রশ্নটির দ্বিতীয় অংশের উত্তরটি আগে দি। উত্তরটি উপরেই রয়েছে যেখানে বলা হয়েছে, সরকার চাই না এটা বন্ধ হোক। সত্যিই যে চাই না তার প্রমাণ হলো  সংখ্যালঘু  নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ না করা।  এটা যে নিছক একটি অভিযগ নয় তার প্রমাণ রয়েছে এ তথ্যটিতে। তথ্যটি হলো - ২০০১ সাল থেকে পরবর্তী ১৩ বছরে কুড়ি হাজার সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে যেসব ঘটনায় সংখ্যালঘুরা ছ’ হাজারের বেশী নিহত  এবং ষাট হাজারের বেশী আহত হয়েছেন।   আহত মানুষদের মধ্যে বারো হাজার মানুষকে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে। সংখ্যালঘুদের উপর  মুসলমানদের হামলা, নির্যাতন ও লুটপাটের ঘটনায় ক্ষতির পরিমান লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে এবং লক্ষাধিক সংখ্যালঘু নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। কুড়ি হাজার  সশস্ত্র হামলার ঘটনাতে একজনও শাস্তি পাই নি। এই হাড় হিম করা তথ্যটি নিশ্চিতভাবেই প্রমাণ করে যে কোনো সরকারই সংখ্যালঘুদের  উপর মুসলিম সন্ত্রাসীদের হামলা বন্ধ করতে চাই না। (উপরের তথ্যটি ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ কাগজ থেকে সংগৃহীত, সূত্রঃ  http://www.bd-pratidin.com/last-page/2014/01/11/37182) আর নাসিরনগরের হামলা সম্পর্কে মানবাধিকার কর্মী ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার তো আরো ভয়ঙ্কর অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেছেন, “পরিকল্পিতভাবে অনেকপ্রশাসন এবং রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের অংশগ্রহণেই হামলা চালানো হয়েছে।”  তিনি আরো বলেছেন যে “এ পরিস্থিতিতে হিন্দুদের বাংলাদেশ ত্যাগ বাড়তে পারে।”(সূত্রঃ  http://www.thebengalitimes.com/politics/2016/11/02/20919)


