Wednesday, October 28, 2015

হিযাবঃ নারী দাসত্বের প্রতীক



প্রাক ইসলাম যুগে আরবে নারী আজকের মুসলিমদের তুলনায় অনেক বেশী স্বাধীনতা ও অধিকার ভোগ করতো এবং অনেক বেশী সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী ছিলো। এ বিষয়টি পৃথক একটি অধ্যায়ে একটু বিশদে আলোচনা করা হয়েছে। এখানে শুধু এ প্রসঙ্গে এ টুকু বলার যে মুসলিমদের ধারণা ও বিশ্বাস ঠিক এর বিপরীত। শুধু মুসলিমদের মধ্যেই নয়, একই ধারণা ও বিশ্বাস বিদ্যমান রয়েছে  অমুসলিমদের   মধ্যেও। তাঁরা মনে করেন যে  মুহাম্মদ যখন  আরবে জন্মগ্রহণ করেন তখন নারীদের অবস্থা ছিলো খুবই সঙ্গীন, ক্রীতদাসীর মতো তাদের জীবন যাপন করতে হতো, এমনকি তাদের জন্মের পর মেরে ফেলাও হতো। মুহাম্মদ সেই অবস্থা থেকে নারীকে উদ্ধার করেন এবং তাদের  পুরুষের সমান অধিকার ও স্বাধীনতা দেন। মুসলিম সমাজ তো মুহাম্মদকেই নারীর একমাত্র নারীর ত্রাণকর্তা ও মুক্তিদাতা বলে মানেন। মুসলিমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে মুহাম্মদই বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নারীবাদী ব্যক্তিত্ব। নারীর  প্রতি কতো দরদ ছিলো এবং সারা জীবন কীভাবে নারীর স্বাধীনতা, মুক্তি ও কল্যাণের জন্যে মুহাম্মদ সংগ্রাম করেছেন তাঁর বিবরণ দিতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের একজন খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবী ও ইসলামি পণ্ডিত লিখেছেন, “নিখিল জগতের দুর্গত রমণীকুলের অচিন্ত্যণীয় ঐতিহাসিক ত্রাণকারী মানব, যিনি তাঁর সমস্ত শক্তির অর্ধেকটা নিযুক্ত করেছিলেন সারা সৃষ্টি জগতের কল্যাণের জন্য, দুর্গত মানুষের জন্য। বাকি অর্ধেকটা নিয়োগ করেছিলেন শুধু মাত্র মায়ের জাতি, অবহেলিত, নির্যাতিত নারী সম্প্রদায়ের জন্য ... ।” (দ্রঃ মহানবী, ড. ওসমান গণি, পৃ – ৩৯০) মুহাম্মদ সম্পর্কে এরূপ মূল্যায়ন ও দাবী সম্পূর্ণ অবাস্তব ও ভিত্তিহীন। বরং সত্যিটা হলো এই যে, আরব বেদুইন রমণীরা যে সব স্বাধীনতা ও অধিকার ভোগ করতো মুহাম্মদ সেগুলির সবই একে একে হরণ করে নিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে দৃষ্টান্ত হিসেবে সর্বাগ্রে হিযাবের কথা উল্লেখ করা যায়। প্রাক ইসলাম যুগে আরবে ‘হিযাব’- এর প্রচলন ছিলো না। ‘হিযাব’ হলো নারী দাসত্বের একটি ঘৃণ্য প্রতীক যা মুহাম্মদ আরোপ করেন মুসলিম নারীর উপর। প্রাক ইসলাম যুগে আরব নারী প্রায় পুরুষের মতোই স্বাধীনভাবে জীবন-যাপন করতো। তারা ব্যবসা-বাণিজ্য করতো এবং যুদ্ধেও অংশ নিতো। মুহাম্মদ নারীর সেই সব স্বাধীনতাগুলির ওপর হস্তক্ষেপ করে তাদের গৃহবন্দি ও  পর্দানসীন  করেন। নারীর পর্দানসীনতাই ইসলামের পরিভাষায় ‘হিযাব’। মুহাম্মদ আল্লাহর দোহাই দিয়ে ‘হিযাব’ প্রসঙ্গে বলেছেন, “এবং বিশ্বাসিনী নারীদিগকে বলো, তারা যেনো স্ব স্ব দৃষ্টি সকলকে বদ্ধ করে এবং কণ্ঠদেশে স্বীয় বস্ত্রাঞ্চল ঝুলাইয়া রাখে।” (কোরান, ২৪/৩১) কোরানে এ প্রসঙ্গে আর একটি আদেশনামা রয়েছে। সেটা হলো – “হে নবী (সঃ)! তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে এবং মুমিনদের নারিদেরকে বলঃ তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ তাদের নিজেদের উপরে টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে; ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু ।” (৩৩/৫৯) 
নারী কী করবে কী করবে না, কী পরবে ও কীভাবে পরবে এবং কী পরবে না, কীভাবে চলবে কীভাবে চলবে না, কীভাবে কথা বলবে কীভাবে বলবে না, এ সব নানাবিধ নিয়ম-কানুন বা বিধান যা সমাজে চালু আছে তা সবই পুরুষেরদের রচিত। নারীকে ঘরের মধ্যে আবদ্ধ জীবন যাপন করতে হয় সেই বিধান মেনেই। এ সব বিধানের সামান্য উল্লঙ্ঘন করলে বা এদিক ওদিক করলে নারীকে পেতে হয় শাস্তি ও নানারূপ ভর্ৎসনা। অসতী, কুলটা, বেহায়া, চরিত্রহীন, বেশ্যা এরূপ পুরুষ রচিত কুৎসিত ভাষা ও নোংরা গালাগাল শুনতে হয় তাদের। পাছে নারী এসব গালাগাল ও অপবাদ অগ্রাহ্য করে সেজন্যে তাদের পরকালের শাস্তির ভয়ও দেখানো হয়। নারীকে পুরুষ শিখিয়েছে, তার প্রধান ধর্ম হলো পতিসেবা করা। নারী যদি পতিসেবায় সামান্য ত্রুটি করে তবে মৃত্যুর পর তার জন্যে রয়েছে ভয়ংকর শাস্তি, এ কথা তাকে পুরুষ বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। নারীর ‘মুক্তিদাতা’ মুহাম্মদ পুরুষ রচিত সেই কুৎসিত বিধানগুলি শুধু অনুমোদনই করেন নি, আপন ভঙ্গিমায় সেগুলিকে আরো নবরূপে এবং আরো কঠোর ও নিবিড় করে আল্লাহর নামে আইনরূপে প্রবর্তন করেছেন। তিনি জানিয়েছেন অবলীলায় যে, পতিসেবায় সামান্য ত্রুটি হলে পরকালে নারীকে কঠোর শাস্তি পেতে হবে তা তিনি নিজের চোখে দেখে এসেছেন আল্লাহর নিকট গিয়ে। কী দেখেছেন তা বর্ণনা করতে গিয়ে  তিনি বলেছেন, “তিনি বললেন আমি তো জান্নাত দেখেছিলাম এবং একগুচ্ছ আঙ্গুরের প্রতি হাত বাড়িয়েছিলাম, আমি তা পেয়ে গেলে, দুনিয়া কায়েম থাকা পর্যন্ত তোমরা তা খেতে পারতে।  তার পর আমি জাহান্নামে  দেখলাম, আজকের মতো ভয়াবহ দৃশ্য আর কখনও দেখিনি। আর দেখলাম  জাহান্নামের অধিকাংশ অধিবাসী স্ত্রীলোক। লোকেরা জিজ্ঞাসা করল, ইয়া রাসুলুল্লাহ! কী কারণে? তিনি বললেন, তাদের কুফুরীর কারণে। জিজ্ঞাসা করা হলো, তারা কি আল্লাহর সাথে কুফুরী করেছে? তিনি উত্তর দিলেন, স্বামীর অবাধ্য থেকে এবং তাদের এহসান অস্বীকার করে।”  (বোখারী শরিফ, ১ম-৭ম খণ্ডে একত্রে, মল্লিক ব্রাদার্স, কলকাতা, হাদিস নং ৩৬৪) নারীকে কীভাবে পতিসেবা করতে হবে তার খুঁটিনাটি বিবরণ দিয়ে গেছেন মুহাম্মদ। তিনি যা বলেছেন তার মধ্যে রয়েছে এ হাদিসটি, “হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন - স্বামী যদি স্ত্রীকে বিছানার প্রতি আহ্বান করে এবং তাতে স্ত্রী অসম্মতি প্রকাশ করে, যদ্দরুণ স্বামী অসন্তুষ্টির সহিত রাত্রি যাপন করে তবে সেই স্ত্রীর রাত্রি এই অবস্থায় অতিবাহিত হয় যে, ফিরিস্তাগণ রাত ভোর পর্যন্ত তার প্রতি লানত (অভিশাপ) বর্ষণ করে ।” (সূত্র – ঐ, হাদিস নং ১১১৫) এ হাদিস অনুযায়ী এটা স্পষ্ট হয় যে, পতির যৌন কামনা ও যৌন-ক্ষুধা পূরণে পত্নীর কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি বাধা হতে পারে না। পতির যৌন আবেদনে সাড়া দেওয়াই যে নারীর প্রাথমিক ও প্রধান কর্তব্য সেটা মুহাম্মদ স্পষ্ট করে দিয়েছেন আর একটি হাদিসে। হাদিসটি হলো – “যদি কোন ব্যক্তি সঙ্গম করার ইচ্ছায় স্ত্রীকে আহ্বান করে তবে সে যেন তৎক্ষণাৎ তার নিকট উপস্থিত হয় যদি সে উনানের উপর রন্ধনের কাজে লিপ্তও থাকে।” (মুসলিম শরীফ) নারীর ধর্মের নামে নারীর প্রতি এ সব নির্দেশ হলো নারী দাসত্বের এক একটি ঘৃণ্য বিধান। নারী দাসত্বের অনেক বিধান আছে যা নারীকে সর্বদা স্বীয় অঙ্গে বহন করতে হয়। যেমন হিন্দু নারীর হাতের শাখা, সিঁথির সিঁদুর, পতির পদবী ধারণ ইত্যাদি। তবে স্বীয় অঙ্গে বহন করার সবচেয়ে ঘৃণ্য দৃষ্টান্তটি হলো ‘হিযাব’। নারী দাসত্বের এই ঘৃণ্যতম ও অসভ্যতম প্রতীকটি বহন করতে হয় কেবল মুসলিম নারীদেরকেই।

