Friday, October 3, 2014

হোসেনের খলিফা হওয়ার তীব্র লালসাই কারবালা যুদ্ধের প্রধান কারণ


১০ই মহরম [মুহাররম/মহররম] উদযাপিত হয় 'মহরম' হিসেবে। এই দিনটি মুসলমানদের কাছে একটি গভীর শোকের দিন। মুসলমানরা বিশ্ব শোক দিবস হিসেবেও উদযাপন করে দিনটিকে। কারণ, এই দিন ইমাম হোসেন [হুসাইন], মুহাম্মদের ছোট  নাতি নিহত হয়েছিলেন ইসলামি সাম্রাজ্যের ৬ষ্ঠ খলিফা ইয়াজিদ ওরফে এজিদের সৈন্যদের হাতে। ঘটনাটি ঘটেছিল ৬৮০ খৃষ্টাব্দের ১০ই অক্টোবর, আরবি পঞ্জিকা মতে ৬৯ হিজরীর ১০ই মহরম। সেজন্যে এই দিনটি মহরম নামেও ইতিহাসে খ্যাত। পঞ্চম খলিফা মুয়াবিয়া ওরফে মাবিয়া মৃত্যুর পূর্বে তাঁর পুত্র এজিদকে পরবর্তী খলিফা মনোনীত করে যান। ইমাম হোসেন তা মেনে নিতে পারেন নি, কারণ তিনি নিজেই খলিদফা পদের দাবিদার ছিলেন। তাই এজিদ খলিফার সিংহাসনে আরোহণ করার পর পরই তাঁর বিরুদ্ধে হোসেন বিদ্রোহ করবার আয়োজন শুরু করলেন। তিনি  স্থির করলেন যে বিদ্রোহের সমর্থনে জনমত ও  সৈন্য সংগ্রহের  জন্যে প্রথমে অধুনা ইরাকে অবস্থিত কুফা শহরে  যাবেন। তিনি কুফা শহরকে প্রথমেই নির্বাচন করেন কারণ, তাঁর কাছে খবর ছিলো যে কুফা শহরের মানুষ এজিদকে নয়, তাঁকেই খলিফা পদে দেখতে চান। কিন্তু কুফার মানুষ নাকি একদা তাঁর পিতা চতুর্থ খলিফা আলির সঙ্গে বিশ্বাসঘতকতা করেছিলো, তাই ঐ খবরের  সত্যতা নিয়ে তাঁর মনে সংশয়ও ছিলো। হোসেন তাই তাঁর চাচাতো [খুড়তুতো] ভাই মুসলিমকে গোপনে কুফা শহরে  পাঠান সেখানকার মানুষের সত্যিকারের মনোভাব যাচাই করার জন্যে। কুফায় গিয়ে মুসলিমের মনে হয়েছিলো যে সেখানকার মানুষ সত্যিই ইমামকে খলিফা পদে পেতে প্রবল আগ্রহী এবং তারজন্যে তাঁরা হোসেনের পক্ষে এজিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতেও পিছপা নয়। তিনি এ রকম একটা খবরের আশাতেই কুফা ছুটে গিয়েছিলেন। তাই তড়িঘড়ি করে খবরটা তিনি মক্কায় হোসেনের নিকট পাঠিয়ে দিয়ে তাঁকে যথা শীঘ্র সম্ভব কুফার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করতে  অনুরোধ করেন। মুসলিম কুফায় গিয়ে গিয়েই যে খবরগুলি পেয়েছিলেন তা সত্যি না কি অতিরঞ্জিত ছিলো তা খতিয়ে বিশেষ দেখেন নি। মুসলিমের নিকট থেকে ইতিবাচক খবর পেয়ে হোসেনও আর বিলম্ব করেন নি, অতি সত্বর তিনি সদলবলে কুফার পথে  রওনা দেন। এদিকে খবর পেয়ে এজিদের সৈন্যবাহিনী কুফার আগেই ইউফ্রেটাস [ফোরাত] নদীর তীরে কারবালা নামক এক প্রান্তরে তাঁর পথরোধ করেন। এবং সেখানেই উভয় দলের মধ্যে প্রবল যুদ্ধ শুরু হয়, যে যুদ্ধে হোসেন ও তাঁর সৈন্যদলের সকলেই নিহত হয়। তারপর থেকেই  দুনিয়া জুড়ে ১০ই মহরম  মুসলিম সমাজে শোকদিবস হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে। সেই ঘটনার পরই মুসলিমরা শিয়া ও সুন্নি এই দুইভাগে  দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। মুসলমানদের মধ্যে সেটাই প্রথম বিভাজন যা ঘটেছিলো কেবল ক্ষমতার জন্যে,আদর্শের জন্যে নয়। যারা এজিদের পক্ষাবলম্বন করেছিল তারা সুন্নি মুসলমান, আর যারা হোসেনের পক্ষে ছিলো তারা শিয়া মুসলমান নামে অভিহিত।  শিয়ারা মনে করে যে হোসেনই একমাত্র খলিফা পদের যোগ্য উত্তরাধিকারী ছিলেন, মাবিয়া অন্যায়ভাবে হোসেনকে বঞ্চিত করে নিজের পুত্র এজিদকে খলিফা মনোনীত করে ইসলামি সাম্রাজ্যে রাজতন্ত্র কায়েম করেন। শিয়াদের মতে মাবিয়া এই মহাপাপের কাজটি করে কার্যতঃ ইসলামি  আদর্শের অপমৃত্যু ঘটিয়েছিলেন যা ইমাম হোসেনের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিলো না। তাই ইসলামকে রক্ষা করার জন্যে তিনি এজিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং শাহাদাত বরণ করে অমরত্ব লাভ করেন।
ঘটনাটি যেহেতু কারবালা নামক স্থানে ঘটেছিলো তাই ইতিহাসে এই বিদ্রোহটি কারবালা যুদ্ধ নামেও খ্যাত। এখন শুধু আর শিয়া সম্প্রদায়ের কাছে নয়, সমস্ত মুসলমানদের কাছেই ইমাম হোসেন একজন আত্মোৎসর্গকারী মহান যোদ্ধা হিসেবে খ্যাত। শিয়া, সুন্নি প্রভৃতি সকল গোষ্ঠীর মুসলমানরাই মনে করেন যে এজিদ ছিলেন পথভ্রষ্ট ও পাপী। সেই পাপী এজিদের হাত থেকে ইসলাম ধর্ম ও ইসলামি সাম্রাজ্যকে রক্ষা করতে গিয়েই হোসেন আল্লাহর পথে আত্মবলিদান করেছিলেন। তাই আজো সারা বিশ্বের মুসলমানরা  একদিকে হোসেনকে যেমন গভীর শ্রদ্ধা সহকারে ১০ই মহরম প্রতি বছর  শোকদিবস পালন করে, তেমনি অপরদিকে এজিদকে নিষ্ঠুর, নির্দয়, নিকৃষ্ট ও পাপাচারি বলে অভিসম্পাত দেয়। কারবালার ঘটনাটি কিন্তু প্রকৃত পক্ষে ছোট্ট একটি বিদ্রোহের ঘটনা মাত্র। মাত্র ৭০/৭২ জন সৈন্য ছিল হোসেনের সঙ্গে। তিনি কুফা যাচ্ছিলেন একটি সৈন্যবাহিনী গড়ে তোলার জন্যে। কিন্তু পথিমধ্যেই বাধাপ্রাপ্ত হয়ে সদলবলে নিহত হন। ক্ষুদ্র এই বিদ্রোহের ঘটনাটিই ধর্মীয় আবেগের কারণে বিরাট একটি ঐতিহাসিক যুদ্ধের তাৎপর্য পেয়ে গেছে। ফলে কারবালার ঘটনা জানার প্রবল আগ্রহ ও কৌতূহল ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের মনে আজো সমানেভাবে বিদ্যমান।   
কারবালা যুদ্ধের সঠিক কারণ বুঝতে হলে অনেক পিছনে যেতে হবে। এর বীজ রোপিত হয়েছিলো বস্তুতঃ মুহাম্মদের মৃত্যুর পরপরই। কে হবে তাঁর উত্তরাধিকার তথা খলিফা [ইসলামি রাষ্ট্রের প্রধান] তা নিয়ে তীব্র কলহ হয় সাহাবিদের [মুহাম্মদের শিষ্যদের] মধ্যে। সে কলহের নিষ্পত্তি হতে সময় লেগেছিলো তিন দিন।  সেই তিন দিন মুহাম্মদের দাফন-কাফন [সৎকার] বন্ধ ছিলো। অবশেষে যেরূপ  নিষ্পত্তি হয়েছিলো সেটাও সাহাবিরা সবাই মনে প্রাণে মেনে নিতে পারেন নি। কোনো রকমে গোঁজামিল দিয়ে আবুবকরকে মুহাম্মদের স্থলাভিসিক্ত অর্থাৎ ইসলামি সাম্রাজ্যের খলিফা মনোনীত করা হয়েছিল। আলি, মুহাম্মদের চাচাতো ভ্রাতা ও আপন জামাই, এবং তাঁর  স্ত্রী ফতেমা আবুবকরকে খলিফা মেনে নিতে পারেন নি।  