এবার উত্তর দেওয়া যাক মুসলমানরা কেনো সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার ও নির্যাতন চালায়? মুসলমানরা  (ঈমানদার মুসলমানরা) প্রধানতঃ ধর্মীয় কারণেই এ ধরণের হামলা চালায়। বিষয়টা খোলসা করা যাক। মূর্তিভাঙা হলো ইসলামি সংস্কৃতির অঙ্গ। আফগানিস্তানে তালিবান জামানায় সমস্ত বামিয়ান মূর্তি ধ্বংস করে দেয়া হয়। ইরাক ও সিরিয়ায় অধিকৃত  অঞ্চলসমূহের সমস্ত মূর্তি ও ভাস্কর্য সম্প্রতি ধ্বংস করে দিয়েছে আইএস। সৌদি আরবে  যতো মন্দির ও বিগ্রহ ছিলো তা কবেই ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। আর যে কথা আমাদের জানা দরকার তা হলো এই যে মূর্তিভাঙা সংস্কৃতির প্রচলন করেছিলেন মুহাম্মদ স্বয়ং। ৬৩০ খৃস্টাব্দে মক্কা দখল করে প্রথমেই তিনি কাবা গৃহের সমস্ত (৩৬০টি) মূর্তিই ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। মূর্তি ধ্বংস করা প্রসঙ্গে এ যুগের খ্যাতনামা ধর্মগুরু ও ইসলাম ধর্মের প্রচারক ডা জাকির নায়েক যা বলছেন তা খুবই প্রণিধানযোগ্য। কি বলেছেন  শুনুন এই ভিডিওটায় -https://youtu.be/049N05V48C8। আর অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে হামলা (ইসলামের পরিভাষায় জিহাদ বা যুদ্ধ) করা তো হলো ইসলামের প্রধান নীতি। এ বিষয়ে কোরানে অসংখ্য আয়াত বা অধ্যাদেশ রয়েছে। কোরান প্রাঞ্জল ভাষায় ঘোষণা করেছে যে, 'পৃথিবীতে অবিশ্বাসীদের ঠাঁই নেই।' এ প্রসঙ্গে কোরানের একটি ভাষ্য হলো এ রকম - ‘পৃথিবীতে কোনো অবিশ্বাসী গৃহবাসীকে তুমি অব্যাহতি দিও না।” (৭/১২৬) আর অবিশ্বাসীমুক্ত পৃথিবী গড়তে কোরান কী বলেছে তার একটা নমুনা দেখুন। -  “জিহাদ করো তাদের সঙ্গে যারা আল্লাহতে বিশ্বাস করে না আর আখেরাতের দিনেও না, আর নিষেধ করে না যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল নিষেধ করেছেন, আর সত্য ধর্মে ধর্মনিষ্ঠা পালন করে না।” ( ৯/২৯) এরূপ আরো অনেক আয়াত আছে কোরানে। কোরানের এ আয়াতগুলি আবৃত্তি করেই মুহাম্মদ ক্ষান্ত থাকেন নি। তিনি মৃত্যশয্যায় তাঁর সাহাবিদের আরবকে মুশরিক-মুক্ত করার নছিহত করে গিয়েছেন।  নছিহতটি হলো - “কোনও মোশরেক যেন আরবে থাকতে না পারে।” (দ্রঃ- মৃত্যুর দুয়ারে মানবতা, মাওলানা আবুল কালাম আযাদ, ইসলামিয়া লাইব্রেরী ঢাকা, পৃ – ১৬)  কোরান ও মুহাম্মদের এই আদেশ কার্যকর করাই হলো বাংলাদেশের ঈমানদারমুসলমানদের মূল লক্ষ্য, শুধু টাকা-পয়সা ও জমি-জায়গা লুট করাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশকে মুশরিক-মুক্ত করার মহান(!) লক্ষ্য নিয়েই সংখ্যালঘুদের উপর ঈমানদার মুসলমানরা হামলা ও নির্যাতন চালায়। 


পরিশেষে বলি যে, সরকারের সর্বস্তরে অর্থাৎ মন্ত্রী ও সাংসদ থেকে শুরু করে সরকারি  সাধারণ প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসনের প্রত্যেকটি শাখায় ছড়িয়ে রয়েছে মুসলিম মৌলবাদীদের লোকেরা। এই আধিকারিকগুলো (যাদের মধ্যে সচিব থেকে ডিম এবং ডিজি থেকে থানার বড়ো বাবু রয়েছেন) ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার প্রতি মোটেই দায়বদ্ধ নয়, তারা বরং দায়বদ্ধ মোশরেক মুক্ত বাংলাদেশ তথা ইসলামি বাংলাদেশ গড়ার ঈমানদারী কাজে। সেজন্যেই ঈমানদার মুসলিমরা সংখ্যালঘু তথা মোশরেকদের উপর সন্ত্রাসী হামলা চালায় তখন প্রশাসন নিষ্ক্রিয় থাকে এবং হামলাকারী ঈমানদার মুসুলমানরা যাতে শাস্তি না পায় তার ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করে।                   
      
       

    
      

Saturday, October 29, 2016

ইচ্ছাপত্র (Will)



 ইচ্ছাপত্র

২৫.৬.০৫

বৈকাল – ৩টা ২৫মি.

স্নেহের বহ্নি,

* স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছি।  আমার মৃত্যুর জন্য কোনো ব্যক্তি দায়ী নহে।

* আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী এই সমাজ। সমাজের তথাকথিত নিয়ম-শৃংখলা ও মূল্যবোধে বহুদিন থেকেই আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। যারা সমস্ত রকম সংস্কার ভাঙতে চাই বা অস্বীকার করতে চাই এই সমাজ তাদের কাছে একটা ভয়ঙ্কর কারাগার। এখানে স্বাধীনভাবে শ্বাস নেওয়া যায় না। দীর্ঘকাল এই কারাগারে থাকতে থাকতে আমি ক্লান্ত, অবসন্ন। তাই এই সমাজকে চির বিদায় জানিয়ে মুক্তি নিলাম।
* না, (দলীয়) রাজনীতি ছেড়ে আমি হতাশ হই নি। দীর্ঘকাল রাজনীতি করেছি। কিন্তু শেষের দিকে দুর্নীতি, স্বজনপোষণ আর মিথ্যার সঙ্গে সঙ্গে আপোষ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। পার্টি শৃংখলা মেনে সব সহ্য করতে হচ্ছিল। স্বেচ্ছারোপিত শৃঙ্খলা আক্ষরিক (বাস্তবে) হাতে-পায়ে-মুখে শৃঙ্খল হয়ে পড়েছিল। পার্টি ছেড়ে অবশ্যই নিজেকে শৃঙ্খল মুক্ত করেছিলাম। তারজন্য আপশোষ তো ছিলই না, ছিল বরং স্বস্তি।

  •      * আমার মৃত্যুর পর যেন কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান না হয়।
  •      * আমার লাশ নিয়ে যেন জানাযা না হয়।

  •      * আমার লাশ যদি ‘Medical Science’ নেয় তবে কলকাতায় যে কোনো Medical College – এ পৌঁছে দিস, যদি পারিস।
  •      * যদি না পারিস তবে আমাদের যেটুকু জায়গা আছে সেখানে সমাধিস্থ করবি এক কোণে যাতে জায়গা কম নষ্ট হয়।


* জঙ্গীপুর গৌড় গ্রামীণ ব্যাংকে দুটো সার্টিফিকেট (NSC) বন্ধক দিয়ে ১০০০ টাকা ঋণ নেওয়া আছে।

* LIC অফিস থেকে দুটো পলিসির বিপরীতে ৫০০০০ টাকার কিছু কম ঋণ নেওয়া আছে।


ঃ-একান্ত ইচ্ছাঃ-

ক) কতকগুলি নিবন্ধ আমার বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। কিছু চিঠি প্রকাশিত হয়েছে ‘আজকাল’ পত্রিকায়। কয়েকটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে দুটি পত্রিকার বিশেষ সংখ্যায়। পারলে সেগুলো সংরক্ষণ করিস। আমার দৃষ্টিভিঙ্গী খুঁজে পাবি সে সব লেখায়।

খ) বিভিন্ন খাতে তোরা যে টাকা পাবি তাতে জানি না তোদের লেখাপড়া ও ভরণ-পোষণের অসুবিধা হবে কি না। যদি মনে করিস ভীষণ রকমের অসুবিধা হবে না, তবে প্রাপ্ত টাকা থেকে ৫০০০০ টাকা [পঞ্চাশ হাজার] MIS  না কি একটা স্কীম আছে সেখানে জমা রাখিস। সেখান থেকে যে টাকাটা মাসে মাসে বা বৎসর শেষে পাবি সে টাকা দিয়ে গরীব ছেলে মেয়েদের বই কিনে দিস।



* ধর্ম তৈরী হয়েছে অজ্ঞানতা ও আতঙ্ক থেকে। যারা ধর্ম বিশ্বাস ও পালন করে তারা নিজেরা জানে না ধর্ম আসলে কী এবং এর ভিতর কী আছে। দরিদ্র মানুষকে ধর্ম শেখায় আল্লাহ তোমার ঈমান পরীক্ষা করছে। তুমি অনাহারে আছো, তোমার সন্তান বিনা ঔষধে বিনা চিকিৎসায় মরছে, তোমার সন্তান খাদ্য-বস্ত্র-শিক্ষা পায় না, দুর্ঘটনায় তোমার স্বজন মরেছে - এসবই তারই ইচ্ছা।  তুমি এ সবের জন্য ক্ষোভ করো না, অসন্তুষ্ট হবে না, আল্লাহ/ভগবান রুষ্ট হবে।  তাহলে তোমার নরকবাস হবে। এভাবে ধর্ম মানুষকে শেখায় প্রতিবাদ না করতে। ধর্ম এ যুগে শোষক শ্রেণীর শক্তিশালি হাতিয়ার। মানুষ মানুষকে শোষণ করে তাই একদল লোক বিত্তবান হয় আর বিশাল সংখ্যক মানুষ বিত্তহীন হয় – ধর্ম অর্থনীতির এই রহস্যকে আড়াল করে শোষক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করে। ধর্ম এ ভাবেই শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ আন্দোলন থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখে।