হিযাবের পক্ষে মুসলিম পণ্ডিতগণ অনেক যুক্তি (আসলে অপযুক্তি বা কুযুক্তি) দেখালেও মুসলিম নারীরা কিন্তু হিযাবকে তাদের স্বাধীনতার উপর নগ্ন হস্তক্ষেপ বলেই মনে করে। ইসলামি রাষ্ট্রগুলিতে মুসলিম নারীরা সবাই বোরখা পরে। তা এ জন্যে নয় যে, তারা সকলেই বোরখা পরিধান করাকে সমর্থন করে। খুব কম মেয়েই আছে যারা বোরখা পরার আল্লাহর নির্দেশকে নীতিগতভাবে সমর্থন করে এবং স্বেচ্ছায় বোরখা পরে। অধিকাংশ নারীই ভয়ে বোরখা পরে যেহেতু সে সব দেশের আইনে বোরখা পরা বাধ্যতামূলক এবং বোরখা না পরে রাস্তায় বের হওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যে সব মুসলিম দেশে সাংবিধানিক আইনে বোরখা পরা বাধ্যতামূলক নয় এবং বোরখা না পরলে শাস্তির মুখে পরতে হয় না সেখানে ৮০-৯০% মুসলিম নারীই বোরখা বর্জন করেছে। ভারতের সংবিধানেও মুসলিম নারীদের বোরখা পরা বাধ্যতামূলক নয় বলে ভারতের মুসলিম নারীরাও ৮০-৯০ শতাংশই বোরখা পরে না। এটাই সত্যি যে মুসলিম নারীরা বোরখা বা হিযাব পরতে চায় না। না, এটা  কারো মনগড়া কথা নয়, ইতিহাসে এর ভুরি ভুরি প্রমাণ আছে।  মুসলিম নারী  যুগে যুগে দেশে দেশে হিযাবের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। সে সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। হিযাব সম্পর্কে মুসলিম নারীদের মনোভাব জানবার জন্যে সে ইতিহাস আমাদের জানা আবশ্যক। সেই ইতিহাসের পাতায় একটু চোখ বুলানো যাক।  ইরানের আমেরিকা প্রবাসী একজন খ্যাতনামা ঐতিহাসিক ও লেখক এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, “In the struggle for the liberation for the Muslim woman the veil has become a symbol of her servitude. Thus in 1923 the president of the Egyptian Feminist Union Mr. Houda Cha’araoui, and her colleagues defiantly threw their veils into the sea. Similarly in 1927 there was a campaign of “de-hijabization” in communist Turkestan. Not less than 87,000 Uzbek women publicly repudiated their “black cowls”, though not  less than 300 of their sisters had been killed by the male heads of the Muslim families for betraying Islam. In 1928, at the independence celebrations, the Shah of Afghanistan ordered his wife to “unveil” herself in public. Following the public scandal, the shah was obliged to backtrack and cancel his projects for the emancipation of women. He himself was obliged to abdicate. In 1936 Reza Shah of Iran forbade the tchador by a special decree. Obviously the people were not ready to break with tradition and so after mass protests in 1941 he also had to retreat and abrogate law. (Why I am not a Muslim, Ibn Warraq, p. 315, Prometheus Books, New York)  মুসলিম নারীদের মুক্তির সংগ্রামে হিযাব একটি দাসত্বের প্রতীক হয়ে উঠে। তাই ১৯২৩ সালে ইজিপ্টের নারীবাদী সঙ্ঘের সভানেত্রী ও তাঁর সহকর্মীরা সমুদ্রের জলে হিযাব  ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। অনুরূপভাবে ১৯২৭ সালে কম্যুনিস্ট শাসিত তুর্কিস্তানে হিযাব-বিরোধী প্রচার আন্দোলন গড়ে তোলা হয়েছিলো। সে সময় কম পক্ষে ৮৭০০০ (সাতাশি হাজার) মুসলিম নারী একযোগে তাদের “কালো মস্তকাবরণ” প্রকাশ্যেই বর্জন করেছিলেন যদিও তার জন্যে কম পক্ষে ৩০০ জন মুসলিম নারীকে ইসলাম বর্জন করার অভিযোগে তাদের পরিবারের পুরুষ অভিভাবকরা হত্যা করেছিলো। ১৯২৮ সালে আফগানিস্তানের শাহ তাঁর পত্নীকে প্রকাশ্যে স্বাধীনতা উদযাপনের একটি অনুষ্ঠানে ‘হিযাব’ বর্জন করতে বলেছিলেন। পরে প্রবল লোক নিন্দার কারণে তিনি  পিছু হটতে বাধ্য হন এবং নারী মুক্তির কর্মসূচী বাতিল করেন। ১৯৩৬ সালে ইরানের শাহ চাদর (হিযাব) বর্জনের জন্যে একটি বিশেষ অধ্যাদেশ জারি করেন। কিন্তু ইরানের জনগণ সে ঐতিহ্য বর্জনের জন্যে প্রস্তুত ছিলো না, ফলে মানুষের তীব্র প্রতিবাদের  মুখে ১৯৪১ সালে শাহ পিছু হটতে বাধ্য হন  এবং  আইনটি (অধ্যাদেশটি) প্রত্যাহার করেন। ‘হিযাব’ শব্দটি এসেছে আরবি শব্দ হাযাবা থেকে। ‘হাযাবা’র মানে হলো আড়াল করা বা গোপন করা। শরিয়তি আইনে  হিযাবের উপর একটি অধ্যায় বিদ্যমান। হিযাব-আইনটি থেকে বোঝা যায় যে, প্রাক ইসলাম যুগে আরবে নারী ও পুরুষ স্বচ্ছন্দে এক সঙ্গে চলাফেরা ও মেলামেশা  করতো। আধুনিক সমাজেও মুসলিম মেয়েদের কাছে হিযাবের গ্রহণযোগ্যতা নেই তা চারিদিকে চোখ রাখলেই বোঝা যায়, এবং হয় তো কোনো কালেই ছিলো না। আধুনিক মুসলিম সমাজ যেহেতু হিযাব পরতে সম্মত নই, তাই ইসলামি আইনের সংস্কারপন্থীরা অনেকেই হিযাবকে সংশোধিত রূপে উপস্থাপিত করার চেষ্টায় মগ্ন রয়েছেন। তাদের কেউ কেউ বলেন যে, হিযাব শুধু মুহাম্মদের পত্নীদের জন্যে প্রযোয্য, সমস্ত মুসলিম নারীদের জন্যে নয়। আবার হিযাবকে আধুনিক সমাজের মুসলিম নারীদের কাছে গ্রহণযোগ্য করার উদ্দেশ্যে সংস্কারপন্থীরা হিযাবের আকার, আকৃতি ও আয়তন নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত ও মশলা ব্যক্ত করেছেন। তাদের একটা অভিমত হলো, নারীর কিয়দংশ চোখ, নাক, হাত ও পায়ের অগ্রভাগ খোলা রেখে শরীরের বাকি অংশ কাপড় দিয়ে ঢাকতে হবে। কিন্তু কোরানের উপরে উল্লেখিত আয়াত দু’টি সংস্কারপন্থীদের এই মতকে নস্যাত করে দেয়। সংস্কারপন্থীদের অভিমত ও বাখ্যা-বিশ্লেষণ কোরান দ্বারা সমর্থিত ও স্বীকৃত না হলেও তার প্রভাব পড়েছে মুসলিম সমাজে। তৈরী হয়েছে হিযাবের খুঁটিনাটি নিয়ে মতভেদ। ফলে হিযাবের ভিন্ন পোশাক ও ভিন্ন ভিন্ন অনুবাদের প্রচলন দেখা যায় বিভিন্ন দেশে ও   ভাষায়। বাংলায় হিযাব বলতে বোঝানো হয় পর্দা, বোরখা, চাদর ইত্যাদি। ইংরাজীতে ব্যবহার করা হয় Veil, Cloak, Outer Garment, Shawl  ইত্যাদি শব্দ। মুসলিম দেশগুলিতে হিযাবকে কী বলে সে প্রসঙ্গে ইবন ওয়ারাক তাঁর উক্ত গ্রন্থে একটি বর্ণনা দিয়েছেন । তিনি লিখেছেন – In Morocco, Algeria, and Tunisia we find haik, safsari, akhnif, and adjar. In Egypt, Israel, Syria, Iraq, and among the Bedouins, we find abaya, tarna, izar, milhafa, khabara, chambar, niquab, litham, and bourqou; in Iran, bourda, tchadar, pitcha, and rouband; in Turkey, yatchmek, yalek, harmaniya, and entari; in India and Pakistan, burka.