প্রকৃত অর্থে ঠিক তখনই পোঁতা হয়ে গিয়েছিল কারবালা যুদ্ধের বীজ যা পরে নানা ঘাত-প্রতিঘাতে প্রকাণ্ড বিষবৃক্ষ পরিণত হয়েছিল। ২য় ও ৩য় খলিফা মনোনয়ন বা নির্বাচনেও আলি খলিফার সিংহাসন লাভ করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। খলিফা হতে না পারার জ্বালায় আলি এতই কাতর ছিলেন যে তিনি ১ম খলিফা ও ২য় খলিফাকে খেলাফত চালানোয় সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেন নি। তারপর তৃতীয় বারেও যখন খলিফা হতে ব্যর্থ হন এবং খলিফা পদে নির্বাচিত হন মুহাম্মদের আর এক জামাই ওসমান গণি, তখন তাঁর সহ্যের বাঁধ ভেঙে যায়। কারণে অকারণে তিনি ৩য় খলিফা ওসমানের ভুল ধরা শুরু করেন। নানারূপ তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে ওসমানের বিরুদ্ধে সাহাবি ও সাধারণ মুসলমানদের [প্রধানতঃ হাসেমি বংশের লোকদের] মনে যে অসন্তোষের   জন্ম হতো তাকে আলি আরো উস্কে দিতে শুরু করেন পেছন থেকে। ফলে কিছু বিদ্রোহী জোটবদ্ধ হয়ে এক সময় ওসমানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংগঠিত করে যার পেছনে আলির মদত ছিলো। আলি যে নেপথ্যে থেকে সেই বিদ্রোহে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন তা পরের অনেক ঘটনা থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়। ঐ বিদ্রোহেই খলিফা ওসমান গণি নিহত হন। তারপর বিদ্রোহীরাই আলিকে ৪র্থ খলিফা মনোনীত করেন। তারপর পরিস্থিতি দ্রুত কারবালার যুদ্ধের দিকে এগোতে শুরু করে। কারবালা  যুদ্ধের ইতিহাসের  পিছনের প্রেক্ষাপটটি অনেক বিস্তৃত ও ব্যাপক। তার সব দিকটা একটা নিবন্ধে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। তাই আলির খলিফা হওয়ার পর পরিস্থিতি যেহেতু দ্রুত কারবালার যুদ্ধের দিকে ধাবিত হয়েছিলো, তাই  সেখান থেকেই শুরু করা যেতে পারে।   
আলি মাত্র চার/পাঁচ বছর খেলাফত চালিয়েছিলেন। তাঁর খেলাফত কালে সমগ্র ইসলামি সাম্রাজ্যে গৃহযুদ্ধ বাধে। আলির বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহ শুরু হয়েছিলো সে বিদ্রোহের মূল নেতৃত্বে  ছিলেন একদিকে মাবিয়া, আর একদিকে ছিলেন মুহাম্মদের প্রিয়তম ও সর্বকনিষ্ঠ স্ত্রী আয়েশা। আলির সঙ্গে মাবিয়া ও আয়েশার বিরোধের পেছনে ক্ষমতার সংকীর্ণ স্বার্থ ছিলো না। ছিলো ন্যায় বিচারের দাবি। মাবিয়া ও আয়েশা সহ সমস্ত সাহাবিরা দাবি করেছিলেন যারা ওসমানকে হত্যা করেছে তাদের বিচার ও কঠোর শাস্তি। ইসলামের ইতিহাসে বিদ্রোহীদের হাতে খলিফা ওসমানের মৃত্যু এক অতি বর্বরোচিত ও  মর্মস্পর্শী ঘটনা। তিনি নিজ প্রাসাদে ৪০ দিন বন্দি থাকার পর বিদ্রোহীদের হাতে নিহত হন। তখন তাঁকে রক্ষা করার জন্যে আলি ও তাঁর পুত্ররা কেউই এগিয়ে যান নি। ওসমান গণি যখন খলিফা তখন বহুদূরে অবস্থিত সিরিয়া প্রদেশের গভর্নর পদে নিযুক্ত ছিলেন মাবিয়া। তিনি ছিলেন খলিফার ভীষণ আস্থাভাজন ও বিশ্বস্ত। ওসমানের নিহত হওয়ার খবরে তিনি ভীষণ আঘাত পেয়েছিলেন। এদিকে বিদ্রোহীদের হাত ধরে আলি যখন খলিফা পদে অধিষ্ঠিত হন, তখন সেটা কেউ মনের দিক থেকে মেনে মিতে পারে নি। কিন্তু বিদ্রোহীদের ভয়ে কেউ প্রতিবাদও করে নি। পরে সকলেই ওসমানের হত্যাকারীদের বিচার ও শাস্তির দাবিতে মুখর হয়। তবে মাবিয়া ও আয়েশা ছিলেন সেই দাবিতে সর্বাধিক সোচ্চার। আলি সেই দাবিকে অগ্রাহ্য করেছিলেন, কারণ বিদ্রোহীদের অধিকাংশই ছিল তাঁর লোক। ওসমানের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচারের ব্যবস্থা না করে তাদের নিয়েই খেলাফত পরিচালনার কাজ শুরু করেন। এই ঘটনায়  সাহাবিরা  এতোই ক্ষুব্ধ হন যে তাঁরা আলির কাছে বয়াত [আনুগত্যের শপথ] না নিয়ে মদিনা ছেড়ে মক্কা চলে যান। সেখানে আয়েশা তখন অবস্থান করছিলেন, তাঁর কাছে সাহাবিরা সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করেন। আয়েশা তা শুনে ক্ষুব্ধ সাহাবিদের সঙ্গে নিয়ে ওসমানের হত্যাকারীদের শাস্তি দাবিতে আলির বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঘোষণা করেন।  অপরদিকে সিরিয়ার গভর্নর মাবিয়ার নেতৃত্বে কয়েকজন গভর্নর এবং আরো অনেকেই আলির কাছে বয়াত নিতে অস্বীকার করেন। তাঁরা দাবি করেন যে আগে ওসমানের হত্যাকারীদের তাঁদের হাতে সমর্পন করতে হবে,  তারপর তাঁরা আলির কাছে বয়াত নেবেন। আলি কারও কথাতেই কর্ণপাত করেন নি। উল্টে মাবিয়া সহ পাঁচ জন গভর্ণর যাঁরা ওসমানের হত্যাকারীদের বিচার ও শাস্তির দাবি জানিয়েছিলেন তাঁদেরকে বরখাস্ত করেন। ফলে আলির বিরুদ্ধে চারিদিকে ব্যাপক গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। আলির খেলাফত কালে যতগুলো যুদ্ধ হয়েছিলো তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রধান দুটি যুদ্ধ হলো জামালের যুদ্ধ বা  উটের যুদ্ধ এবং সিফফিনের যুদ্ধ। দুট যুদ্ধই হয়েছিলো ৬৫৮ খৃষ্টাব্দে। জামালের যুদ্ধে হয়েছিলো মুহাম্মদের প্রিয়তমা স্ত্রী আয়েষার সঙ্গে যে যুদ্ধে দশ হাজার মুসলমানের মৃত্যু হয়েছিলো এবং সিফফিনের যুদ্ধ হয়েছিলো  মাবিয়ার সঙ্গে যে যুদ্ধে নব্বই হাজার মুসলমান মারা গিয়েছিলো। জামালের যুদ্ধে আয়েষা পরাস্ত হয়ে আলির হাতে বন্দি হয়েছিলেন, কিন্তু সিফফিনের যুদ্ধে জয়-পরাজয় হয় নি। আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজবার জন্যে উভয় পক্ষ যুদ্ধ বিরতি করতে সম্মত হয়। সেই বিরতি চলাকালীন সময়ে গৃহযুদ্ধের আবহেই গুপ্তঘাতকের হাতে  আলির মৃত্যু হয়। যারা আলিক এ হত্যা করেছিলো তারা এক সময় আলির পক্ষেই ছিলো। সিফফিনের যুদ্ধে আলি যুদ্ধ বিরতির সিদ্ধান্ত নিলে তারা আলির বিরুদ্ধে চলে যায় যারা ইতিহাসে খারিজি নামে পরিচিত, তারাই ছিল  আলির গুপ্তঘাতক। আলি নিহত হলে  মাবিয়া ৫ম খলিফা মনোনীত হন।
মাবিয়া যখন খলিফার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন তখন ইসলামি সাম্রাজ্য গৃহযুদ্ধে একেবারের বিধ্বস্ত এবং পতনের দোরগড়ায় দাঁড়িয়ে । ইসলামি রাষ্ট্র থেকে  বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্যে  তখন বিভিন্ন জায়গায়  বিদ্রোহ শুরু হয়ে গিয়েছিলো, চারিদিকে তখন চলছে চরম বিশৃঙ্খলা ও অরাজক অবস্থা। সমস্ত বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা মাবিয়া  দক্ষতার সাথে কঠর হাতে দমন করেন এবং বিধ্বস্ত  ইসলামি রষ্ট্রটিকে শক্তিশালী ও সংহত একটি রাষ্ট্র হিসেব গড়ে তোলেন। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ফিলিপ কে হিট্টি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘বিশৃঙ্খলার মধ্যে মুয়াবিয়া শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন এবং একটি শক্তিপূর্ণ মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন।’ মাবিয়া তারপর রাজ্য বিজয়ে মনোনিবেশ করে রাষ্ট্রের ব্যাপক বিস্তার ঘটান। হিট্টির মতে মুয়াবিয়ার খেলাফত কালে ইসলামের খেলাফত শুধু সংহতই হয় নি, বরং বহুগুণে সম্প্রসারিতও হয়েছিলো। তাঁর শাসনকালে ইসলামি সাম্রাজ্যের ব্যাপক বিস্তার ও উন্নতি হয়েছিলো। মাবিয়া দীর্ঘ সময় ক্ষমতাসীন ছিলেন [৬৬১-৬৮০]। তিনি ছিলেন বড়ো মাপের একজন সুশাসকও। তাঁর নীতি ছিলো দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন। কঠোর হাতে তিনি চোর, গুন্ডা, লম্পট, বদমায়েশদের শাসন করেছেন। তাঁর শাসনে সাধারণ মানুষ এবং বিশেষতঃ নারীরা শান্তিতে ও নির্বিঘ্নে জীবনযাপন করতে পারতেন। মাবিয়াই প্রথম ইসলামি সাম্রাজ্যে ধর্মনিরপেক্ষ নীতির  কিছুটা হলেও সূচনা করেন। সব ধর্মের মানুষদের নিয়ে গড়ে তোলেন রাষ্ট্রের সৈন্যবাহিনী। খৃষ্টান কবি আল আখতালকে সভাকবির মর্যাদা দেন । খৃষ্টান চিকিৎসক ইবন আসালকে হিমস প্রদেশের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা নিযুক্ত করেন। মাবিয়া শিল্প-সাহিত্যেরও  গুণগ্রাহী ছিলেন। তিনি ব্যক্তি জীবনে ছিলেন খুবই সৎ, স্বচ্ছ ও ধর্মভীরু মানুষ। তিনি সুরা পান করতেন না, এবং নারীর প্রতি আসক্ত ছিলেন না। মাবিয়ার এসব গুণ ও সাফল্যের কথা তাঁর ঘোর শত্রুরাও অকপটে স্বীকার করেন। মাবিয়া সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত হিট্টি বলেছেন, মাবিয়া ছিলেন শ্রেষ্ঠ আরব নৃপতি।
মাবিয়ার দীর্ঘ এই খেলাফত কালে ইমাম হোসেন তাঁকে কোনো প্রকার সহযোগিতা করেছেন এমন খবর পাওয়া যায় না। ইসলামি রাষ্ট্রকে যিনি পতনের হাত থেকে রক্ষা করেন এবং তারপর সেই রাষ্ট্রের বিপুল বিস্তার ও উন্নতি সাধন করেন সেই মাবিয়ার প্রতি প্রসন্ন  না হয়ে বরং তিনি বিরূপই ছিলেন। এর কারণ সম্ভবতঃ একটাই, তা হলো, তাঁর পিতা আলির সঙ্গে মাবিয়ার যে দ্বন্দ ও যুদ্ধ হয়েছিলো সে কথা তিনি কখনোই ভুলতে পারেন নি। হয় তো চানও নি। এমনকি খলিফা হিসেবে মাবিয়ার ন্যূনতম যেটুকু মর্যাদা ও সমীহ  প্রাপ্য ছিলো, হোসেনের আচরণে তারও কোনোদিন প্রকাশ বা প্রতিফলন  দেখা যায় নি। বরং তিনি তাঁকে সর্বদা হয় উপেক্ষা করতেন, না হয় তাঁর সঙ্গে রূঢ় আচরণ করতেন।  মাবিয়া এত উদার প্রকৃতির মানুষ ছিলেন যে, তাঁর প্রতি এরূপ মনোভাব ও আচরণ সত্ত্বেও তিনি কখনো হোসেনের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন নি। বরং মাবিয়া হোসেনকে মুহাম্মদের নাতি বলে যা তাঁর প্রাপ্য তার চেয়ে অনেক বেশী গুরুত্ব ও সম্মান প্রদর্শন করেছেন আমৃত্যু।
মাবিয়া মারা যাবার পূর্বে তাঁর পুত্র এজিদকে পরবর্তী খলিফা মনোনীত করে যান। সে জন্যে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় যে তিনি খলিফা নির্বাচনে ইসলামি গণতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। খলিফা নির্বাচনে কিন্তু কখনোই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু ছিলো না। কীভাবে হৈ হট্টগোল ও কলহের  মধ্যে আবুবকর ১ম খলিফা মনোনীত হয়েছিলেন সেকথা পূর্বেই আলোচানা করা হয়েছে। আর আবুবকর মৃত্যুর আগে ২য় খলিফা মনোনীত করে যান ওমর ফারুককে কারো সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ছাড়াই। তিনি সকলকে ডেকে ঘোষণা দেন যে তিনি ওমর ফারুককে ২য় খলিফা মনোনীত করলেন। সুতরাং মাবিয়া ইসলামি গণত্তান্ত্রিক ব্যবস্থার লঙ্ঘন করেছিলেন এমন অভিযোগ ভিত্তিহীন। মুহাম্মদও কীভাবে খলিফা নির্বাচন করতে হবে সে বিষয়ে কিছুই বলে যান নি। তাছাড়া মাবিয়ার সময়ে ইসলামি সাম্রাজ্যের আয়ত তখন এতো সুবিশাল যে পরবর্তী খলিফা নির্বাচনে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অনুসরণ করা অসম্ভব ছিলো। তখন তেমন ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন  কোনো সাহাবি  জীবিত ছিলেন না যিনি খলিফা পদে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারতেন। অপরদিকে পরবর্তী খলিফা পদের জন্যে হোসেনের নাম কোনোভাবেই বিবেচনা করার অবকাশ ছিলো না। কারণ, ইমাম হোসেন খলিফা মাবিয়ার সঙ্গে সর্বদা দুরত্ব বজায় রেখে চলেছেন, শাসনকার্য পরিচালনায় কোনোরূপ সহযোগিতা করেন নি, বরং পদে পদে অসহযোগিতাই করেছেন। ফলে শাসনকার্য পরিচালনায় তাঁর বিন্দু মাত্র অভিজ্ঞতা ছিলো না। অন্যান্য যাঁরা গুরুত্বপূর্ন গভর্ণর বা উচ্চপদস্থ ও নেতৃস্থানীয় পদাধিকারী ছিলেন তাঁদের মধ্যে কাউকে খলিফা মনোনীত করা হলে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হবার যথেষ্ট আশঙ্কা ছিলো। এজিদ ছাড়া অন্য কাউকে খলিফা মনোনীত করলে ইসলামি সাম্রাজ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা প্রবলভাবেই ছিলো। এবং তা হলে শুধু ইসলামি সাম্রাজ্যের পতনই হতো না, ইসলাম ধর্মটাই বিপন্ন হতে পারতো। তাই আপন পুত্র এজিদকে খলিফা  মনোনীত করা ছাড়া মাবিয়ার সামনে বিকল্প কোনো পথ খোলা ছিলো না। মাবিয়া ছিলেন অত্যন্ত দূরদর্শী,  সম্ভবতঃ  ইসলাম ও ইসলামি সাম্রাজ্যের নিরাপদ ভবিষ্যতের কথা ভেবেই তিনি তাঁর পুত্র এজিদকে পরবর্তী খলিফা মনোনীত করেছিলেন। ঐতিহাসিক মর্গান ঠিক সে কথাই বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘খিলাফতের উত্তরাধিকার নির্বাচনের ব্যাপারে গৃহযুদ্ধ এড়াতে হলে বংশানুক্রমিক নীতি বলবৎ করা ব্যতীত আর কোনও বিকল্প ছিলো না। আবার ইয়াজিদও অযোগ্য ব্যক্তি ছিল তাও নয়।’ মুসলিম ঐতিহাসিকরা এজিদ  সম্পর্কে অনেক কটূ মন্তব্য করেছেন। তাঁদের মতে  তিনি ছিলেন খলিফা পদের সম্পূর্ণ অযোগ্য। তবু তাঁকে মাবিয়া খলিফা মনোনীত করেছিলেন অন্ধ পুত্রস্নেহের বশবর্তী হয়ে। এজিদ সম্পর্কে এমন মূল্যায়ন নিশ্চিতভাবেই একপেশে ও পক্ষপাতমূলক। এজিদ যে খলিফা পদে যোগ্য ছিলেন সে কথা মর্গানের মতো স্বীকার করেছেন বার্ণাড লুইস ও ইবনে কাতিবের মতো প্রখ্যাত ঐতিহাসিকগণও। লুইস বলেছেন, ইয়াজিদ রাজোচিত গুণাবলীর অধিকারী ছিলেন। আর ইবনে কাতিব বলেছেন, ইয়াজিদ উদারপন্থী ও বাগ্মী ছিলেন। 