নারীর প্রতি সবচেয়ে অন্যায়, অবিচার ও নির্যাতন হয় ধর্মের কারণে। নারীকে বলেছে ধর্ম, স্বামী তোমার দেবতা, স্বামীর পূজা ও সেবা করা তোমার ধর্ম, স্বামীকে সন্তুষ্ট রাখো আল্লাহ/ভগবান সন্তুষ্ট হবে, শত অত্যাচারেও স্বামীর বিরুদ্ধাচারণ করবে না, করলে স্বামী যদি অসন্তুষ্ট হয় তবে ওপরওয়ালাও অসন্তুষ্ট হবে, তাহলে তোমার নরকবাস হবে। নরকের ভয় দেখিয়ে ধর্ম নারীকে পুরুষের পদানত করে রেখেছে। হাতে শাঁখা, সিঁথিতে সিঁদুর, মাথায় আঁচল বা বোরখা পরে নারীকে বোঝাতে হয় যে তার একজন মালিক আছে, মালিকটি হলো তার স্বামী-দেবতা। স্বামীর মৃত্যুর পরও স্ত্রীকে শাঁখা-সিঁদুর ভেঙে-মুছে, থান-কাপড় পরে, কৃচ্ছ্বসাধন করে বোঝাতে হয় যে তার একজন মালিক ছিল সে এখন আর নাই। নারীর নিজস্বতা বলতে কিছু নেই, স্বাধীনতা তো অনেক বড় বিষয়। নারীর নিজস্ব পরিচয় থাকতে নেই, হয় পিতার নামে না হয় স্বামীর নামে তাকে চেনাতে হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকেও স্বামীর চিহ্ন বহন করতে হয় তার নামের সঙ্গে। কী হিন্দু কী মুসলমান বিয়ের পর নারীকে সর্বদা স্বামীর পদবী ধারণ করতে হয়। নারী যদি অন্য ধর্মাবলম্বী পুরুষকে বিয়ে করে তবে তাকে পুরুষ স্বামীর ধর্ম গ্রহণ করতে হয়, নিজের ধর্ম ত্যাগ করতে হয়। নারী ধর্ষিতা হলে পুরুষ তাকে নষ্ট মেয়ে বলে দূর দূর করে তেড়ে দেয় অথচ ধর্ষক পুরুষ বুক ফুলিয়ে সমাজে বাস করে, সমাজ তাকে আদর করে বরণ করে, বিধায়ক করে, মন্ত্রী করে। পুরুষতন্ত্র এ সব নিয়ম চালু করেছে, আর ধর্মের থেকে জল-আলো-বাতাস নিয়ে পুরুষতন্ত্র ক্রমশঃ যেন অপরাজেয় হয়ে উঠছে। নারীর ওপর সকল অত্যাচারের বিরুদ্ধে নারী কার্যতঃ চুপ, কারণ নারী মনে করে এসব বিধান আল্লাহ/ভগবন প্রদত্ত। ধর্ম এভাবেই নারীকে চুপ করিয়ে রেখেছে পরকালের নরকবাসের ভয় দেখিয়ে। এসবই মিথ্যে, মনুষ্য সৃষ্টি, মানুষ যদি বেশী শিক্ষিত হতো এবং সব ধর্মকে নিজের মাতৃভাষায় ভালো করে পড়ে যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে বিচার করতে পারত তবে ধর্মের প্রতি অন্ধ বিশ্বাস বহগুণে দূর হোত। তাহলে সমাজের চেহারাটাই বদলে যেত।