নারী গৃহবন্দী
বিভিন্ন দেশে এবং একই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হিযাবের পোশাকেও বিভিন্নতা দেখা যায়। আগেই বলেছি যে হিযাব শব্দের মানে হলো কোনো বস্তুকে লুকানো বা আড়াল করা। কিন্তু নারীকে এক টুকরো কাপড়ে সম্পূর্ণ লুকানো সম্ভব নয়। তাই হিযাবের মধ্যেই রয়েছে কিছু কিছু উপধারা যাতে নারীকে সম্পূর্ণই লুকিয়ে রাখা সম্ভব হয়। কোরানে দু’টি আয়াত আছে যেখানে নারীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তারা যাতে ঘরের মধ্যে লুকিয়ে থাকে। আয়াতদ্বয়ের একটি হলো – “এবং তোমরা স্বগৃহে অবস্থান করবে; প্রাচীন জাহিলী যুগের মতো নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়াবে না। তোমরা নামায কায়েম করবে ও যাকাত প্রদান করবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রসুল (সঃ) - এর  প্রতি অনুগত থাকবে; হে নবীর পরিবার। আল্লাহতো চান তোমাদের হতে শুধু অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে।”  (৩৩/৩৩)  আর একটি আয়াত আছে যাতে নারীদের পরপুরুষের সাথে কার্যতঃ কথা বলতে বারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ পুরুষদের নিকট থেকে নারীকে পৃথক রাখা বা লুকিয়ে রাখার জন্যেই এই নির্দেশ। সেই আয়াতটি হলো - “হে নবী পত্নীরা! তোমরা অন্য নারীদের মত নও; যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো তবে পর পুরুষের সঙ্গে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না  যাতে অন্তরে যার ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়, এবং তোমরা ন্যায়সঙ্গতভাবে কথা বলবে।” (৩৩/৩২)  অজুহাত অন্বেষণকারীরা বলতেই পারেন যে, এ আয়াতটি তো নবী পত্নীদের উদ্দেশ্যে এসেছে। তাদের জবাব দিয়েছেন স্বয়ং মুহাম্মদ আয়াতটির উদ্দেশ্য বাখ্যা করার সময়। সেটা এ রকমঃ “আল্লাহ তা’আলা স্বীয় প্রিয় নবী (সঃ) – এর সহধর্মিণীদেরকে আদব-কায়দা ও ভদ্রতা শিক্ষা দিচ্ছেন। সমস্ত স্ত্রীলোক তাদের অধীনস্থ। সুতরাং এই নির্দেশাবলী  সমস্ত মুসলিম নারীর জন্যেই প্রযোজ্য।”  (দ্রঃ- ইবনে কাথিরের তফসির, পঞ্চদশ খণ্ড, পৃ – ৮৭৩ সূত্রঃ http://.IslamiBoi.wordpress.com)   ইসলামি পণ্ডিত প্রখ্যাত তফসিরকার ইবনে কাথিরের এই  বিবরণ  থেকে এটা স্পষ্ট যে হিযাবের বিধান সমস্ত মুসলিম নারীদের জন্যেই। হিযাবের উদ্দেশ্য কী তা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। সেই উদ্দেশ্য পূরণের জন্যেই এ আয়াত দু’টিতে নারীকে একেবারে গৃহবন্দি করে পুরুষ সমাজ থেকে পৃথক করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি ঘরের ভিতরেও নারীকে তার স্বাভাবিক, স্বাধীন ও স্বচ্ছন্দ জীবন-যাপনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।  স্বগৃহেও (অবশ্য নারীর নিজের সত্যিকারের গৃহ বলতে কিছু নেই) নারীকে কাপড়ে অবগুণ্ঠিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নারীকে অবগুণ্ঠিত হওয়া থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছে কেবল পিতা, পুত্র, ভাইপো, ভাগ্নে, এবং নারীদের সামনে। বাকি সকলের সামনে নারীকে পর্দায় অবগুণ্ঠিত থাকতে হবে । কোরান এ প্রসঙ্গে বলছে – “নবী-পত্নিগণের জন্য তাদের পিতৃগণ, পুত্রগণ, ভ্রাতৃগণ, ভ্রাতুষ্পুত্রগণ, ভগ্নিপুত্রগণ, সেবিকাগণ এবং তাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীগণের ব্যাপারে পর্দা পালন না করা অপরাধ নয়।” (৩৩/৩৫)  যা নবীপত্নীদের জন্যে আদেশ তা যে সকল মুসলিম নারীর জন্যেই প্রযোয্য, এ কথা যে  মুহাম্মদ বলেছেন তা আগেই উল্লেখ করেছি। মুসলিম নারীকে  অবগুণ্ঠনের মধ্যে থাকতে হবে ঘরের বাইরে এবং ঘরের মধ্যেও – এই হলো হিযাবের মূল নির্দেশ। পুরুষের কারণে যাতে নারীর হিযাববন্দি জীবনের শৃঙ্খলায় (শিকলে) কোনো ব্যত্যয় না ঘটে তার জন্যে পুরুষের উপরেও হিযাবের একটি ধারা আরোপ করা হয়েছে। মুসলমান পুরুষদের বলা হয়েছে পরের ঘরে ঢুকে পরনারীদের কাছে কিছু না চাইতে। অবশ্য এক্ষেত্রেও নবীপত্নীদের দোহাই দেওয়া হয়েছে। আল্লাহকে দিয়ে মুহাম্মদ তাঁর শিষ্যদের উদ্দেশ্যে বলিয়েছেন, “হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের অনুমতি দেওয়া না হলে তোমরা আহার্য প্রস্তুতির জন্য অপেক্ষা না করে ভোজনের জন্য নবী-গৃহে প্রবেশ করো না। তবে তোমাদের ডাকলে – তোমরা প্রবেশ করো, এবং আহার শেষ হলে চলে যেয়ো। তোমরা কথা-বার্তায় মশগুল হয়ে পড়ো না, কারণ এ নবীর জন্য কষ্ঠদায়ক; সে তোমাকে উঠে যাবার জন্য বলতে সংকোচ বোধ করে। কিন্তু আল্লাহ সত্য বলতে সংকোচ করে না। তোমরা তার পত্নীদের নিকট হতে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল হতে চাইবে, এ বিধান তোমাদের ও তাদের হৃদয়ের জন্য অধিকতর পবিত্র। তোমাদের কারও পক্ষে রসুলকে কষ্ট দেওয়া অথবা তার মৃত্যুর পর তার পত্নীদের বিবাহ করা কখনও সঙ্গত নয়।”  (৩৩/৫৩)  নিজের পত্নীদের  মানুষের বৃহত্তর সমাজ থেকে  বিচ্ছিন্ন করে গৃহবন্দি ও কাপড়বন্দি করে সম্পূর্ণ তালুবন্দি করতে মুহাম্মদ তাঁর শিষ্যদের তাঁর গৃহে প্রবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে দ্বিধা করেন নি। যা যা তাঁর পত্নীদের উপর আরোপ করেছেন সেগুলি পরে সমস্ত মুসলিম নারীদের উপরেও আরোপ করেছেন। এভাবে হিযাবের নামে নারীকে ঘরে বাইরে সর্বত্রই সম্পূর্ণ বন্দি, অবরুদ্ধ, সম্পূর্ণ পরাধীন ও শৃঙ্খলিত করা হয়েছে। আর এসবই করা হয়েছে আল্লাহর ওহির দোহাই দিয়ে। প্রত্যেকটি ওহি বা আয়াতের উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট (তফসির বা শানে নুযুল) রয়েছে যা পাওয়া যায় হাদিসে ও কোরানের তফসিরে। অবশ্য হাদিস ও তফসির নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতও রয়েছে। হিযাবের প্রেক্ষাপট  নিয়েও  মতভেদ  রয়েছে।