এ প্রসঙ্গে একটা কথা উল্লেখ করা আবশ্যক। এজিদকে খলিফা হিসেবে মাবিয়া তাঁর ক্ষমতার জোরে মুসলমানদের উপর চাপিয়ে দেন নি। তিনি এজিদের গ্রহণযোগ্যতা আছে কী না তা নিজে সাম্রাজ্য ঘুরে ঘুরে যাচাই করেছিলেন। বিভিন্ন প্রদেশে গিয়ে এজিদকে খলিফা পদে মেনে নিতে কারো সম্মতি বা আপত্তি আছে কী না  সে বিষয়ে  সকলের মতামত আহ্বান করেছিলেন। সমগ্র সাম্রাজ্যের মধ্যে মাত্র তিনজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছাড়া বাকি সকলেই এজিদের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন  ঘোষণা করেছিলেন । যাঁরা আপত্তি জানিয়েছিলেন তাঁরা হলেন ইমাম হোসেন, আবুবকরের পুত্র আব্দুর রহমান এবং ওমর ফারুকের পুত্র আবদুল্লাহ। ইমাম হোসেনের মনে তাঁর পিতার মতোই খলিফা হওয়ার তীব্র লালসা ছিলো। আবার তাঁর পিতার মতোই তাঁরও খলিফা হওয়ার কোনো যোগ্যতা ছিলো না। আলি ছিলেন মুহাম্মদের চাচাতো ভাই ও জামাই, তাঁর খলিফা হওয়ার যোগ্যতা থাকলে সবাই তাঁকেই ১ম খলিফা নির্বাচিত করতেন। কিন্তু একজনও খলিফা হিসেবে তাঁর নাম প্রস্তাব করে নি। আবার আবুবকরও ২য় খলিফা পদের জন্যে আলির কথা বিবেচনায় আনেন নি। বিবেচনায় আনেন নি ২য় খলিফা ওমর ফারুকও ৩য় খলিফা মনোনীত করার সময়।  ঠিক তেমনই মাবিয়ার পর খলিফা পদের জন্যে কেউই হোসেনের নাম বিবেচনা করেন নি। কিন্তু আলি ও হোসেন দুজনেই খলিফা পদের প্রবল দাবিদার ছিলেন শুধু এজন্যে যে তাঁরা ছিলেন মুহাম্মদের বংশধর।
১ম বার খলিফা হতে না পেরে আলি ১ম খলিফা আবুবকরের কাছে ছ’ মাস [যত দিন ফাতেমা বেঁচে ছিলেন] বয়াত নেন নি। ছ’ মাস পরে বয়াত নিয়েছিলেন আবুবকরের কাছে শুধু ২য় খলিফা হওয়ার বাসনায়। আলির পুত্র ইমাম হোসেনও এজিদ খলিফা পদে যখন অধিষ্ঠিত হন, তখন তাঁর কাছে বয়াত নিতে সম্মত হন নি। ঘুরিয়ে তাঁকে খলিফা বলে অস্বীকার করেন এবং তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে সিংহাসন দখল করার জন্যে তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। তারই পরিণতিতে ঘটেছিলো কারবালা যুদ্ধ এবং সেই যুদ্ধে তাঁর পরাজয় ও মৃত্যু হয়েছিলো। খলিফা পদের লালসা ছেড়ে হোসেন যদি দ্বীনের কাজে তথা ধর্মের কাজে নিজেকে ব্যাপৃত রাখতেন তা হলে কারবালা যুদ্ধের ঘটনা ঘটতো না। তাই কারবালা যুদ্ধের জন্যে মাবিয়া বা এজিদ নয়, দায়ী ছিলেন ইমাম হোসেন নিজেই।
মুসলিম সমাজে সাধারণভাবে একটা বিশ্বাস প্রবল ভাবে রয়েছে যে এজিদ স্বয়ং ইমাম হোসেনকে  হত্যা করেছিলেন। কিন্তু এটা একেবারেই সত্য ঘটনা  নয়। এমনকি এজিদ হোসেনকে হত্যা করার নির্দেশ পর্যন্ত দেন নি। এজিদ তাঁর সেনাপতিকে বলেছিলেন হোসেনের কুফা যাত্রার গতিপথ রোধ করে তাঁর বিদ্রোহ ব্যর্থ করে দিতে। কারবালা প্রান্তর ও ইসলামি সাম্রাজ্যের তখনকার রাজধানী দামেস্কের মধ্যে দুরত্ব ২০০ মাইল  মতো।  অতো দূরে বসে কারবালার প্রন্তরে কী ঘটেছিলো তা এজিদের পক্ষে জানা ও বোঝা সম্ভব ছিলো না। সুতরাং এজিদ হোসেনকে হত্যা করেছিলেন বা যুদ্ধস্থলে হত্যার আদেশ দিয়েছিলেন এমন অভিযোগ ভিত্তিহীন। বরং প্রকৃত ঘটনা হলো ঠিক তার বিপরীত যা সাধারণতঃ  মুসলিম ঐতিহাসিকরা আড়াল করার চেষ্টার  করে থাকেন। সে ঘটনাগুলো এরূপ – এক]. হোসেনের ছিন্ন মস্তক যখন এজিদের কাছে সমর্পণ করা হয়েছিল মস্তবড়ো বখশিশের [পুরস্কার] আশায় তখন এজিদ প্রচন্ড আহত ও ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। এবং হোসেনের ছিন্ন মস্তক সহ কারবালার প্রান্তরে হোসেনের যে সৈন্যরা নিহত হয়েছিলেন তাদের সকলকে ইসলামি বিধি-বিধান অনুসারে ও যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে দাফন-কাফন [সৎকার] করা এবং [দুই]. হোসেনের স্ত্রী সহ সকল বন্দি নারী ও শিশুকে সসম্মানে মক্কায় ফেরৎ পাঠানোর ব্যবস্থা করতে নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। এজিদ ছিলেন এমনই উদার ও মানবিক গুণ সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব।
শেষ
পুনশ্চঃ কারবালায় যে বিদ্রোহ বা যুদ্ধটি হয়েছিলো তারজন্যে শুধু হোসেনই নয়, দায়ী ছিলেন বহুলাংশে আলিও। আলি মনে করতেন তিনি যেহেতু আলির একমাত্র বংশধর  তাই তিনিই একমাত্র ইসলামি রাষ্ট্রের উত্তরাধিকার। তার ফলেই মুহাম্মদের মৃত্যুর পর তাঁর মনে খলিফা হওয়ার তীব্র লোভ-লালসা  দানা বেঁধেছিলো।  আলি তাঁর এই চিন্তাভাবনা সঞ্চারিত করে দিয়েছিলেন তাঁর পুত্রদের মধ্যে, এবং সে কারণে হোসেনও নিজেকে খলিফা পদের উত্তরাধিকার বলে ভেবে বসেছিলেন। কিন্তু সুন্নি মুসলমানদের মতে মুহাম্মদ নাকি স্বয়ং বলে যান যে নবীদের উত্তরাধিকার হয় না। তাই আলি ও হোসেন দুজনেরই খলিফা হওয়ার দাবি বৈধ ও সঙ্গত ছিলো না। ফলে নবীর উত্তরাধিকার হিসেবে খলিফা পদে তাঁদের নাম কেউই বিবেচনা করার কথা ভাবেন নি। অথচ আলি ভেবেছিলেন যে তাঁকে চক্রান্ত করে খলিফা পদ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। সে কারণে তিনি কাউকেই মন থেকে খলিফা হিসেবে মেনে নেন নি এবং তাঁদের খেলাফত পরিচালনায় সহযোগিতা করার বদলে অসহযোগিতা করতেও দ্বিধা করেন নি। ওসমানের বেলায় তো তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নেপথ্য সেনাপতির ভূমিকা পালন করেছেন। কীভাবে আলি সেই ভূমিকা পালন করেছিলেন, এবং তারও আগে ১ম ও ২য় খলিফাকে কীভাবে সহযোগিতার বদলে অসহযোগিতা করেছিলেন সে ঘটনাগুলি আলোচনা করা খুব দরকার। না হলে, এই প্রবন্ধে  আলির সম্পর্কে যে কথাগুলি বলা হয়েছে তার সত্যতা নিয়ে সংশয় থেকে যাবে এবং কারবালার ঘটনায় আলি কতটা দায়ী সেটাও স্পষ্ট হবে না। তাই কারবালা কান্ডে আর একটা প্রবন্ধ লেখা জরুরী  যেখানে আলির  উপর যথেষ্ট আলোচনা থাকবে। যথাসম্ভব শীঘ্র সেটি লেখা হবে।  


[বিঃদ্রঃ কারবালার যুদ্ধ নিয়ে লেখা আমার একটি বই আছে। বইটির নাম - কারবালাঃ মিথ ও মিথ্যা। বইটি সংগ্রহ করতে হলে এই নম্বরে যোগাযোগ করতে হবে - ৯০৩৮৫৩০৬৯০, ৮০১৭৯৫৪১২৬]

Sunday, September 21, 2014

মুহাম্মদ প্রদর্শিত পথে উপার্জিত অর্থেই ‘আইএস’ আজ বিশ্বের সব চেয়ে ধনী জঙ্গিগোষ্ঠী