বহ্নি, তোকে এসব কথাগুলো লিখলাম এজন্য যে, তুইও অন্ধভাবে আল্লাহ-কোরান এসবে বিশ্বাস করিস। তোর প্রতি পরামর্শ – কোনো কিছুই অন্ধভাবে বিশ্বাস ও মেনে চলবি না। ধর্ম মানুষকে ভুল পথে নিয়ে যায়। আমার কথাগুলোও অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে হবে না। আমার আলমারিতে বহু বই আছে, তাতে ধর্মপুস্তক আছে, ধর্মের পক্ষে লেখা বই আছে, আছে কিছু বই যাতে ধর্মের স্বরূপ উদ্ঘাটন করা আছে। সেগুলো পড়ে নিজস্ব স্বাধীন ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহণ করবি।

আর একটা কারণে এসব কথা লিখলাম – আমি চেয়েছিলাম এইসব বিষয়ে লেখালেখি করে মানুষকে সমাজ সচেতন করার কাজে একটু অবদান রেখে যেতে। সমাজের সকল অসঙ্গতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে। কিন্তু সেটা আর হলো না। এই একমাত্র আক্ষেপ নিয়ে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছি। আর কোনো আক্ষেপ আমার নেই।

* যতদূর স্মরণে আছে, আমার ঋণ যা ছিল সব শোধ করে দিয়েছি।

* আমার এই ‘উইল’টি (ইচ্ছাপত্র) ‘জংগীপুর চিঠি’-র দপ্তরে জেরক্স করে পৌঁছে দিস, যদি সম্পাদক মনে করে তবে ছাপাবে। ছাপালে যেন পুরোটাই ছাপায়। জানি, অনেক গুজব বা জল্পনা-কল্পনা হবে আমার স্বেচ্ছামৃত্যুর পর।  কাগজে যদি এটা ছাপে তবে সেই কল্পনা-জল্পনার কিয়দংশে অবসান হতে পারে।  ইতি তোর বাবা – গিয়াসুদ্দিন

২৫/৬/০৫, বিকাল – ৫টা।


 (বিঃদ্রঃ- ইচ্ছাপত্রটি নিয়ে কয়েকটি কথা বলা আবশ্যক। কথাগুলি হলোঃ- প্রথমতঃ  এটা লিখেছি ১১ বছর আগে যখন মাত্র কয়েক ঘন্টা পর পৃথিবী থেকে নিশ্চিতভাবেই বিদায় নিতে যাচ্ছি ঠিক তখন। তখন মস্তিষ্কের কোষগুলি আমার কী মাত্রায় চঞ্চল ও অস্থির ছিলো তা সহজেই অনুমেয়। তা ছাড়া এই ১১ বছরে আমার চিন্তাধারা ও অভিজ্ঞতায় আরো স্বচ্ছতা এসেছে। স্বভাবতই ইচ্ছাপত্রটি সম্পাদনা ও হালনাগাদ (update) করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। কিন্তু করিনি। কারণ সে সময়ের ‘আমি’ (অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে হলেও) কী ভেবেছিলাম, কী চেয়েছিলাম তা সংরক্ষণ করতে চাই।  দ্বিতীয়তঃ  তখনো আমার কলম থেকে আল্লাহ, মুহাম্মদ ও কোরানকে সরাসরি অস্বীকার ও আক্রমণ করে কোনো লেখা বের হয় নি। স্বভাবতই ‘মোরতাদ’ ও ‘মুণ্ডুচ্ছেদ’ এর ফতোয়া তখনো আমার উপর জারি হয় নি। অর্থাৎ তখনো মুসলিম সমাজে আমি একজন বিশিষ্ট সম্মানিত মুসলিম ব্যক্তিত্ব। তৃতীয়তঃ ‘বহ্নি’ হলো আমার পুত্র যাকে উদ্দেশ্য করে ইচ্ছাপত্রটি লিখেছিলাম।  সে কিন্তু এখন আর আস্তিক নেই, তবে আমার মতো অনুশীলনকারী নাস্তিকও (practicing atheist) সে নয়।    তাং - ২৯.১০.২০১৬)        



বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাইনি – পাঁচ

  দ্বিতীয় অধ্যায় শেখ হাসিনা ও শেখ মুজিবের প্রতি তীব্র গণরোষের নেপথ্যে ২০২৪ এর জুলাই অভ্যুত্থানের সফল পরিসমাপ্তি ঘটে ৩৬ দিন পর (৫ই ...