হিযাবের প্রেক্ষাপট নিয়ে যে কথাগুলি শোনা যায় তার মধ্যে একটি এ রকমঃ - দ্বিতীয় খলিফা ওমর ফারুক যিনি ছিলেম মুহাম্মদের অতি ঘনিষ্ঠ সাহাবী এবং একজন শ্বশুরও, একদিন মুহাম্মদকে বলেন তাঁর (মুহাম্মদের) ঘরে যে সব মুসলমানরা ঢোকেন তাদের মধ্যে মন্দ চরিত্রের লোকও থাকতে পারে, তাদের হাত থেকে নবী-পত্নীদের মান-মর্যাদা রক্ষা করার স্বার্থে তিনি কেনো তাঁদের (নবী-পত্নীদের) আড়ালে থাকার নির্দেশ প্রদান করছেন না। তারপরই ২৪/৩১ নং আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অন্য একটি মত হলো – ওমর ফারুকের একদিন মুহাম্মদের কনিষ্ঠতম ও প্রিয়তম পত্নী আয়েশার সঙ্গে আকষ্মিকভাবে দৈহিক সংস্পর্শ ঘটে এবং তারজন্যে তিনি ভীষণ লজ্জিত ও বিব্রত বোধ করেন। তারপরেই তিনি মুহাম্মদকে বলেন কেনো তিনি তাঁর পত্নীদের আড়ালে থাকার নির্দেশ প্রদান করছেন না। এর প্রেক্ষাপটেই হিযাব সংক্রান্ত ওহিগুলো অবতীর্ণ হয়।
হিযাবের আদেশ (তথাকথিত ওহি বা প্রত্যাদেশ) মুসলিম নারীদের উপর চাপানো হয় চতুর্থ হিজরীতে (৬২৫ খৃস্টাব্দে) অর্থাৎ মুহাম্মদের মদিনায় হিযরত করার চতুর্থ বছরে। মুহাম্মদ ৬১০ খ্রিস্টাব্দে দাবি করেন যে তিনি নবুয়ত প্রাপ্ত হয়েছেন অর্থাৎ আল্লাহ তাঁকে নবী করে পাঠিয়েছেন। স্বভাবতঃই এ প্রশ্নটি ওঠে যে, মন্দ চরিত্রের লোকদের হাত থেকে নবী-পত্নীদের শ্লীলতা, সতীত্ব ও মর্যাদার হেফাজত (রক্ষা) করার জন্যে হিযাবের ওহিগুলি পাঠাতে আল্লাহ এতো বিলম্ব করেছিলো কেনো? তাঁর প্রথম পত্নী খাদিজার জীবদ্দশায় হিযাবের আদেশ আল্লাহ পাক কেন পাঠায় নি? সে কি এজন্যে যে খাদিজা ছিলেন একজন মক্কার সবচেয়ে ধনী বণিক, প্রবল প্রভাবশালী ও  প্রতাপশালী এবং প্রখর ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন  মহিলা? ইসলামি পণ্ডিত কিংবা মুসলিম ঐতিহাসিকদের নিকট থেকে এ প্রশ্নের সদুত্তর পাওয়া যায় না। সুতরাং এটা প্রতীয়মান হয় যে মুসলিম নারীদের উপর হিযাব আরোপ করার অন্য কোনো প্রেক্ষাপট আছে।
ইতিহাস বলে যে মুহাম্মদই প্রথম আল্লাহর কাছ থেকে প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত হয়ে নারীদের উপর হিযাব চাপিয়েছেন তা নয়। ইসলামের আবির্ভাবের বহু কাল আগে থেকেই পার্সিয়ানদের সমাজে হিযাবের প্রচলন ছিলো। হিযাবের বিধানটি মুহাম্মদ পার্সীদের কাছ থেকেই নিয়েছিলেন। আবার নারীদের ঘরের অভ্যন্তরে আবদ্ধ থাকার কুপ্রথাটিও বাইজান্টাইন সমাজে বিদ্যমান ছিলো প্রাক ইসলাম যুগে। বাইজান্টাইনের মানুষ সেটা গ্রহণ করেছিলো গ্রীকদের কাছ থেকে। মদিনায় হিযরত করার পর কয়েক বছরের মধ্যে মুহাম্মদের আরবের বাইরের জগতের সংস্পর্শে আসার ব্যাপক সুযোগ ঘটে। তার আগেও অবশ্য বাণিজ্য করার সুবাদে মুহাম্মদকে বেশ কয়েকবার আরবের বাইরে যেতে হয়েছিলো। এর ফলে আরবের বাইরের বিভিন্ন দেশের মানুষদের সামাজিক ও ধর্মীয় রীতি-নীতি, আচার-ব্যবহার ও সংস্কৃতির সংস্পর্শে তিনি আসেন এবং বহু ক্ষেত্রেই সেগুলির দ্বারা প্রভাবিত হন। যে গুলির দ্বারা তিনি প্রভাবিত হন সেগুলির তিনি ইসলামিকরণ করেন আল্লাহর দোহাই দিয়ে। হিযাবের সংস্কৃতিও তিনি পার্সী ও বাইজান্টাইনের থেকে নেন এবং তার  ইসলামিকরণ করে মুসলিম সমাজে প্রবর্তন করেন।  হিযাব বাদে আর যে সব পশ্চাদপদ  প্রথা ও  নিয়ম-কানুন  অন্যদের কাছ থেকে নিয়ে আল্লাহর ওহির নামে মুসলমানদের উপর চাপিয়ে ছিলেন তার মধ্যে নামাজ, রোজা, হজ, যাকাতও আছে। এগুলির কোনোটাই ইসলামের তথা মুহাম্মদের আবিষ্কার নয়। খাতনাও (মুসলমানী)  সে রকম একটি ভয়ংকর কুপ্রথা যা মুহাম্মদ গ্রহণ করেন ইহুদিদের নিকট থেকে। খাতনা সম্পর্কে কয়েকটি কথা বলে এ নিবন্ধটি শেষ করবো। মুসলমানরা মনে করে ছেলেদের খাতনা করার আদেশ মুহাম্মদ আল্লাহর কাছ থেকে পেয়েছিলেন। তাই তা নিয়ে তাদের গর্বের অন্ত নেই। খাতনা বা ৪/৫ বছরের পুং শিশুদের লিঙ্গের ত্বকের অগ্রভাগ কেটে ফেলাকে শিশুকে কষ্ট দেওয়া তারা বিজ্ঞানসম্মত বলে বিশ্বাস করে। এর পরিপ্রেক্ষতে তারা বলে আল্লাহ যে একজন মহাবিজ্ঞানী তার একটা বড়ো প্রমাণ নিহিত আছে এই খাতনার মধ্যে। খাতনা প্রথাটা মুসলমানদের কাছে একটা গর্ব ও অহঙ্কারের বিষয়ও বটে। খাতনা উপলক্ষে তারা জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান করে যার মধ্যে বিশাল ভোজের আয়োজনও থাকে। মুসলমানরা দাবি করে যে কোরান শুধু একটি ধর্মগ্রন্থই নয়, এটা একটি মহাবিজ্ঞান গ্রন্থও। আর কোরান যে  একটি মহাবিজ্ঞান গ্রন্থ তার প্রমাণ হিসেবে মুসলিমরা এই খাতনার দৃষ্টন্তটির উল্লেখ করে থাকেন।  কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হলো খাতনা একটি অবৈজ্ঞানিক ও বর্বর প্রথা যাতে সর্বদায় বিপদের ঝুঁকি থাকে। খাতনার পর কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিশুদের বিপদে পড়তে হয়েছে এমন দৃষ্টান্তও আছে। খাতনা নিয়ে গর্ব ও অহঙ্কার করার মত হিযাব নিয়েও গোঁড়া মুসলমানরা গর্ব করে। হায় রে! তারা যদি জানতো যে, হিযাবের পশ্চাদপদ ও  কুৎসিত বিধানগুলি আসমান থেকে আসা কোনো প্রত্যাদেশ নয়, মুহাম্মদ এই বিধানগুলি নিয়েছিলেন পারস্য ও বাইজান্টাইন থেকে !   