‘আইএস’ তথা ‘ইসলামিক স্টেট’ এখন নৃশংসতা, নিষ্ঠুরতা ও পৈশাচিকতায় সারা বিশ্বের সমস্ত জঙ্গিসংগঠনগুলিকে ছাপিয়ে গিয়েছে এ কথা বোধ হয় অনায়াসে বলা যায়। এই সময়ে হিংস্রতা, প্রতিশোধস্পৃহা ও প্রতিহিংসায় ‘আইএস’-এর তুলনা বোধ হয় আর কারো সঙ্গে করা চলে না। ‘আইএস’ শুধু সাংগঠনিক শক্তির বিচারে কিংবা হাড় হিম করা হিংসাত্মক ও ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ডেই বিশ্বের যে কোনো জঙ্গিবাদী সন্ত্রাসী সংগঠনকেই পিছনে ফেলে দিয়েছে তাই নয়, আর্থিক সম্পদের দিক থেকেও সবার থেকে অনেক অনেক বেশি এগিয়ে গিয়েছে। নিজের নাম গোপন রেখে আমেরিকার গোয়েন্দা বিভাগের একজন বিশেষজ্ঞ বলেন যে  ‘আইএস’ হচ্ছে এ যাবত  বিশ্বের সবচেয়ে ধনী জঙ্গিবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। প্রতিদিন নানা সূত্রে যে পরিমাণ অর্থ আয় করে এরা তা যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে কল্পনারও অতীত। যে সূত্রগুলি ওদের আয়ের উৎস তার মধ্যে অন্যতম একটি হলো  গ্যাসক্ষেত্র থেকে তেলের চোরাচালান। ত্রাণকর্মী, গবেষক ও গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে তেলের চোরাচালান থেকে প্রতিদিন ত্রিশ লাখ ডলারেরও বেশী অর্থ তারা আয় করে। তাদের অধিকৃত অঞ্চলের মধ্যে ১১টি তৈল ক্ষেত্র আছে। এ সব তৈল ক্ষেত্র থেকে তারা তেলের চোরাচালান করে বাজার দর থেকে অনেক কম কম মূল্যে। কাতারের দোহা সেন্টারের ব্রুকিংস ইনস্টিটউশনের ভিজিটিং ফেলো লুয়াই খাত্তিব জানিয়েছেন যে ব্যারেল প্রতি তেলে বাজার মূল্য যেখানে ১০০ ডলার, সেই তেল তারা বিক্রি করে ব্যারেল প্রতি মাত্র ২৫ থেকে ৬০ ডলারে। এবং তাতেও তাদের অনেক লাভ থাকে যেহেতু তারা চোরাকারবারিদের কাছ থেকে তেল খুব কম দামে কেনে।
এ বছর জুন মাসের শেষের দিকে ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মসুল দখল করার পর ‘আইএস’ স্থানীয় ব্যবসায়ী ও জনসাধারণের কাছ থেকে ব্যাপক চাঁদাবাজীর মাধ্যমে প্রচুর অর্থ সংগ্রহ করে।  মসুলের দখল নিয়েই তারা ফতোয়া দেয় যে, সমস্ত অমুসলমানদের হয় মুসলমান হতে হবে, নতুবা জিজিয়া কর দিতে হবে, নতুবা মসুল শহর ছেড়ে চলে যেতে হবে, নতুবা মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে।  মসুলের পঁচিশ হাজার খৃষ্টান তখন দেশ ছেড়ে চলে যায়, যারা যেতে পারে নি বা যেতে চায় নি তাদের কাছ থেকে ‘আইএস’ প্রচুর অর্থ আদায় করে।
‘আইএস’ তাদের অধিকৃত অঞ্চল সমূহে অবস্থিত সমস্ত ব্যাঙ্ক থেকে বিশাল অঙ্কের নগদ অর্থ তারা লুট করে। লুয়াই খাত্তিব বলেন যে, ইরাক থেকে প্রচুর প্রাচীনকালের  মূল্যবান নিদর্শনগুলিও চোরাই পথে তুরস্কে বিক্রি করেও প্রচুর অর্থ আয় করেছে। খাত্তিব আরো বলেন যে তাদের অবৈধ আয়ের আর একটি শাঁসালো মাধ্যম হলো মানুষ পাচার। অসংখ্য নারী ও শিশু যৌন-দাসী বা যৌন-দাস হিসেবে পাচার করে শত শত মিলিয়ন ডলার উপার্জন করছে। আমেরিকার অন্য আর  একটি গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে যে তহবিল সংগ্রহ ও সমৃদ্ধ করার জন্যে ‘আইএস’  অন্যান্য মাফিয়া সংগঠনগুলির মতোই কাজ করছে। তাদের মতে ‘আইএস’ যেমন সুসংগঠিত ও  নিয়মতান্ত্রিক, তেমনি ভীতি প্রদর্শন ও সহিংসতাতেও অত্যন্ত পটু ও নৃৃৃশংস। আইএসের তহবিলে বিপুল অর্থ ঢোকানোর আর একটি বিরাট মাধ্যম হল শত্রু শিবিরের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অপহরণ করে তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করা।  এ বছর গোড়ার দিকে তারা চারজন ফরাসী ও দু'জন স্পেনের সাংবাদিককে অপহরণ করে  ও জিম্মি করে।  মুক্তিপণ বাবদ  মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে সংস্লিষ্ট সরকার তাদের মুক্ত করে নিয়ে যায়। আমেরিকা মুক্তিপণ দেয়  নি বলে তাদের দুজন সাংবাদিককে – জেমস ফলি ও স্টিভেন সটলফ – শিরচ্ছেদ করে হত্যা করে। সেই ছবি ভিডিও-র মাধ্যমে তারা বিশ্ববাসীর সামনে প্রকাশ করে আমেরিকা সহ গোটা বিশ্বকে ভীত-সন্ত্রস্ত করার জন্যে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ‘আইএস’কে অর্থ সরবরাহ করতো প্রথম দিকে মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলো এবং সে সব দেশের ধনকুবেররা। ‘আইএস’- এর নৃশংসতম জঙ্গিবাদী সন্ত্রাসী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে প্রবল সমালোচনা ও প্রতিবাদ ওঠায় তারা এখন অর্থ জোগান অনেক কমিয়ে দিয়েছ। অবশ্য এখন তাতে তাদের কোনো অসুবিধা হচ্ছে না, কারণ ঐ সব ধনী দেশ ও ব্যক্তিদের নিকট থেকে যে পরিমাণ অর্থ পেতো তার চেয়ে অনেক অনেক বেশী অর্থ তারা এখন চোরাচালান, চাঁদাবাজি, ব্যাঙ্ক-লুট ও মানুষ পাচার করে উপার্জন করছে।   
‘আইএস’ যে  পথে অর্থ সংগ্রহ করছে তার চেয়ে  বেআইনী, অনৈতিক, নিকৃষ্ট ও  জঘন্য পথ আর কিছু নেই। ‘আইএস’ – এর এভাবে অর্থ উপার্জন করার বিরুদ্ধে স্বাভাবিকভাবেই তীব্র প্রতিবাদ, নিন্দা ও ধিক্কার ধ্বনিত হচ্ছে চারিদিকে। এর পাশাপাশি এ প্রশ্নও উঠছে যে ‘আইএস’ অনুসৃত এই  পথ ইসলাম সম্মত কি না? মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা এবং এমনকি  মুসলিম সমাজের ধর্মীয় নেতাদের [উলামা] একাংশ বলছেন যে ইসলাম চাঁদাবাজি, চোরাকারবারি, মানুষ পাচার, ব্যাঙ্ক লুট প্রভৃতি কাজকে সমর্থন তো করেই না, বরং এসব কাজের বিরুদ্ধে ইসলামে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।এই বক্তব্যের উপর আবার সীলমোহর লাগিয়ে দিচ্ছেন অমুসলিম দেশ ও অমুসলিম সমাজের অধিকাংশ রাষ্ট্রনায়কগণ এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকেই। সাধারণভাবে এমনিতেই অধিকাংশ মানুষের বিশ্বাস যে কোনো ধর্মই এমন জঘন্য পথে অর্থোপার্জন করাকে সমর্থন বা অনুমোদন করে না। আর মুসলমানরা তো একেবারেই অন্ধভাবে বিশ্বাস করে যে  ইসলাম হলো শান্তির ধর্ম এবং এর মত ভালো ধর্ম আর নেই। তাই স্বতঃসিদ্ধভাবে এই মিথটাকেই সত্যি বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে যে, ‘আইএস’ যে পথে অর্থোপার্জন করছে তা সম্পূর্ণ অনৈস্লামিক।  