Saturday, October 3, 2015

বেড়া উৎসব



(১)
বেড়া উৎসব আলোর উৎসব 
‘বেড়া ভাসান উৎসব’ যেটা সেটাই সংক্ষেপে ‘বেড়া উৎসব’ নামে পরিচিত । মুর্শিদাবাদ জেলার হাজার দুয়ারীর নিকট  ভাগিরথী নদীতে এই উৎসব ধূমধাম সহকারে অনুষ্ঠিত হয় প্রতি বছর বাংলা ক্যালেণ্ডারের ভাদ্র মাসের শেষ বৃহষ্পতিবার । ‘বেড়া’ মানে আমরা  সাধারণতঃ যা বুঝি (বাঁশের বেড়া বা কাঠের বেড়া ইংরেজী প্রতিশব্দে fence)  এ বেড়া সে বেড়া নয়, এ ‘বেড়া’  হলো আসলে  কলার ভেলা যে ভেলা চেপে পৌরাণিক গল্পের রূপকথার নায়িকা বেহুলা সমুদ্র পাড়ি দিয়েছিলো মৃত লখিন্দরকে  নিয়ে । ‘ভেলা’কে আবার  মুর্শিদাবাদের বাঘড়ি  অঞ্চলে  ‘ভুঁড়’ও বলে ।  আট/দশটি কলার গাছ  জোড়া লাগিয়ে  এটা তৈরী করা হয় । বন্যা প্লাবিত অঞ্চলে  যেখানে নৌকা পাওয়া যায় না সেখানে এই ভেলা বা ভুঁড়ে চেপেই  মানুষ যাতায়াত করে  । বেড়া উৎসবে যে  ভেলাটি ভাসানো হয়  সে ভেলাটি বিশাল  আয়তনের ।  আনুমানিক  শতাধিক কলাগাছ দিয়ে তৈরী  এই ভেলাটি  ।  বিশাল আয়তনের  এই ভেলায়  থাকে বাঁশের তৈরী চারখানা নৌকা এবং অসংখ্য প্রদীপ (প্রদীপের সংখ্যা আনুমানিক ৪০০/৫০০) । বাশের বাতা বা বাত্তি  দিয়ে  তৈরি করা হয় নৌকাগুলির কাঠমো  । তারপর কাগজ দিয়ে মুড়ে  কালো রঙ লাগিয়ে এমনভাবে তৈরী করা হয় যা দেখে  কাঠের তৈরী আসল নৌকা বলে ভ্রম হবে ।   নৌকাগুলি বিশেষ বৈশিষ্ট সম্পন্ন  যা সকলেরই নজর কাড়তে সক্ষম ।  তাহলো, নৌকার এক প্রান্তটা দেখতে  হাতির মুখের মতো এবং   অপর প্রান্তটি   কুমিরের  মুখের মতো ।  প্রদীপগুলি   মাটির পাত্রে  বসানো থাকে সারিবদ্ধভাবে । প্রদীপগুলি  যাতে বাতাসে নিভে না যায় তারজন্যে সাদা পলিথিনের ঘেরাটোপে  রাখা হয় । ভেলার চারদিকে চারটি খুঁটি বসিয় সেই খুঁটিগুলির সঙ্গে চারদিকে উপর-নীচে ৪/৫ সারি বাঁশ  বা কাঠের তৈরি বাতা  সেট করা থাকে  ।  বাতাগুলির সঙ্গে সুতো বেঁধে  প্রদীপগুলি  ঝোলানো  থাকে । এ ছাড়া চারটা বড়ো আকৃতির গম্বুজের খাঁচা থাকে ভেলার চারকোনায় প্রদীপ রাখার জন্যে ।  দুটি বিশেষ প্রদীপ থাকে যার একটি সোনার এবং অপরটি চাঁদির । প্রদীপ  ছাড়াও  ভেলার উপরে থাকে অনেক  আতসবাজি  ।  আতশবাজিগুলি সেট করা থাকে চারটি খাঁচায় যেগুলি দেখতে অনেকটা কলাগাছের মতো ।  রাত্রি  এগারোটা নাগাদ  বেড়া ভাসান শুরু হয় । তার আগে সমস্ত প্রদীপগুলি জ্বালিয়ে দেয়া হয় । বেড়া ভাসানো শুরু হলে অবশ্য সোনা ও চাঁদির প্রদীপ দুটি তুলে নেয়া হয় ভেলা থেকে । ভেলার সঙ্গে ৪/৫ খানা নৌকা থাকে যেগুলির একটিতে থাকে প্রচুর বাজি-পটকা ও আতশবাজি । বেড়া ভাসানোর অনেক আগে থেকেই ভাগীরথীর পশ্চিম পাড়ে একটি সুসজ্জিত ক্যাম্প থেকে বাজি-পটকা ও আতস-বাজি ফাটানো শরু হয়ে যায় । বেড়া ভাসানো শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ার সহযাত্রী একটি নৌকা থেকে শুরু হয় বাজি-পটকা ফাটানো । স্রোতের ভেসে যেতে থাকে আপন মনে । বেড়াটি তখন আর শুধু কলা গাছের তৈরী একটা সাধারণ আটপৌরে ভেলা থাকে না ।   কয়েকশ’  প্রদীপের আলোক-সজ্জায়  আর  আকাশের বুকে অসংখ্য আতসবাজির রং-বেরঙের সুদৃশ্য আলোর হরেক রকমের ফুল-মালায়  ভেলাটি হয়ে উঠে যেনো আলোর একটি সুরম্য অট্টালিকা । নদীর পার থেকে মনে হয়  যেন একটি আলোর তৈরী রাজপ্রাসাদ  ভাগিরথীর বুক চিরে ভেসে যাচ্ছে  আপন আনন্দে   ।  স্বর্গে বিশ্বাস করলে বলতাম,  সে এক নয়ন জুড়ানো মন  মাতানো, ভুবন ভোলানো স্বর্গীয়  দৃশ্য যা বর্ণনা করা  মানুষের সাধ্যের অতীত । আলোর এই  রঙমহলটির যাত্রা পথ হলো হাজার দুয়ারী সংলগ্ন ইমামবারা ঘাট থেকে লালবাগ কোর্ট  ঘাট পর্যন্ত ।   এবারে [২০১৫] ইমামবারা ঘাটে বিখ্যাত সেই ভেলার নোঙর খুলে দেয়া হয়েছিলো রাত পৌনে এগারোটায়, ভেলাটি লালবাগ কোর্ট ঘাটের সামনে যখন পৌঁছালো  তখন রাত সোওয়া এগারোটা । আমরা ভেলার সহযাত্রী একটা নৌকায় ছিলাম, আমাদের নৌকাটি  লালবাগ কোর্ট ঘাটের সামনে থেকে  তাকে বিদায় জানালো  ।  আমরা নৌকার মটর এবার চালিত ইঞ্জিন সক্রিয় হলো, আমরা ফিরিতে শুরু করলাম যেখান থেকে ভাসান শুরু হয়েছিলো সেখানে । আমরা পিছন ফিরে দাঁড়ালাম এবার আলোর সেই নয়নাভিরাম আলোর তাজমহলটি পুনরায় অবলোকন করার জন্যে । ধীরে ধীরে দূর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, কিন্তু চোখ তবু আমরা সরাতে পারছিনা ।  বেড়া উৎসব দেখে যা মনে হলো, এটা আসলে আলোর উৎসব । সে উৎসব এক সার্বজনীন উৎসব । ইমামবারা ঘাট থেকে  থেকে লালবাগ কোর্ট ঘাট (দেড় থেকে দু’ কিলো মিটার) ব্যাপী ভাগিরথীর দুই তীরে লোকে লোকারণ্য, শুধু লোক আর লোক । সবাই মেতে উঠেছে আলোর উৎসবে ।  
(২)
পটভূমিঃ ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার
বাড়ি থেকে মাত্র চল্লিশ কি.মি. দূরের আলোর এই সার্বজনীন বেড়া উৎসবটি এর আগে দেখা হয়ে ওঠে নি । এবার যখন যাবো ঠিক করলাম তখন যতোটা না দেখার আগ্রহ ছিলো তার চেয়ে বেশী কৌতূহল ছিলো জানার এর ইতিহাস ।  তাই যাওয়ার আগে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম সে ইতিহাস । খোঁজ নিতে গিয়ে জানা গেলো,  বেড়া উৎসব নিয়ে প্রামাণ্য ইতিহাস বলতে যা বোঝায় তা  পাওয়া  দুষ্কর, তবে এর উপর অনেক লোককথা  প্রচলিত আছে  ।  সে রকম দু’টো লোককথা শোনালো আমার হাই স্কুলের একজন সহপাঠী যে সরকারি নবাব বাহাদুর হাই স্কুলে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছিলো  ।  প্রসঙ্গতঃ উল্লেখযোগ্য যে এই স্কুলটি হাজার দুয়ারী ও ইমামবারার গায়েই অবস্থিত ।  প্রথম লোককথাটি এ রকমঃ কোনো এক নবাব কোনো এক সময় গুরুতর পীড়ায় আক্রান্ত হয়ে  মরতে বসেছিলেন । তাঁর স্ত্রী বেগম সাহেবা তখন আল্লাহর দরবারে দোয়া করে তাঁর স্বামীর আরোগ্য কামনা করেছিলেন । সে সময় আল্লাহর কাছে একটি মানতও করেছিলেন । বলেছিলেন যে তার স্বামীর রোগমুক্তি ঘটলে আল্লাহর ওয়াস্তে হাজার প্রদীপের ভেলা ভাগিরথী নদীতে ভাসাবেন । কিছুদিনের মধ্যেই নবাব সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং তাঁর স্ত্রী তখন তাঁকে সেই মানতের বিষয়ে অবগত করান । নবাব ও বেগম উভয়েই বিশ্বাস করেন যে আল্লাহই তার অশেষ রহমতে (দয়ায়) নবাবকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে বেগমের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে ।  নবাব বাহাদুর তাই সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার পর আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে হাজার প্রদীপের একটি ভেলা অত্যন্ত জাঁকজমক সহকারে ভাগিরথী নদীর বুকে ভাসিয়ে দেন  ।  সেটা ছিলো ভাদ্র মাসের শেষ বৃহষ্পতিবার । তারপর থেকেই প্রতি বছর  এই দিনে একই ভাবে ভেলা ভাসানো হয় । দ্বিতীয় লোককথাটি এরূপঃ  নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ এই উৎসবটির প্রচলন করেছিলেন । তিনি এটা প্রবর্তন করেছিলেন হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সম্প্রীতি রক্ষা করার জন্যে। তাই অনেকে বিশ্বাস করে যে বেড়া উৎসব হলো সম্প্রীতির উৎসব । দ্বিতীয় লোককথাটি খুব কম লোকই বিশ্বাস করে । কারণ, মুর্শিদকুলি খাঁ  ছিলেন ধর্মান্তরিত মুসলমান এবং তীব্র হিন্দু-বিদ্বেষী। তিনি জন্ম সূত্রে ছিলেন একজন উচ্চবর্ণের হিন্দু  । ইতিহাস বলে যে ক্ষমতার লোভে স্বধর্ম ত্যাগ করে মুসলমান হওয়ার পর মুর্শিদকুলি খাঁ অসংখ্য হিন্দু মন্দির ধ্বংস করেছিলেন । 
হাজার দুয়ারী তথা লালবাগ গিয়ে এবার ঘটনা চক্রে যোগাযোগ হয় মীরজাফরের আলির এক বংশধর মীর্জা আব্বাস আলির সঙ্গে  যাঁকে ছোটে নবাব বলে সবাই জানে ও চেনে । প্রসঙ্গতঃ উল্লেখযোগ্য যে লালবাগে এখন যাঁরা নবাবের বংশধর আছেন তাঁরা সবাই মিরজাফর আলির বংশধর, নবাব সিরাজের বংশধর কেউ নেই এখানে এবং নবাবের এই বংশধরগণ  শিয়া সম্প্রদায় ভুক্ত ।  নবাব বংশের আর এক প্রতিনধির সঙ্গে যোগাযোগ ও আলাপ হয় যিনি মুর্শিদাবাদ পৌরসভার একজন নির্বাচিত কাউন্সিলারও বটেন । তাঁদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ আলাপচারিতা হয় এবং তাঁদের কাছ থেকে আমরা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি বেড়া ভাসান উৎসবের ইতিহাস । তাঁদের সৌজন্যে  আলাপ হয় ইমামবারার জন্যে সরকারিভাবে নিযুক্ত ইমামের সঙ্গে যাঁর কাছ থেকেও ইতিহাসের পরম্পরার কিছু কথা বা ঘটনা জানতে পারি । আমরা গিয়েছিলেম মীরজাফরের সমাধিস্থলে । সেই সমাধিস্থলে এগারো শো সমাধি আছে । সেখানে যিনি রক্ষণাবেক্ষণের মূল দায়িত্বে আছেন তিনি বেড়া উৎসবের ইতিহাস ও প্রাসঙ্গিক অন্য কিছু বিষয়েও আলোকপাত করেন । তাঁদের মুখ থেকে যা শুনেছি  তা সম্পূর্ণ অন্য কথা যার সঙ্গে পূর্ব কথিত লোককথার কোনো মিল নেই । ছোটে নবাব আমাদের জানালেন যে বেড়া উৎসব প্রবর্তনের পশ্চাতে দু’টি প্রধান কারণ ছিলো ।  সেই কারণ দু’টি বর্ণনা করার প্রাক্কালে দু’টি ঐতিহাসিক তথ্য নিবেদন করি যেটা শুনিয়েছেন ছোটে নবাব এবং আরো অনেকেই ।  ঐতিহাসিক তথ্য দু’টি হলো -  এক). বেড়া উৎসবের সূচনা করেছিলেন মুর্শিদকুলিখাঁ ।  দুই). এ উৎসব প্রথমে শুরু হয়েছিলো ঢাকায় ১৬৯০ খৃস্টাব্দে, তার সতেরো বছর পর ১৭০৭ খৃস্টাব্দে এ উৎসব স্থানান্তরিত হয় মুর্শিদাবাদের রাজধানী শহর লালবাগে হাজার দুয়ারীর ঘাটে।  বেড়া ভাসানের পটভূমি সম্পর্কে যা যা জানা গেলো তাঁদের জবানিতে তার কতোটা ঐতিহাসিক মূল্য আছে তা গবেষকরা বলতে পারবেন, তবে তা আমার  বিচার-বুদ্ধি মতে বিশ্বাসযোগ্য বলেই মনে হয় । কারণ, বেড়া ভাসান শুরু হয়েছিলো দু’টি ভয়ঙ্কর বিপদের হাত থেকে রক্ষা পেতে অলৌকিক বা দৈব শক্তির উপর বিশ্বাস ও ভরসা রেখে ।  এ যুগেও তো  আমরা লক্ষ্য করছি রাজনৈতিক নেতাদের  মাচান বাবার পদতলে মাঠা ঠেকিয়ে আশীর্বাদ নিতে, কালীঘাটে-তারাপীঠে-তিরুপতি মন্দিরে পূজো দিতে কিংবা খাজা মঈনুদ্দিন চিস্তির দরগায় চাদর চড়াতে তাদের মনের অভিলাষ পূরণ করার জন্যে । সুতরাং আজ থেকে তিন শ’ বছরে আগে কোনো একজন নবাব  দৈব শক্তির উপর ভরসা রেখে এবং তাদের উদ্দেশ্যে  নতজানু হয়ে  তাদের কৃপা ভিক্ষা করার জন্যে কোনো অনুষ্ঠান বা উৎসব প্রবর্তন করেছেন বলে যদি শোনা যায় তা অবিশ্বাস করবো কেমন করে ?  এ সব কথা ছেড়ে এবার বলি কোন দু’টি বিশ্বাসের উপর ভর করে মুর্শিদকুলি খাঁ বেড়া ভাসানের প্রবর্তন করেছিলেন ।  ছোটে নবাব আমাদের যা জানালেন তা সংক্ষেপে এ রকমঃ  সে সময় নদীপথে নৌকাযোগে রাজস্ব পাঠানো হতো দিল্লির দরবারে । কিন্তু মাঝে মধ্যে সে নৌকা জলদস্যুদের কাছে লুন্ঠিত হয়ে যেতো । নবাবকে   আরো দু’টি বিপদ  ভয়ানক দুশ্চিন্তায় ফেলেছিলো, তাহলো নদীর ভাঙন ও বন্যা ।  এই বিপদগুলির হাত থেকে কীভাবে রক্ষা পাওয়া যায় সেটাই ছিলো নবাবদের কাছে সব চেয়ে বড়ো প্রশ্ন । নবাব এবং তাঁর পারিষদবর্গের মনের মধ্যে  এ বিশ্বাস  প্রতীত  হয় যে জলের দেবতা খোয়াজ খিজির , যে কোনো কারণেই হোক না কেনো,  নবাবের প্রতি  অসন্তুষ্ট হওয়ার কারণেই তাঁর উপর  এ সব বড়ো বড়ো বিপর্যয় নেমে আসছে । কে এই জলের দেবতা খোয়াজ  খিজির ?  এ নিয়ে দু’টো মত শোনা গেলো । ছোটে নবাব বললেন যে  ইনি হলেন পৃথিবীতে  আল্লাহর  প্রেরিত  এক লাখ চব্বিশ হাজার পয়গম্বরের একজন ।  