কিন্তু রাষ্ট্রনায়ক বা বুদ্ধিজীবীরা সব সময় সত্যি বলেন এমন নয়। বহু ক্ষেত্রেই তাঁরা নিজেদের কিংবা বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থ সিদ্ধির জন্যে মিথ্যার বেসাতি করতে দ্বিধা করেননা। এমনকি ইতিহাসকে বিকৃত করতেও দ্বিধা করেন না। তাঁরা ‘আইএস’-দের প্রসঙ্গে যা বলছেন বা ইসলাম সম্পর্কে  দরাজ হাতে যে সব শংসাপত্র দিচ্ছেন তা যে  সঠিক ও সত্যি তার সপক্ষে তারা কোনো প্রমাণ দিচ্ছেন না। দেবেন কী করে? কারণ, সত্যিটা যে ঠিক তার বিপরীত।সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা এ কথা শুনে ভীষণ হতাশ হবেন ও দুঃখ পাবেন ঠিকই, কিন্তু এটাই হলো বাস্তব ও সত্যি। সাধারণভাবে মুসলমানদের বিশ্বাস যে ইসলাম হলো শান্তি, সাম্য, সহিষ্ণুতা ও ক্ষমার ধর্ম যা নিয়ে তাদের গর্বের অন্ত নেই। তাই তাদের দৃঢ় বিশ্বাস যে,  ‘আইএস’ যে পথে অর্থোপার্জন করছে তা ইসলাম একদম অনুমোদন করে না এবং ‘আইএস’-এর কার্যকলাপে ইসলামের বদনাম হচ্ছে, ইসলামকে কালিমালিপ্ত করছে ওরা। ধর্মপ্রাণ মুসলিমরাই শুধু নয়, এই ধারণা ও বিশ্বাস অধিকাংশ অমুসলিমদের মধ্যেও লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু মুশকিল হলো বিশ্বাস ও বাস্তবের মধ্যে এবং ধারণা ও তথ্যের মধ্যে কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। ইসলামের ইতিহাস, কোরান-হাদিস ও মুহাম্মদের জীবনী বলে সম্পূর্ণ অন্য কথা। প্রকৃত ঘটনা হলো ইসলাম শান্তি, সাম্য, সহিষ্ণুতা ও ক্ষমার ধর্ম বলে যে প্রচার করা হয় তা সম্পূর্ণ মিথ ও একেবারেই সত্যের বিপরীত।স্বভাবতই এটা মোটেই সত্যি নয় যে ‘আইএস’ যে পথে অর্থোপার্জন করছে তা ইসলাম অনুমোদন করে না। শুধু মুহাম্মদের জীবনকেই যদি সামান্য একটু পর্যালোচনা করে দেখা হয় তাহলেই এই নির্মম সত্য ছবিটা দৃষ্টিগোচর হয়। তাই প্রকৃত সত্যিটা জানা দরকার। আর তারজন্য এবার আমাদের মুহাম্মদের জীবনের উপর  একটু আলোকপাত করতে হবে।
মুহাম্মদ মক্কায় তাঁর ধর্ম প্রতিষ্ঠায় চূড়ান্ত ব্যর্থ হয়ে ৬২২ খৃষ্টাব্দে যখন মদিনা যান তখন আর্থিক দিক দিয়ে তিনি ছিলেন সম্পূর্ন নিঃস্ব। তিনি তখন এতোটাই  নিঃস্ব  ছিলেন যে তাঁঁর নিজের গ্রাসাচ্ছাদন করার সঙ্গতিও ছিলো না। মদিনার মুসলমানরা তাই তাঁর গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থা করেন। সেই মুহাম্মদ মাত্র কয়েক বছরেই ধনবান হয়ে ওঠেন। কোন জাদু-মন্ত্রে সম্ভব হয়েছিলো এটা? তাঁর নিজের যে ভরণপোষণের সামর্থ ছিলো না এবং মাত্র কয়েক বছরেই বিপুল বৈভবের মালিক হয়ে উঠেছিলেন তা বানানো কোনো গল্প বা অতিরঞ্জিত বর্ণনা নয়। কোরান, হাদিস ও ইসলামের ইতিহাসে তার উজ্জ্বল প্রমাণ রয়েছে। সেই প্রমাণগুলির প্রতি এবার চোখ বুলানো যাক।
এ ইতিহাস সর্বজনবিদিত যে মুহাম্মদ খাদিজা সূত্রে প্রাপ্ত বিপুল ধন-সম্পদ ত্যাগ করে খালি হাতে মদিনায় গিয়ে উঠেছিলেন। ফলে মদিনায় তাঁকে প্রবল অর্থকষ্টের মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করতে হতো। আর্থিক সংকট এতোটাই তীব্র আকার নিয়েছিলো যে তার প্রভাবে তাঁর দাম্পত্যজীবন বিষাক্ত হয়ে ওঠে। দাম্পত্যকলহ এমন মাত্রায় পৌঁছে  যায় যে তিনি একবার এক মাস যাবৎ স্ত্রীদের থেকে দূরে সরে গিয়ে মসজিদে থাকতে বাধ্য হন। তাতেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় অসন্তুষ্ট স্ত্রীদের মুখ বন্ধ করার জন্যে তাঁদের তালাক দেবার ভয় দেখাাতেও  দ্বিধা করেন নি।মুহাম্মদের দাম্পত্য জীবনের সেই বিশ্রী ও বিব্রতকর ঘটনার স্পষ্ট বিবরণ পাওয়া যায় কোরানের মধ্যেই। এ প্রসঙ্গে কোরানের একটি ভাষ্য হলোঃ   “হে নবী ! তুমি তোমার স্ত্রীদের বলো – তোমরা যদি পার্থিব জীবনের ভোগ ও বিলাসিতা কামনা করো, তবে  এসো, আমি তোমাদের ভোগ বিলাসের ব্যবস্থা করে দিই, এবং সৌজন্যের সঙ্গে বিদায় দিই।”  [সুরা আহযাব, ৩৩/২৮] কেন মুহাম্মদ তাঁর স্ত্রীদের তালাক দেওয়ার ভয় দেখিয়েছিলেন? এর স্পষ্ট ব্যাখ্যা রয়েছে কোরানের তফসীরে।তফসীরে বলা হয়েছে – “হজরত স্বীয় পত্নীগণ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়াছিলেন ও শপথ করিয়াছিলেন যে, এক মাস কাল তাহাদের সঙ্গ করিবেন না, কারণ এই যে, তাঁহারা তাঁহার সাধ্যাতীত বস্ত্রাদি প্রার্থনা করিতেছিলেন। এয়মনের বিচিত্র বসন ও মেসরের পট্ট-বস্ত্র, এবং এইরূপ অন্যান্য সামগ্রীর প্রতি তাঁহাদের লোভ হইয়াছিল। এই সকল হজরতের হস্তায়ত্ত ছিল না। তিনি তাঁহাদের কর্তৃক উত্যক্ত হইয়া তাঁহাদের সঙ্গ পরিত্যাগ করেন, এবং এক মসজ্বেদে গিয়ে বসিয়া থাকেন, ঊনত্রিশ দিবসের পর তিনি এই আয়াত প্রাপ্ত হন।” [দ্রঃ গিরিশচন্দ্র সেনের কুরআন শারীফ] মুহাম্মদের এই আর্থিক দৈন্যতার করুণ বর্ণনা পাওয়া যায় হাদিসেও।  যুবাইর ইবনে হরব [রঃ} বর্ণিত একটি হাদিস এ প্রসঙ্গে বলছে  – “ওমর ইবনে খাত্তাব [রাঃ] বলেন, যখন রাসূলে পাক [সঃ] তাঁর স্ত্রীদের নিকট হতে সাময়িকভাবে পৃথক হয়ে গেলেন। তখন আমি মসজিদে নববীতে  প্রবেশ করে দেখতে পেলাম যে, লোকজন হাতে কঙ্কর নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। তারা পরষ্পর আলোচনা করিতেছিল যে, রাসূলে পাক [সঃ] তাঁর  স্ত্রীদের  তালাক প্রদান করেছেন। ... আমি রাসূলে  পাক [সাঃ] – এর নিকট এইবার প্রবেশ করলাম। তিনি তখন খেজুর পত্র নির্মিত একটি চাটাইয়ের উপর কাত হয়ে শায়িত ছিলেন। আমি তাঁর নিকট গিয়ে বসে পড়লাম। তিনি তাঁর  চাদরটি স্বীয় দেহের উপর টানিয়া দিলেন। তাছাড়া তাঁর পরিধানে তখন অন্য কাপড় ছিল না। তাঁর বাহুতে চাটাইয়ের দাগ বসে গিয়েছিল। আমি তখন রাসূলে পাক [সঃ] – এর কক্ষস্থিত মাল-সামানের দিকে লক্ষ্য করছিলাম। সেখানে আমি একটা পাত্রে একছা’ পরিমাণ যব দেখতে পেলাম। আর সলমের কিছু পাতা [যা দিয়ে চামড়া রঙ করা হয়] কামরার এক কোণে পড়ে থাকতে দেখলাম। আরও দেখলাম যে, একখানি চামড়া যা পাকানো ছিল না, তা ঝুলন্ত অবস্থায় ছিল। এসব দেখে আমার দু চক্ষু অশ্রুসিক্ত হয়ে গেল।” [মুসলিম শরীফ, সোলেমানিয়া বুক হাউস, ঢাকা, হাঃ নং ৩৩৫৬]  কোরান ও হাদিস থেকে উদ্ধৃত এই দুটি বর্ণনা থেকে যে চিত্রটি ফুটে উঠেছে তা থেকে স্পষ্টতঃই বোঝা যায় মুহাম্মদের আর্থিক অবস্থা কতো করুণ ও শোচনীয় ছিলো। বর্ণনার অতীত এই দীন-দরিদ্র মানুষটি ৭/৮ বছরেই বিশাল ধনী হয়ে উঠেছিলেন। কতো বড়ো ধনী হয়ে উঠেছিলেন এবং তাঁর  সম্পদ এতো বিপুুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছিল যে তা আন্দাজ করা সাধ্যাতীত ব্যাপার। তবে তিনি যে আক্ষরি অর্থেই বিরাট ধনবান হয়ে উঠেছিলেন তা তাঁর জীবনের নানা ঘটনা থেকে বোঝা যায়।