মীরজাফরের সমাধিস্থলের কেয়ারটেকার বললেন যে ইনি হলেন আল্লাহর একজন ফেরেস্তা (স্বর্গীয় দূত যে আলো বা আগুন  দিয়ে তৈরী) ।  খোয়াজ খিজিরকে আবার খাজা খিজির নামেও ডাকা হয় । খোয়াজ   খিজিরের উপর ন্যস্ত দায়িত্ব সম্পর্কে অবশ্য দু’জনেই একমত পোষণ করেন । তাঁদের বিশ্বাস মতে, জলের মধ্যে বা জলের কারণে সৃষ্ট যে কোনো বিপদ থেকে মানুষকে রক্ষা করা তার দায়িত্ব ও কাজ ।  নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ  সেই বিশ্বাসে ভর করেই খোয়াজ   খিজিরকে তুষ্ট করার জন্যে বেড়া ভাসান উৎসবের সূচনা করেছিলেন ঢাকায় ।  বেড়া ভাসানোর আগে দেবতাদের পূজা করার ঢঙে কিছু অনুষ্ঠান পালন করা হতো । সেগুলি আজোও পালন করা হয় । ইসলামে মূর্তিপূজা নিষিদ্ধ । তাই ছোটে নবাব আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দিতে ভোলেন নি যে, অনুষ্ঠানগুলো মোটেই পূজা করা নয়, সমগ্র অনুষ্ঠানটাকে বলা হয় ‘নওয়াজ’ ।  অনুষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নৌকায় সেহারা পরানো (ফুলের মালা পরানো), হালুয়া-পায়েস রান্না করে এবং পান-খিলি বানিয়ে খোয়াজ  খিজিরের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা । নবাব প্যালেস থেকে ঢাক-ঢোল ও ব্যাণ্ড বাজিয়ে বিরাট আড়ম্বরের সঙ্গে  শোভাযাত্রা  বের করা হতো । শোভাযাত্রা শেষ হতো যেখানে ভেলাটি নোঙর করা থাকতো  । শোভাযাত্রায় সবার আগে হাতির পিঠে থাকতেন নবাব, তাঁর পেছনে চারজন কর্মচারী চারটি প্রতিকী নৌকা মাথায় নিয়ে হাঁটতো, তাদের পেছনে ব্যাণ্ড পার্টি, ব্যাণ্ড পার্টির পরে থাকতো শ’য়ে শ’য়ে প্রজা সাধারণ । এখনও বেড়া ভাসানের আগে  শোভাযাত্রা  বের হয়, চারজন মানুষ চারটি নৌকা মাথায় নিয়ে  শোভাযাত্রার আগে আগে  ধীর পায়ে হাঁটে, তাদের অনুসরণ করে ব্যাণ্ডের দল, তাদের পেছনে থাকে মানুষের ঢল ।  এখনও হালুয়া-পায়েস রান্না করা হয় এবং পানের খিলি বানানো হয়, সেগুলো নবাবের বংশধর যারা আছেন তাদের মধ্যে বন্টন করা হয়, তারপর শেহারা পরানো শুরু হয় নিউ প্যালেসে যেখান থেকে শোভাযাত্রা বের করা হয় । এখন বেড়া উৎসব হয় রাজ্য রাজ্য সরকারের  পরিচালনায়, তবুও নবাবি আমলের ঐতিহ্য মেনে আনুষ্ঠানিক ‘নওয়াজ’-এর সূচনা করা হয় নবাবের বংশধরদের হাত দিয়েই । এখন সেহারা পরানোর সূচনা করেন ছোটে নবাব মির্জা আব্বাস আলি । এবারও তিনিই সুচনা করলেন । তারপর  শেহারা পরালেন আরো তিন নবাব ।   তারপর নবাবের অন্যান্য বংশধর ও অতিথিবর্গ  । ‘নওয়াজ’ অনুষ্ঠানের শুরুতে অতিথি বরণ পর্বেও  ছোটে নবাবকেই  সবার আগে বরণ করা হয় এখন, এবারেও তাই হলো । সেহেরা পরানো শেষ অতিথিদের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখার পর শুরু হয় শোভাযাত্রা । শোভাযাত্রাটি শেষ হয় ইমামবারা ঘাটে  যেখানে বেড়া ভাসান উৎসবের মূল আকর্ষণ  বিশাল আয়তনের ভেলাটি নোঙর করে অপেক্ষমাণ থাকে । বেড়া ভাসান শুরু হওয়ার পূর্বে ইমামবারা ঘাটে একটি সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠান  অনুষ্ঠিত  হয় । সেই অনুষ্ঠানেও  অতিথিদের মধ্যে ছোটে নবাবই থাকেন মধ্যমণি ।  প্রতিকী নৌকা চারটি ভেলায় তুলে দেওয়ার পর সেই অনুষ্ঠানটি শুরু করা হয় । অনুষ্ঠান শেষে ভেলাটি ভাসানোর তৎপরতা শুরু হয় এবং  সব কটা প্রদীপ জ্বালানো সম্পন্ন হলে নোঙর খুলে দিয়ে ভেলাটি ভাসিয়ে দেওয়া হয় স্রোতের অনুকূলে,  সঙ্গে সঙ্গে বাজি-পটকা ফাটতে থাকে আর আকাশে শুরু হয়ে যায় আতসবাজির আলোর উৎসব । নদীর তীর ছাড়িয়ে যখন কলা গাছের তৈরী ভেলাটি ধীরে ধীরে একটু একটু করে দূরে  সরে  যায় তখন শুরু হয় আলোর মায়াবি খেলা । তখন মানুষের চোখে ও মনে আর ভেলাটির অস্তিত্ব থাকে না, সেটি রূপান্তরিত হয়ে যায়  একটি  আলোর রাজপ্রাসাদে, রঙমহলে, স্বপ্নপুরীতে বা স্বর্গপুরীতে । আলোর স্বপ্নপুরীর সেই  অসাধারণ রূপ হাজার হাজার মানুষ নদীর দুই তীরে মন্ত্রমুগ্ধ দাঁড়িয়ে  অবলোকন করতে থাকে আর স্বপ্নপুরীটি ও তার মাথায় যে আতসবাজীর আলোর রঙ-বেরঙের খেলা চলে তা অপার বিষ্ময়ে উপভোগ করে ।
(৩)
 খোয়াজ  খিজিরের গল্প
ছোটে নবাব গর্বিত কণ্ঠে আমাদের জানালেন যে, জলের পয়গম্বর খোয়াজ খিজির  নবাব মুর্শিদকুলি খাঁকে হতাশ করে নি । তাঁর ঐকান্তিক আবেদন, নিবেদনে ও প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে খোয়াজ ফিজির নবাবকে ও তাঁর প্রজাদের জলের বিপদ থেকে রক্ষা করেছিল  এবং আজো রক্ষা করে চলেছে ।  ছোটে নবাব বললেন যে,  যে বছর বেড়া ভাসানো হয়েছিলো তারপর আর নবাবের রাজস্ব বহনকারী নৌকাকে জলদস্যুদের কবলে পড়তে হয় নি, খোয়াজ  খিজির স্বয়ং নবাবের  সেই নৌকাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে গিয়ে গন্তব্যে নিরাপদে পৌঁছে দিয়েছে  । আর সেই থেকে ভাগিরথীর দুই পাড় ভেঙে অসংখ্য জনপদ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেলেও নবাবের রাজধানী শহর লালবাগের দুই পাড় কোনোদিন ভাঙনের কবলে পড়ে নি এবং ভাগিরথীর প্লাবনে শতো শতো গ্রাম ও  লক্ষ লক্ষ একর একর আবাদি জমি প্লাবিত হলেও লালবাগে কখনও প্লাবন হয় নি । খোয়াজ খিজির   ও বেড়া ভাসানের এই মহিমার কথা শুধু ছোটে নবাব ও নবাবের বংশধরেরা বিশ্বাস করে তাই নয়, এ বিশ্বাস বোধ হয় লালবাগ বাসীর মনেও দৃঢ়ভাবে গেথে রয়েছে । এই একই সুর আমরা প্রতিধ্বনিত হতে শুনেছি নবাব মীরজাফরের সমাধির কেয়ারটেকারের কণ্ঠেও । তিনিও দৃঢ়কন্ঠে আমাদের সামনে এই বিশ্বাস ব্যক্ত করেছেন যে, জলের ফেরেস্তা  খোয়াজ খিজিরই তাদের জলের যাবতীয়  বিপদ থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে, আর তাই   লালবাগে কোনোদিন বন্যা হয় না এবং নদীর ভাঙনও হয় না । ফেরেস্তা বা পয়গম্বর যে নামেই হোক, অলৌকিক শক্তির উপর তাঁদের এই অগাধ বিশ্বাস আমাকে বিষ্মিত করেছে । অবাক হয়েছি এ কথা ভেবে যে, বিজ্ঞানের বিস্ময়কর অগ্রগতির যুগেও এই শিক্ষিত মানুষেরা  আজো জানে না কেনো বন্যা হয় ও কেনো নদীর পাড় ভাঙে এবং বন্যা ও ভাঙনরোধ  করা মানুষের সাধ্যের বাইরে নয় ।
খোয়াজ  খিজিরের গল্পটি নেহাতই পৌরাণিক গল্প । কিন্তু আর পাঁচটা রূপকথার গল্পের মতো এটা খুব প্রচলিত বা পরিচিত গল্প নয় । আমি নিজেও  খোয়াজ  খিজিরের গল্প সম্পর্কে আগে পরিচিত ছিলাম না । কোরান-হাদিস ও  ইসলামের ইতিহাস নিয়ে  চর্চা করি যথাসাধ্য, কিন্তু কোথাও  খোয়াজ  খিজিরের কথা পড়েছি বলে মনে পড়ে না । আমার চোখে না পড়লেও নিশ্চয়  মুসলিমদের পৌরাণিক কাহিনীতে   খোয়াজ খিজিরের অস্তিত্ব  আছে ধরে নিয়ে বাড়ি ফিরে তার সম্পর্কে খোঁজ নেয়া শুরু করি । খোয়াজ  খিজিরের সন্ধানও পেয়ে যাই । যাদের কাছ থেকে সন্ধান পায়  তাদের   জিজ্ঞাসা করে জানতে পারি যে, তারা যা শুনেছে তা মুসলিমদের ধর্মীয় জালসায় (সভায়) মাওলানাদের ওয়াজ (বক্তৃতা) থেকে ।   খোয়াজ  খিজির  সম্পর্কে মুসলিম ধর্মগুরুদের মধ্যে দু’টি মত রয়েছে । একটি মত হলো, আল্লাহ  তার বান্দাদের অর্থাৎ মুসলমানদের রক্ষা করার জন্যে খোয়াজ  খিজির নামের একজন ফেরেস্তাকে   জলের মধ্যে (নদী ও সমুদ্রে) সব সময়ের জন্যে মোতায়েন (পাহারায়) রেখেছে । মুসলমানরা জলে কোনো বিপদে পড়লে তাকে বা আল্লাহকে স্মরণ করলে সে এসে তাদের রক্ষা করবে। দ্বিতীয় মতে  খোয়াজ খিজির  একজন অসামান্য পণ্ডিত ব্যক্তি যার জ্ঞান নবীদের (আল্লাহর প্রেরিত দূত) চেয়েও বেশী । একবার মুসা নবীকে (ইহুদি ধর্মের প্রবর্তক কাল্পনিক চরিত্র মোসেজকে  মুহাম্মদ সচেতনভাবে বিকৃত করে মুসা নবী বলে আখ্যায়িত করেন) তার শিষ্যরা জিজ্ঞেস করছিলো যে, পৃথিবীতে সব চেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি কে ? মুসা   তার জ্ঞানের অহঙ্কার করে বলেছিলো,   আমিই সব থেকে জ্ঞানী । আল্লাহ   এ কথা শুনে মুসার উপর রুষ্ট হয়ে বলেছিলো যে, এই মুসা, তুমি সবচেয়ে জ্ঞানী নও । তোমার চেয়েও জ্ঞানী ব্যক্তি আছে, তুমি ওমুক জায়গায় যাও,  তার দেখা পাবে । সেই ব্যক্তিটির নাম  খোয়াজ  খিজির । মুসা নবী তখন তার কাছে গেলো এবং বললো যে, আল্লাহ বলেছে তুমি এ পৃথিবীতে সবচেয়ে জ্ঞানী, আমি তোমার কাছ থেকে জ্ঞান আহরণ করতে এসেছি ।  খোয়াজ খিজির  বলল যে, ঠিক আছে, চলো আমার সাথে, কিন্তু কোনো প্রশ্ন করতে পারবে না । যদি প্রশ্ন করো তবে তোমাকে বিদায় করে দেবো । ওরা দু’জন একটা নতুন নৌকা ভাড়া করে নদীপথে যেতে  শুরু করলো । কিছুদূর গিয়ে খোয়াজ  খিজির  নৌকাটা ফুটো করে নৌকা থেকে নেমে পড়লো । তা দেখে মুসার খুব রাগ হলো, মনে মনে ভাবলো একটা গরীব মানুষের নৌকা এভাবে বিনা কারণে ফুটো করে দিয়ে  খোয়াজ  খিজির খুব অন্যায় করেছে । মুসা অতিশয় রাগবশতঃ শর্তের কথা ভুলে গিয়ে   জিজ্ঞেস করলো, তুমি  নতুন নৌকাটা ফুটো করলে কেনো ? খোয়াজ  খিজির তার উত্তর না দিয়ে ক্রুদ্ধভাবে বললো, তুমি  শর্ত ভাঙলে কেনো ? মুসা ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে নিলো । কিছুদূর গিয়ে ওরা দেখতে পেলো  একটা বাড়ির দেয়াল কাত হয়ে রয়েছে, যে কোনো সময় পড়ে যেতে পারে । খোয়াজ  খিজির তখন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে দেয়ালটাকে খাড়া করে দিলো । বিপরীত এই কর্মটি দেখে মুসা এবার আশ্চর্য হয়ে আবারো শর্তের কথা ভুলে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো, একটু আগে একটা গরীব লোকের নতুন নৌকা ফুটো করে তার সর্বনাশ করলে, আর এবার একজনের দয়াবানের রূপ দেখালে, এর মাহাত্ম কী ?  খোয়াজ  খিজির এবার তাকে পুনরায় প্রশ্ন করায় আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো এবং বললো, আর একটা প্রশ্ন করলে তোমাকে বিদায় করে দেবো । মুসা কিন্তু তৃতীয় একটি ঘটনায় আবারও কৌতূহল বশে খোয়াজ খিজিরকে প্রশ্ন করে বসে ।  খোয়াজ ফিজির তখন মুসাকে বিদায় করে দেয় ।  বিদায় করার আগে অবশ্য প্রশ্নগুলির উত্তর জানিয়ে দিয়েছিলো । প্রথম প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলো, এখানকার সম্রাট (সম্ভবত ফেরাউন) খুবই স্বৈরাচারী ।  নতুন নৌকা দেখলে তার সৈন্যরা নৌকাটা নিয়ে নিতো বলে নৌকাটা ফুটো করে দিয়েছি । যার নৌকা সে পরে ফুটোটা মেরামত করে নিতে পারবে । দ্বিতীয় ঘটনা প্রসঙ্গে  জানায় যে, ঐ বাড়িতে একটা নাবালক ছেলে বাস করে যার পক্ষে বাড়িটা মেরামত করা সম্ভব নয়, তাই আমি মেরামত করে দিয়েছি । তৃতীয় ঘটনাটি কী তা আমি জানতে পারি নি ।
এই হলো  খোয়াজ খিজিরের গল্প যা পৌরাণিক গল্প বৈ নয় । কিন্তু এই গল্পকেই আজো মুসলমানদের  ব্যাপক অংশই সত্য বলে বিশ্বাস করে এবং  বিশ্বাস করে যে, যদি বেড়া ভাসান কোনোদিন বন্ধ হয়ে যায় তবে লালবাগ নদী ভাঙনের কবলে পড়বে এবং হাজার দুয়ারী, ইমামবারা প্রভৃতি ঐতিহাসিক সৌধগুলি ভাগিরথীর গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে । এই বিশ্বাস পোষণ করে বোধ হয় ঐ অঞ্চলের অমুসলিমরাও অনেকেই ।

বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাইনি – পাঁচ

  দ্বিতীয় অধ্যায় শেখ হাসিনা ও শেখ মুজিবের প্রতি তীব্র গণরোষের নেপথ্যে ২০২৪ এর জুলাই অভ্যুত্থানের সফল পরিসমাপ্তি ঘটে ৩৬ দিন পর (৫ই ...