পর্যাপ্ত ভরণপোষণের দিতে না পারার জন্যে এক সময় যে মুহাম্মদকে একদা স্ত্রীদের প্রবল ক্ষোভেের মুখে পড়তে হয়েছিলো সেই  তিনিই প্রত্যেক স্ত্রীকে আলাদা আলাদা ঘর তৈরী করে দিয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রীদের সংখ্যা ঠিক কতো ছিলো তা নিয়ে প্রবল মতভেদ আছে। তবে এটা নিয়ে  কোনো সংশয় নেই যে, তাঁর মৃত্যুর সময় নয় জন স্ত্রী জীবিত ছিলেন। তবে আর একটি মত হলো যে ন’জন নয়,  ছিল এগারো জন। সুতরাং এটা স্পষ্ট  যে  তাঁর হারেমে স্ত্রীর সংখ্যা ছিলো নয় বা এগারোর চেয়ে আরো বেশী, কেননা তিনি বিয়েে করেছিলেন এগারো অপেক্ষা অধিক সংখ্যাায় এবং তাঁর অনেক দাসদাসী ও উপপত্নীও ছিলো। এহেন একটা বিশাল পরিবারের সকলের ভরণপোষণ ও বাসস্থান করতে হলে  বহু অর্থের প্রয়োজন হয় তা সহজেই অনুমেয়। মুহাম্মদ তাঁর বিদায় হজে একশোটা উট কোরবানি দিয়েছিলেন। সেবার তিনি তাঁর সকল স্ত্রীদেরও সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁদের হজ শিক্ষা দেওয়ার জন্যে। যে মানুষটা সপরিবারে হজ সম্পন্ন করবার জন্যে এমন এলাহি কর্মকান্ড  করতে পারেন  তিনি যে  বিশাল ধনী ছিলেন তা বলা বাহুল্য।৬৩০ খৃষ্টাব্দে মুহাম্মদ হজ করার অছিলায় অতর্কিতে মক্কা আক্রমণ করে মক্কা জয় করেন। সে বছর তিনি দশ হাজার সৈন্য সঙ্গে নিয়ে যান।এই ঘটনাটিও প্রমাণ করে যে মুহাম্মদ  বিপুল ধন-সম্পত্তির মালিক হয়ে উঠেছিলেন। এখন প্রশ্ন হলো, দারিদ্রের কশাঘাতে ধুঁকতে থাকা মুহাম্মদ এতো অল্প অসময়ে কীভাবে এতো বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়ে উঠেছিলেন? কোনো রাজা বাদশা কি তাঁকে তাঁর ধর্ম প্রচারের জন্যে এতো অর্থ দান  করেছিলেন? না। তিনি কি মোটা অঙ্কের অর্থ কুড়িয়ে পেয়েছিলেন? না। তিনি কি লটারী জিতেছিলেন? না। তিনি কি ব্যবসা করে প্রচুর মুনাফা করে ধনী হয়েছিলেন? না। তবে কীভাবে তিনি রাতারাতি ফকির থেকে বাদশা বনে গিয়েছিলেন? এর উত্তর রয়েছে ইতিহাস এবং কোরান ও হাদিসের পাতায় পাতায়। সেই পাতাগুলির উপর এবার চোখ রাখা যাক।
ইসলামের ইতিহাসে সর্বাধিক পরিচিত জিহাদ বা যুদ্ধটি হলো বদর যুদ্ধ। কিছুদিন হলো মুহাম্মদ মদিনায় এসেছেন ইসলাম ধর্ম প্রাচারের জন্যে। তখন তীব্র আর্থিক কষ্ট চলছে। এমন সময় খবর পেলেন যে, মক্কার কোরেশদের একজন বিশিষ্ট ধনী ব্যক্তি, আবু সুফিয়ান, সিরিয়া গিয়েছেন বাণিজ্য করতে এবং তাঁর সঙ্গে রয়েছে একটি বেশ বড়ো বণিক দল। তিনি ঠিক করলেন সেই বণিক দলটিকে লুট করবেন। সেই উদ্দেশ্যে তিন শতাধিক শিষ্য নিয়ে গিয়ে বদর নামক একটি স্থানে গিয়ে পথের ধারে ওৎ পেতে রইলেন। আবু সুফিয়ান এ খবর পেয়ে অন্য পথ ধরে মক্কায় ফিরে যান। এদিকে মক্কার লোকেরা আবু সুফিয়ায়ানকে রক্ষা করতে পৌঁছে যায় বদর প্রান্তে যার অদূরে মুহাম্মদ দলবল নিয়ে ওৎ পেতেছিলেন। ফলে তাদের সঙ্গে মুহাম্মদের দলবলের যুদ্ধ বেধে যায়। সেই যুদ্ধে মুহাম্মদ অবিশ্বাস্য জয় পেয়ে যান। যুদ্ধে কোরেশদের ৭০জন  নিহত ও ৭০জন মুহাম্মদের হাতে বন্দি হয়েছিলেন। কোরেশদের ফেলে যাওয়া অর্থ ও জিনিসপত্র মুহাম্মদ লুট করে নেন। এবং পরে মোটা অংকের মুক্তিপণ নিয়ে বন্দি কোরেশদের মুক্তি দেন, যদিও দু'জন বন্দিকে শিরচ্ছেদ করে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। যুদ্ধে মুহাম্মদের হাতে বলতে গেলে এক লহমায় বহু অর্থ চলে আসে যা তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারেন নি।
বিধর্মীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়া, তাদের ভীত সন্ত্রস্ত করা ও তাদের হত্যা ও লুট করে মোটা অর্থোপার্জন করা – এটাকেই একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নেন মুহাম্মদ বদর যুদ্ধে অভাবনীয় জয় পাওয়ার পর। মদিনায় ইহুদীদের তিনটি গোষ্ঠী বাস করতো যারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণের আবেদনকে প্রত্যাখান করেছিলো। তাই তাদের প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে মুহাম্মদ তাদের  একে একে  মদিনা থেকে নির্বাসিত করে 
তাদের বিশাল পরিমাণ বিষয় সম্পত্তি ও ধন-দৌলত তিনি গ্রাস করে নেন। অবশ্য প্রতি ক্ষেত্রেই তিনি একটি মিথ্যে অভিযোগ [যদিও তা তুচ্ছ] খাড়া করেছিলেন তাদের বিরুদ্ধে।দুটি গোষ্ঠীকে খালি হাতে মদিনা থেকে নির্বাসিত করার পর সর্বশেষ যে গোষ্ঠীর [বানু কুরাইজা]  উপর আক্রমণ সংগঠিত করেছিলেন এবং তাদের সমস্ত পুরুষ মানুষদের যেভাবে হত্যা করেছিলেন তার মতো নৃশংস ঘটনা ইতিহাসে বিরল। তাদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ মিথ্যা দোষারোপ করে যে সাজানো বিচার করেছিলেন তার রায়ে শাস্তি ছিলো তিন রকমের। কী সে রায় ছিলো তা দেখা যাক একজন মুসলিম ঐতিহাসিকের বিবরণ থেকেই। তিনি লিখেছেন, "মুসলমানদিগের সহিত সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করার দরুন সমুদয় ইহুদী পুরুষদিগের প্রাণদন্ড হইবে, স্ত্রীলোক এবং বালক-বালিকাগণ দাস-দাসীরূপে পরিগণিত হইবে এবং ইহুদীদিগের সকল সম্পত্তি মুসলিম সৈন্যদিগের মধ্যে ভাগ করিয়া দেওয়া হইবে।” [ বিশ্বনবী, গোলাম মোস্তফা, পৃঃ ২০৫] এখানে একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। তা হলো এই যে, মুহাম্মদ নিজেই পুরুষ ইহুদীদের [৭০০/৮০০ জন] শিরচ্ছেদ করার পৈশাচিক প্রক্রিয়ার তত্ত্বাবধান করেছিলেন। এই বর্বরতম ঘটনাটিকে মুসলিম ঐতিহাসকরাও অস্বীকার করতে বা চাপা দিতে পারেন নি।বিধর্মীদের উপর অতর্কিতে আক্রমণ করা, তাদের নির্বিচারে হত্যা করা, তাদের যাবতীয় বিষয়-আশয় ও ধন-দৌলত লুট করা, এ রকম ঘটনা মুহাম্মদ তাঁর নিজের জীবনে কতবার ঘটিয়েছেন তার সঠিক তথ্য  বা সংখ্যা পাওয়া খুব মুসকিল। 
সংখ্যাটা কতো হতে পারে তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। তবে সংখ্যাটা ৭০ থেকে  ১০০-এর মধ্যে হওয়ার সম্ভাবনা সর্বাধিক। এসব অতর্কিত সশস্ত্র হানায় তিনি প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছিলেন বা নেতৃত্ব করেছিলেন এমন অভিযানের সংখ্যা ১৭ থেকে ৪৩টি। মুসলিম ঐতিহাসিক ড. ওসমান গণি লিখেছেন ৪৩টি অভিযানে মুহাম্মদ অংশ নিয়েছিলেন। [দ্রঃ মহানবী, পৃঃ ৩৯৫,৩৯৬]  মুহাম্মদের জীবদ্দশায় যতগুলি অভিযান বা আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে তার প্রত্যেকটি ঘটনাই উল্লেখ করার  মতো।  এখানে আর মাত্র  দুটি ঘটনার উল্লেখ করবো।  ঘটনা দুটি সংক্ষেপে নীচে বর্ণনা করা হলো।   
ইসলামের ইতিহাসে বানু মুস্তালিকের যুদ্ধটিও যথেষ্ট পরিচিত। ৫ম হিজরিতে অর্থাৎ ৬২৭ খৃস্টাব্দে মুহাম্মদ এই অভিযানটি সংগঠিত করেন। এই অভিযান সম্পর্কে হাদিসেও অনেক তথ্য পাওয়া যায়। ইরানের প্রখ্যাত লেখক আলি সিনা ‘Understanding Muhammad’ গ্রন্থের ২৮ পৃষ্ঠায়  শাহী বুখারী থেকে এই ঘটনাটি সম্পর্কে একটি হাদিস উদ্ধৃত করেছেন। সেটি এরূপঃ “The Prophet had suddenly attacked Banu Mustaliq without warning while they were heedless and their cattle were being watered at the places of water. Their fighting men were killed and their women and children were taken as captives; the Prophet got Juwairiya on that day. Naïf said that Ibn Omar had told him that above narration and that Ibn Omar was in that army.”  ঐ হিংসাত্মক আক্রমণের ঘটনায় কতজন নারী ও শিশুদের বন্দি করে ক্রীতদাস-দাসী বানিয়ে এবং কত সম্পদ লুঠ করে মুহাম্মদ মদিনায় নিয়ে গিয়েছিলেন তার বর্ণনাও হাদিসে লিপিবদ্ধ রয়েছে। আলি সিনা  তাঁর উক্ত গ্রন্থে ২৯ পৃষ্ঠায় সেরূপ একটি হাদিসটি উদ্ধৃত করেছেন।  হাদিসটি হলো – “600 were taken prisoners by the Muslims. Among the booty there were 2,000 camels and 5000 goats.[Sahih Bukhari, Vol.3, Book 46, Number 717] প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে মুসলিমরা মুহাম্মদ ও জারিয়ার বিয়ের ঘটনাকে মুহাম্মদের একটি মহানুভবতা ও উদারতার ঘটনা হিসেবে পরিবেশন করেন। তাঁরা বলেন, ইহুদীরা মুহাম্মদের সঙ্গে শত্রুতা করলেও মুহাম্মদ জারিয়াকে বিয়ে করে  ইহুদীদের প্রতি সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শন করতে দ্বিধা করেন নি। মিথ্যার বেসাতি আর কাকে বলে!   
মদিনা থেকে ৯০/১০০ মাইল দূরে খায়বার ছিলো একটি ইহুদীদের আর একটি বসতি। এই অঞ্চলটি ছিলো খুবই আর্থিক দিক থেকে খুবই সমৃদ্ধ অঞ্চল। মদিনার ইহুদীরা মুহাম্মদের দ্বারা নির্বাসিত হয়ে অনেকেই খায়বারে গিয়ে বসবাস শুরু করে। খায়বারের ধন-সম্পদ লুট  এবং মদিনা থেকে নির্বাসিত ইহুদিদের শায়েস্তা করতে মুহাম্মদ খায়বার আক্রমণ করেন। বলা বাহুল্য যে সেই আক্রমণও ছিলো সহসা, একদিন অতি প্রত্যুষে খায়বারের মানুষরা দেখলো যে মুহাম্মদের নেতৃত্বে মুসলমানদের বিরাট বাহিনী তাদের ঘিরে ফেলেছে। Sirat Rasul Allah গ্রন্থ থেকে এই আক্রমণের ঘটনার বর্ণনাকে উদ্ধৃত করেছেন আলি সিনা তাঁর উক্ত গ্রন্থের ৩৩ পৃষ্ঠায়।  বর্ণনাটি এরূপঃ “Ibn Ishaq in his narration of the conquest of Jewish town Khaibar reports that Muhammd, without warning, attacked this fortress town and killed its unarmed people as they were fleeing. Among the captured was Kinana. Kinana al-Rabi who had the custody of the treasure of Banu Nadir, was brought to the apostle who asked him about it. He denied that he knew where it was. A Jew came, [Tabari a says, ‘was brought’] to the apostle and said that he had seen Kinana going to a certain ruin every morning early. When the apostle said Kinana, ‘Do you know that if we find you have it [the treasure] I shall kill you? He said, ‘Yes.’
The apostle gave orders to that the ruin was to be excavated and some of the treasures were found. When he asked him about the rest [of the treasures?] he refused to produce it, so the apostle gave orders to al-Zubayr Al-Awwam, ‘Torture him until you extract what he has..’ So kindled a fire with flint and steel on his chest until he was nearly dead. Then the apostle delivered him to Muhammad b. Maslama and he struck off his head, in revenge for his brother Mahmud” বিধর্মীদের উপর মুহাম্মদ এই সমস্ত বর্বর আক্রমণ ও হত্যাকান্ড  ইসলাম ধর্মের ও প্রচার বা প্রসারের উদ্দেশ্যে করতেন এমনটা  নয়। তাঁর উদ্দেশ্য ছিলো প্রধানতঃ লুঠতরাজ করা।  আলি সিনা তাঁর ঐ বইয়ের ২৯ পৃষ্ঠায় একটি হাদিস উল্লেখ করে এটা দেখিয়েছেন।  সেই হাদিসটি হলো -  “Ibn Aun reported: I wrote to Nafi inquiring from him whether it was necessary to extend [to the disbelievers] an invitation to accept [Islam] before meeting them in fight. He wrote [in reply] to me that it was necessary in the early days of Islam. The messenger of Allah [may peace be upon him] made a raid upon Banu Mustaliqu while they were unaware and their cattle were having a drink at the water. He killed those who fought and imprisoned others”  [Shahi Muslim Book 019, Number 4292] 
মুহাম্মদের জীবনের ইতিহাস আমাদের সকলকে যেভাবে চমকে দেয় তার তুলনা ইতিহাসে বিরল।বস্তুত ইসলামের ইতিহাসকে অনেকগুণ ছাপিয়ে গেছে মুহাম্মদের জীবনের নিজস্ব ইতিহাস।  উপরে মুহাম্মদের জীবনের সামান্য যে কয়েকটি ঘটনার বর্ননা করা হয়েছে তা তাঁর সেই অতি দীর্ঘ ও ব্যাপক বিস্তৃত জীবনের তুলনা করলে সিন্ধুতে বিন্দু সদৃশ হবে। তবুও  সামান্য এই কয়েকটি ঘটনা থেকেই এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, মুহাম্মদ ও ইসলাম সম্পর্কে যা যা প্রচার করা হয় তা কতো বড়ো মিথ এবং মিথ্যেয় ঠাসা। বুঝতে অসুবিধা হয় না এটাও যে, যে পথ ধরে ‘আইএস’ [IS] তথা ‘ইসলামিক স্টেট’ আজ বিশ্বের সবচেয়ে ধনী জঙ্গি গোষ্ঠী হতে পেরেছে, সে পথটি মোটেই তাদের নতুন আবিষ্কার নয়। এ পথের আবিষ্কর্তা স্বয়ং মুহাম্মদ। এ পথ ধরেই তিনি তাঁর মদিনার জীবনের প্রবল আর্থিক সংকটের সমাধান খোঁজা শুরু করেন একদিন। আর এ পথেই পেয়েছিলেন সংকট সমাধানের আশাতীত সাফল্যও। তারপর আর পিছন ফিরে তাকান নি। এ পথটাকেই তিনি তাঁর নিজের জন্যে এবং জিহাদের জন্যে তহবিল সংগ্রহ করার জন্য প্রধান পথ হিসেবে অবলম্বন করেছিলেন। সেই তখন থেকেই জিহাদের নিমিত্ত চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, লুটপাট, অপহরণ, হত্যা, মাল পাচার, মানুষ পাচার  প্রভৃতি কার্যকলাপ ইসলামে বৈধ। 

বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাইনি – পাঁচ

  দ্বিতীয় অধ্যায় শেখ হাসিনা ও শেখ মুজিবের প্রতি তীব্র গণরোষের নেপথ্যে ২০২৪ এর জুলাই অভ্যুত্থানের সফল পরিসমাপ্তি ঘটে ৩৬ দিন পর (৫ই ...